advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

‘তোর আব্বারে ভিসি বানাই দি’

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি
২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৬:৩৮
উপাচার্য প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন। ছবি সংগৃহীত
advertisement

‘এ তোর আব্বা কী করে? তোর আব্বারে ভিসি বানাই দি (বানিয়ে দিই)। দেখি তোর বাবা বিশ্ববিদ্যালয় কেমন চালায়। কী আগুন জ্বালাবি এ জানায়োর। এ... কী আগুন জ্বালাবি, কেন জ্বালাবি, কোন কোন জায়গা জ্বালায় আইছিস (এসেছিস)। তোরে তো এখন লাথি দিয়ে বের করে দিতে ইচ্ছা করতিছে (করছে)। এ কোনডারে (কাকে) ছাড়বেন। এর একটা থেকে আরেকটা বেশি। এদের কথা শুনলি (শুনলে) মরা মানুষ তাজা হয়ে যাবে...।’ কয়েক শিক্ষার্থীকে

রুমে ডেকে এভাবেই গালমন্দ করছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুবিপ্রবি) উপাচার্য প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন। পাশে বসে কোন শিক্ষার্থী ফেসবুকে কী স্ট্যাটাস দিয়েছেন, তা পড়ে শোনাচ্ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আশিকুজ্জামান ভূইয়া। শুধু ওইসব শিক্ষার্থীকেই নয়, তাদের বাবা-মাকে ডেকে এনেও শোনানো হয়েছে কটু কথা। অপমান করা হয়েছে। এমন এক অডিও ক্লিপস গতকাল থেকে ভেসে বেড়াছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

প্রক্টর এক শিক্ষার্থীর ফেসবুক স্ট্যাটাস পড়ছিলেন, ‘স্যার ও লিখেছেÑ প্রতিবাদ করলে বহিষ্কার করবে তো? করুক, কয়জনকে বহিষ্কার করবে। আমরা তো অন্যায় কিছু করিনি।’ এ কথা শুনে উপাচার্য বললেন, ‘তয় তুরা (তোরা) চালা আইসা (এসে) ইনভারসিটি (ইউনিভার্সিটি)। তোর বাপরা আইসা, মায়েরা আইসা চালাক। আমরা ছাইড়া (ছেড়ে) দি (দেই)। এ যা বাইর (বের হ), যা বের হয়।’ এ সময় শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা বারবার ক্ষমা চাইছিলেন। তাতেও থামছেন না উপাচার্য নাসির।

‘তোর আব্বারে আইনা (এনে) চালা। তোর আব্বা বানাইছে বিল্ডিং? ১০৩ রুম কারে দেব, তোর কাছে শোনব? তোর কাছে শোনব, না তোর মার কাছে শোনব। ১০৩ নম্বর নিয়ে তোর এতো হেডেক ক্যান। ওই রুমডা (রুমটা) কি তোর আব্বার?’ এরই মধ্যে শোনা যাচ্ছিল এক শিক্ষার্থীর মায়ের কান্নাজড়িত কণ্ঠে সন্তানকে ক্ষমা করে দেওয়ার আকুতি। আবার উপাচার্য বলছেন, ‘এ আপনার ছেলে কোনডা (কোনটা)? কী করেন আপনি? ও শিক্ষক আপনি? আপনার ছেলে লেখছেÑ কিন্ডারগার্টেন এটা। কিন্ডারগার্টেনে আপনার ছেলেকে ভর্তি করছেন কেন? এ কিসের জন্যি কিন্ডারগার্টেন লেখছিস? লাথি দিয়ে তোরে ফেলে দেব এই জায়গা থেকে। এ জানোয়ার। তোর চৌদ্দ পুরুষের সাধ্য ছেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার। তুই তো জীবনেও চান্স পাতি না। আমি এ বিভাগ খুলছিলাম বলে তুই চান্স পাইছিলি। কোন বিশ্ববিদ্যাল থেকে এ জায়গায় কী কী খারাপ তুই ক। তোর শাস্তি অবেই (হবেই)। সবাই যদি কয় কেজিতি পড়ি। তলিতো আমি ভিসি থাকি না। আমি তো হেডমাস্টার হইয়া যাই।’

উপাচার্য ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দীনকে অপসারণের দাবিতে বেশ কয়েক দিন ধরে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। গত শনিবার শিক্ষার্থীদের ওপর বহিরাগত পেটোয়া বাহিনীর হামলার পর আন্দোলন আরও জোরদার হয়ে ওঠে। দুর্নীতি, নারী কেলেঙ্কারি, ভর্তি বাণিজ্য, ক্যাম্পাসে বিউটি পার্লার দিয়ে ব্যবসা করাসহ নানা অভিযোগ উপাচার্যের বিরুদ্ধে।

বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমাদের এ ক্ষোভ একদিনের নয়, ভিসি স্যার বিশ্ববিদ্যালটিকে টর্চার সেলে পরিণত করেছেন। কোনো শিক্ষার্থী ভিসি স্যারের অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই তিনি তাদের এবং অভিভাকদের ডেকে গালাগালাসহ মানসিক টর্চার করেন। এ থেকে বাদ যান না শিক্ষকরারও। ওনার এসব কর্মকা-ের সঙ্গে প্রক্টর আশিকুজ্জামান ভূইয়াসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা থাকেন।’

এদিকে গতকাল রবিবার পঞ্চম দিনের মতো ক্যাম্পাসে উপাচার্যকে অপসারণের এক দফা দাবিতে চলা অনশন কর্মসূচি আরও জোরদার হয়েছে। দুপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করে গোপালগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল হামিদ বলেন, ‘আন্দোলনরতদের ওপর যে হামলা হয়েছে, আমরা তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছি। গোপালগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সব যৌক্তিক আন্দোলনের সঙ্গে থাকবে।’ পরে গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি চৌধুরী এমদাদুল হক, সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব আলী খানসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আলটিমেটাম দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তা মেনে না নিয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যতক্ষণ আমাদের আশ্বস্ত না করবেন, ততক্ষণ আমরা এ আন্দোলন চালিয়ে যাব।’

বশেমুবিপ্রবির এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও। আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেছে মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চের ঢাবি শাখা। এ সময় বশেমুরবিপ্রবি উপাচার্যের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন তারা।

এ সময় মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চের আহ্বায়ক অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন বলেন, ‘কিছুদিন আগে ওই ভিসির অপসারণের জন্য ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিলাম। আজ বাংলাদেশের সমগ্র ছাত্রসমাজ আমাদের এ দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। গোপালগঞ্জের মানুষ ভিসির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। কিন্তু সেখানে ভিসি তার পেটুয়া বাহিনী দিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে। তাই প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন, অবিলম্বে এ ভিসিকে অপসারণ করতে হবে।’

বশেমুরবিপ্রবি উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তার কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও। গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে মানববন্ধন করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা বলেনÑ আজকের পর থেকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই স্বৈরচার ভিসির প্রবেশ নিষিদ্ধ। যে বাইরের সন্ত্রাসী দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়, তার উপাচার্য পদে থাকারও কোনো যোগ্যতা নেই।

অবিলম্বে এই অযোগ্য উপাচার্যকে অপসারণ করে তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ও উপাচার্য খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল মানববন্ধন করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সাধারণ শিক্ষার্থীরাও। তারা বশেমুরবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের সব দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

advertisement