advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

গণমাধ্যম আগেই সজাগ করেছিল

ইউসুফ আরেফিন
২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৮:৫২
advertisement

রাজধানীতে বেশ কয়েকটি ক্লাবে ক্যাসিনোর সন্ধান এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। এ খবরে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। অবৈধ এসব ক্যাসিনো পরিচালনার দায়ে যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ডে আছেন। অবৈধ অস্ত্র ও ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি মো. সফিকুল আলম ফিরোজ। অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন যুবলীগের শীর্ষ নেতা এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম (জিকে শামীম)। অভিযানের পর পুলিশ প্রশাসন ও রাজনীতিকদের কেউ কেউ বলেছেনÑ রাজধানীতে
ক্যাসিনো চলতো তা তারা জানতেন না। এমনকি ক্যাসিনো বা জুয়ার আসর নিয়ে গণমাধ্যম আগে খবর দেয়নি। যদিও গণমাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেনÑ বহু আগেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকার জুয়ার আসর এবং ক্যাসিনো বাণিজ্য কার্যক্রম নিয়ে খবর প্রকাশ হয়েছিল। এসব খবরের মাধ্যমে প্রশাসনকে সজাগও করেছিল গণমাধ্যম। তারা এসব খবর জেনেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ সুযোগেই বিস্তার লাভ করেছে ক্যাসিনো সাম্রাজ্য।
আমাদের সময়ে ২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর ‘রাজধানীতে ক্যাসিনোর ফাঁদ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এর পরই ক্যাসিনোর তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছিল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। দু-এক জায়গায় নামকাওয়াস্তে অভিযানও চালানো হয়েছিল তখন। কিন্তু কদিন পরই অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আরও কয়েকটি গণমাধ্যম ঢাকার ক্যাসিনো নিয়ে প্রতিবেদন করলেও প্রশাসন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে অবৈধ এ বাণিজ্য দিনের পর দিন বিস্তার লাভ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থানের কথা জানানোর পরই মূলত ঢাকার ক্যাসিনোগুলোতে অভিযান চালায় র‌্যাব। শুধু তাই নয়, এগুলো পরিচালনার দায়ে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করে। গতকাল পুলিশও ঢাকার ক্লাবপাড়ার চারটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়েছে। অভিযান শুরু হয়েছে দেশের বিভিন্ন ক্রীড়া ও অভিজাত ক্লাবগুলোতেও।
এ বিষয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম আমাদের সময়কে বলেন, ‘আজকে রাজনীতিবিদ ও পুলিশ গণমাধ্যমকে দোষ দিচ্ছেÑ গণমাধ্যম কেন আগে ক্যাসিনোর খবর প্রকাশ করেনি। অথচ বহু আগেই গণমাধ্যম রাজধানীর ক্লাবপাড়ার সন্দেহজনক কার্যক্রম নিয়ে খবর প্রকাশ করেছে। প্রশাসন তখনই যদি এসব খবর আমলে নিত তা হলে আজ ক্যাসিনোর বিষয়টি এত বড় আকার ধারণ করত না।’ থানা থেকে মাত্র ১০০ গজ, ২০০ গজ দূরে ক্যাসিনো পরিচালনার ব্যাপারটিকে অবাক করার মতো বিষয় বলেও মন্তব্য করেন এই সাংবাদিক নেতা। তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি দুর্নীতিবাজ ও টেন্ডারবাজ ধরতে যে অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার দাবি রাখে।’
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কুদ্দুস আফ্রাদ আমাদের সময়কে বলেন, ‘গণমাধ্যমে ক্যাসিনো নিয়ে একাধিকবার সংবাদ হয়েছে। অথচ প্রশাসন সেসব খবরকে গুরুত্ব দেয়নি। এখন তারা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছে। ক্যাসিনো আছে কি নেই, তা দেখার দায়িত্ব প্রশাসনের। তবুও গণমাধ্যম এসব খবর প্রকাশ করেছে। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে সরকার ও প্রশাসন গণমাধ্যমকে শত্রু মনে করছে। যার ফলে সব খবরকে তারা আমলে নেয় না। অথচ গণমাধ্যমই সমাজের দর্পণ। তখনকার খবরগুলো আমলে নিয়ে সেসব বিষয়ে খোঁজখবর নিলে হয়তো ক্যাসিনোর ডালপালা গজাতে পারত না।’
একই প্রসঙ্গে আমাদের সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি কাদের গণি চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেই বিভিন্ন সময় ঢাকার ক্যাসিনো ও ক্লাবপাড়ার সন্দেহজনক কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। অথচ প্রশাসন সে সময় এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে আজকে ঢাকা শহর ক্যাসিনোর নগরীতে পরিণত হতো না।’ সাংবাদিক নেতা কাদের গণি আরও বলেন, ‘দেরিতে হলেও চাঁদাবাজ-দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করায় তারা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক খান বলেন, গণমাধ্যমেই সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে; কিন্তুু প্রশাসন ও রাজনীতিকরা তাদের স্বার্থে আঘাত লাগার ভয়েই গণমাধ্যমের খবরকে গুরুত্ব দেন না। তারা নিজেদের স্বার্থে গণমাধ্যমে উঠে আসা অসঙ্গতিগুলো চেপে যায়। সংবাদপত্রে ঢাকার ক্যাসিনো সাম্রাজ্য নিয়ে রিপোর্ট হলেও বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে ক্যাসিনোর বিস্তার ঘটত না। তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমের শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, সাংবাদিক, প্রশাসন ও রাজনীতিবিদদের একসঙ্গেই কাজ করা উচিত। তা হলে রাষ্ট্রের বহু অসঙ্গতি দূর হয়ে যাবে। পুলিশের উচিত ছিল, সংবাদপত্রে ক্যাসিনোর নিউজ প্রকাশ হওয়ার পর পরই সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারের সঙ্গে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা; কিন্তু তারা তা করেনি। কারণ এতে অনেকেরই স্বার্থে আঘাত লাগত।

 

advertisement