advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পচন ধরেছে গোটা ব্যবস্থায় : দায়ী কে

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০১:০৯
মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম। ছবি : সংগৃহীত
advertisement

দেশের মানুষ মাত্র কয়েক দিন আগে আকস্মিকভাবে জানতে পারল যে, ঢাকা শহরে বহুদিন ধরে উন্নত পুঁজিবাদী পশ্চিমা দেশের কায়দায় ‘ক্যাসিনোর’ মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার জুয়ার ব্যবসা চলছে। ক্ষমতাসীন দলের একজন শীর্ষ নেতা ঢাকা শহরকে সিঙ্গাপুরের মতো শহরে পরিণত করার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন তা যে এত দ্রুত এবং সবকিছু বাদ দিয়ে কেবল জুয়ার ব্যবসার ক্ষেত্রে এভাবে কার্যকর হবে, সে কথা সাধারণ মানুষের ধারণার একেবারে বাইরে ছিল। এই ‘সুখবরটি’ জেনে তারা স্তম্ভিত এবং অবাক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়েছে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর, বুধবার দুপুর থেকে বেশ কয়েকটি ‘ক্যাসিনোতে’ অভিযান চালিয়ে র‌্যাবের চৌকস বাহিনী এই অবৈধ ও অনৈতিক অপরাধ-তৎপরতা হাতেনাতে ধরে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। ঢাকা শহরে ৬০টি ‘ক্যাসিনোর’ অস্তিত্ব রয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছে। এগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন আওয়ামী যুবলীগের অনেক দাপুটে নেতার সম্পৃক্ততাও উন্মোচিত হয়েছে। খোদ শাসক দলের কিছু নেতাও যে এর সঙ্গে যুক্ত, সে কথাও প্রকাশিত হয়েছে। যেসব ‘ক্লাবের’ নামে এসব ‘ক্যাসিনোতে’ জুয়ার আসর চালানো হতো তার একটির পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান যে একজন স্বনামধন্য এমপি, সে তথ্যটিও উদঘাটিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের নিশ্চিত ধারণা যে, এই ‘কারবারের’ সঙ্গে প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও জড়িত। ধারণা করা হচ্ছে, এসব ‘ক্যাসিনোতে’ প্রতিদিন ২০-৩০ কোটি টাকার জুয়ার কারবার চলত। সঙ্গে সঙ্গে চলত অন্যান্য সব ধরনের আনুষঙ্গিক অনৈতিক কাজকর্ম।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জনের পরপরই বঙ্গবন্ধু দেশে মদ, জুয়া, রেইস-খেলা ইত্যাদি নিষিদ্ধ করেছিলেন। ‘রেইস কোর্স ময়দান’কে ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে’ পরিণত করেছিলেন। তারও আগে, আমরা মুক্তিযোদ্ধারা দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে হটিয়ে যতগুলো ‘মুক্ত-এলাকা’ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলাম সেসব এলাকা মদ-জুয়া ইত্যাদি তো বটেই, এমনকি চুরি-ডাকাতি-নারী নির্যাতন-চাঁদাবাজি ইত্যাদি থেকেও মুক্ত করেছিলাম।

অথচ দেশে অভূতপূর্ব ‘উন্নয়নের’ কৃতিত্বের দাবিদার বর্তমান সরকারের আমলে এবং মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৪৮ বছর পর মদ-জুয়াসহ নিকৃষ্টতম আরও অনেক ধরনের অপরাধমূলক কর্মকা- সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্রকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলতে উদ্ধত হয়েছে। এমন যে হতে পারে তা সেদিন আমাদের কল্পনাতেও ছিল না। এসব দেখে দুঃখ-বেদনা-অপমানে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। পরাজয় গ্লানিকর, কিন্তু বিজয় লাভ করার পর সে বিজয় হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার গ্লানি ও বেদনার কোনো সীমা নেই!

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, “বিএনপিই ঢাকা শহরকে ‘ক্যাসিনোর শহর’ বানিয়ে রেখে গিয়েছিল।” কিন্তু ১০ বছর ধরে একনাগাড়ে চলা আওয়ামী শাসনামলে সেগুলো শুধু চালুই থাকল না, সেগুলো যে ফুলে-ফেঁপে উঠল, সে অপরাধ কোন সরকারের তা তিনি বলেননি। বিএনপিও এ বিষয়ে তাদের ‘হাওয়া ভবন’ ইত্যাদির দায় স্বীকার না করে ‘ক্যাসিনো ব্যবসার’ জন্য এককভাবে আওয়ামী লীগকেই দায়ী করেছে। এ ওর ঘাড়ে এবং ও এর ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে তারা তাদের দায়িত্ব শেষ করছে। কিন্তু কেউই এর পেছনের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার দায়ের কথা বলছে না।

ঘুষ-দুর্নীতি-পার্সেন্টেজ ব্যবসা ইত্যাদি এখন অর্থনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতার স্বাভাবিক অংশে পরিণত হয়েছে। ‘ক্যাসিনো’কা-ের মাত্র দিনকয়েক আগে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির মাধ্যমে ঠিকাদারের কাছ থেকে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ৮৬ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করার ‘সেনসেশনাল’ ঘটনা সব মহলের মাঝে প্রবল ধিক্কার ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। সেই অবস্থায় ক্ষমতাসীন দল তাদের দুজনকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হলেও তাদের ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়নি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাদের দায়িত্ব থেকে অপসারণের কারণ হিসেবে তাদের ‘অপরাধমূলক’ কাজের বদলে তাদের ‘শৃঙ্খলাবিরোধী’ কাজের কথা বলেছেন। অবাক কা-! তাই দেখা যাচ্ছে যে, এখনো তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করা এবং তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি।

সমাজ-অর্থনীতির পচন আজ সর্বত্র বিপজ্জনক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে। লুটপাট যে এ দেশে আজ কতটা বিস্তৃত ও ভয়ঙ্কর পর্যায়ে উপনীত হয়েছে তার ভীতিপ্রদ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে সম্প্রতি প্রকাশ হয়ে পড়া ৬ হাজার টাকায় বালিশ ক্রয়, ৩৭ লাখ টাকায় হাসপাতালের পর্দা ক্রয়, ১৭ লাখ টাকায় ১ বান ঢেউ টিন ক্রয় ইত্যাদি ঘটনা। এ অবস্থা নতুনও যেমন নয়, হঠাৎ করেও তার উদ্ভব ঘটেনি। এই সরকারের আমলে যেমন জনগণ এসব অপরাধের ঘটনাবলি দেখছে, তারা পূর্ববর্তী বিএনপি, বিএনপি-জামায়াত, এরশাদ প্রভৃতি সরকারের আমলেও সেসব ঘটতে দেখেছে। বিএনপি আমলের ‘হাওয়া ভবনের’ অনাচার-দুরাচারের কাহিনি কার না জানা আছে। বস্তুত সরকার আসে-যায়, গদির হাতবদল হয় কিন্তু ঘুষ-দুর্নীতি অনাচার-দুরাচারের অবসান ঘটে না! কেন? সে রহস্যের কিনারা না করতে পারলে এহেন ক্রমবর্ধমান পচন থেকে সমাজকে রক্ষা করার পথ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

এদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযন্ত্রণাও লাঘব হচ্ছে না। জনগণকে বলা হচ্ছে যে, এ যন্ত্রণা ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করে যেতে হবে। বিত্তবানদের হাতে জমা হওয়া সম্পদ চুইয়ে পড়ে এক সময় সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাবে। এই অন্তর্বর্তী সময়ের সাধারণ মানুষের এসব জীবনযন্ত্রণা হচ্ছে ‘উন্নয়নের প্রসববেদনা’ মাত্র। তাই দশকের পর দশক ধরে দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে প্রধান দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার বিষয় হয়ে থাকছে দ্রব্যমূল্যের অনিয়ন্ত্রিত ঊর্ধ্বগতি, আয়ের সঙ্গে মূল্যস্তরের অসঙ্গতি, কন্ট্রোল দামে রেশনে নিত্যব্যবহার্য দ্রব্য সরবরাহ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ গণবণ্টন ব্যবস্থার অভাব, মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ীদের শোষণ, বাজার-কারসাজির ছলচাতুরী ইত্যাদি।

জনগণের প্রধান ভাবনা-চিন্তার আরও বিষয়গুলো হলোÑ মহামারী আকারে একেবারে ওপরতলা থেকে তৃণমূল পর্যন্ত শাসক দলের নেতাকর্মী ক্যাডারদের ঘুষ-দুর্নীতি-চাঁদাবাজি-দখলদারিত্ব, তদবির বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, পদায়ন বাণিজ্য, প্রমোশন বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য, দলবাজি, পরিবারবাজি, দলীয় দাপট, হত্যা-খুন-গুম-ক্রসফায়ার, ছিনতাই-ধর্ষণ-নারী নির্যাতন, প্রজেক্টের টাকা চুরি, প্রজেক্ট লোপাট ইত্যাদি। চোখের সামনে প্রতি মুহূর্তে ঘটে যাচ্ছে এসব নারকীয় অপরাধের সব ঘটনাবলি। এসবের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, এমপি, আমলা, দলীয় ‘ক্যাডার’ বাহিনী, নেতা-পাতিনেতা প্রমুখ যে জড়িত তা দেশের ৯৯ শতাংশ সাধারণ মানুষ স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছে।

অন্যদিকে দেশে চলছে ১ শতাংশ মানুষ কর্তৃক এই ৯৯ শতাংশ মানুষের সহায়-সম্পদের সীমাহীন লুটপাট। এ যেন শুধু পুকুর চুরি নয়, একেবারে সাগর চুরি। দেশের অপ্রদর্শিত কালো টাকার পরিমাণ জাতীয় আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ। প্রদর্শিত সাদা টাকার সিংহভাগও মুষ্টিমেয় ব্যক্তি ও পরিবারের ‘অনুপার্জিত আয়ের’ ফসল। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, ডেসটিনি-যুবক প্রভৃতির প্রতারণা বাণিজ্য, সোনালী ব্যাংকসহ পাবলিক-প্রাইভেট ব্যাংকের ক্ষমাহীন অনিয়ম, নিয়োগ-ব্যবসার বড় বড় সিন্ডিকেটেড লুটপাট ইত্যাদি লুটপাটের বিস্তৃতি ও মাত্রাকে উন্মোচিত করে দিয়েছে। এগুলো হলো কেবল ‘ধরা খাওয়া’ লুটপাটের ঘটনা। এ থেকেই জনগণ অনুমান করতে পারছে যে, ‘পার পেয়ে যাওয়া’সহ মোট লুটপাটের পরিমাণ কত বিশাল। দেশ আজ লুটপাটের এক অবাধ লীলাভূমি হয়ে ওঠায় সমাজে ধনবৈষম্য ও শ্রেণিবৈষম্য বেড়ে চলেছে। বাড়ছে সামাজিক নৈরাজ্য ও বিস্ফোরণের উপাদানগুলো।

দেশে অবাধে ও প্রায় খোলামেলাভাবে চলছে বিদেশি কোম্পানি ও সংস্থার কাছ থেকে ক্ষমতাসীনদের কমিশন খাওয়ার ‘উৎসব’। প্রশাসনের লোভী কর্মকর্তা-ক্যাডারদের টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের সম্পদ লুটে নিচ্ছে। এসব সম্ভব হচ্ছে রাষ্ট্র ও সরকার ‘পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের’ প্রবাহে দেশকে পরিপূর্ণভাবে নিমজ্জিত করা ও ‘অবাধ বাজার-অর্থনীতির’ পথ অনুসরণ করার ফলে। দেশকে করে তোলা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের আজ্ঞাবহ সেবাদাস। দেশের বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার বা ক্ষমতায় থাকার জন্য তাদের ‘মদদ’ পাওয়ার আশায় এসব বিদেশি প্রভু শক্তির মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধে জন্ম নেওয়া শোষণমুক্ত সমঅধিকারভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার বদলে প্রায় চার যুগ ধরে তার বিপরীত ধারায় দেশ পরিচালিত হয়েছে। জনগণের স্বপ্নভঙ্গ ও হতাশার সুযোগ নিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িকতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ক্ষমতার সমীকরণ মেলানোর প্রয়োজনে বুর্জোয়া দলগুলো সাম্প্রদায়িক শক্তির মদদ পেতে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। দেশ আজ এই মহাবিপদের সম্মুখীন।

সরকার আসে যায়, অথচ মানুষের জীবনযন্ত্রণা, শোষণ-বৈষম্য, অত্যাচার-অধিকারহীনতা দূর হয় না। প্রশ্ন হলোÑ ডজন ডজন বার ‘গদির’ বদল হওয়া সত্ত্বেও মানুষের ‘অবস্থা’ বদল না হওয়ার কারণ কী? এর কারণ হলো দেশে ‘গদির’ বদল হয় কিন্তু ‘নীতির’ বদল হয় না। কিন্তু ‘নীতি-ব্যবস্থার’ বদল না করতে পারলে জনগণের অবস্থাও বদলাবে না। সমাজের পচন ঠেকানো যাবে না। কিন্তু জনগণ এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি যে, যারা প্রচলিত ‘নীতি-ব্যবস্থা’ বদল করবে এমন সরকারকে ক্ষমতায় না আনতে পারলে তাদের এসব সমস্যার সমাধান হবে না। জনগণ যেন ‘নীতি-ব্যবস্থা’ বদলের অপরিহার্যতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে না পারে সেজন্য দেশি-বিদেশি শোষক-শাসকরা খুবই তৎপর। এ ক্ষেত্রে তারা সাম্প্রদায়িকতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাসহ আরও অনেক পন্থা ও কৌশল প্রয়োগ করে।

জাতির সামনে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাষ্ট্র পরিচালনার ও সরকারি কাজকর্মের নীতি-দর্শনের কোথায় কতটা কোন অভিমুখে পরিবর্তন, সংশোধন, পরিমার্জন, উন্নতিসাধন ইত্যাদি করা প্রয়োজন সেটি নির্ধারণ করা। কিন্তু রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কে সে বিষয়টি গৌণ হয়ে থাকছে। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক-সামাজিক নীতি-দর্শন-ব্যবস্থার বিষয়টি আড়ালে পড়ে থাকছে।

এসব মৌলিক বিষয় সম্পর্কে জনগণের মতামত গঠন ও চেতনার বিকাশ ঘটানো আজ খুবই প্রয়োজনীয় একটি কর্তব্য। নীতি-ব্যবস্থা বদলের জন্য গণসংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। এই কাজে পিছিয়ে থাকলে, দেশে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, প্রচলিত শোষণভিত্তিক রুগ্ন ‘নীতি-ব্যবস্থার’ কোনো পরিবর্তন হবে না। সে কারণে জনগণের জীবনযন্ত্রণা ও দেশ-জাতির স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে লুটপাটের যে অবস্থা চলছেÑ সে ক্ষেত্রে তেমন কোনো হেরফের ঘটবে না।

অর্থনীতি-সমাজ-রাজনীতি-রাষ্ট্রÑ সব ক্ষেত্রে আজ পচনের যে প্রক্রিয়া দেশের অস্তিত্বকে ধ্বংস করতে উদ্যত, তার সবগুলোই এক সূত্রে গাঁথা। হোক তা ‘ক্যাসিনো’-কা-, ছাত্রলীগ নেতাদের ‘পার্সেন্টেজ’-কা-, ‘বালিশ’-কা-, ‘নারী-শিশু ধর্ষণ’-কা-, ‘গুম খুন’-কা-, ‘দৈনন্দিন জীবন যন্ত্রণা’-কা-, ‘বেকারত্ব-বৈষম্য’-কা- ইত্যাদির সবকিছুই আন্তঃসম্পর্কিত। শরীরের সব রক্ত দূষিত হলে তার উপসর্গগুলো যেমন নানা ‘লক্ষণের’ মধ্য দিয়ে প্রকাশ হয়ে পড়তে থাকেÑ সমাজদেহের অবস্থাও আজ তেমনই হয়ে উঠেছে। অবস্থাটি ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দিব কোথা’র মতো। এই রোগের উপসর্গ ও লক্ষণগুলো নিরসন করতে হলে এসবের উৎসমূলকে ‘টার্গেট’ করতে হবে। সেজন্য একটি সার্বিক (ঐড়ষরংঃরপ) পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি বড় রকমের ঝাঁকুনি দিতে হবে। দেশের সার্বিক পচন রোধ করে তার প্রগতিশীল পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে একটি সার্বিক সমাজ বিপ্লব সংগঠিত করা আজ অপরিহার্য ও জরুরি হয়ে উঠেছে।

‘ক্যাসিনো-ব্যবসায়’ ও ‘পার্সেন্টেজ-ব্যবসায়’ লিপ্ত যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দু-একজন শীর্ষ অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সমর্থনযোগ্য বটে। তবে এ ক্ষেত্রে একথা মনে রাখতে হবে, শুধু এটুকু দিয়ে চমক সৃষ্টি করা গেলেও রোগের মূল উৎস এর দ্বারা অপসারিত হবে না। সমাজকে রোগমুক্ত করতে হলে, রোগের মূল উৎস তথা ‘লুটেরা ধনবাদী’ অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থাকে উৎপাটিত করতে হবে। অন্যথায় তা শুধু সাময়িক ‘আইওয়াশ’ হয়ে থাকবে। এটি হবে সে রকম, যেমন একবার আশির দশকের দিকে বিদেশি সাংবাদিকদের ভেতর কর্মরত সিআইএ-র মূল ‘এজেন্টদের’ আড়াল করার জন্য সিআইএ নিজেই তার একটি আংশিক ‘এজেন্ট তালিকা’ প্রকাশ করে দিয়েছিল। কিংবা যেমন কিনা একটি টিকটিকি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টায় কখনো কখনো নিজের লেজটি পরিত্যাগ করতে দ্বিধা করে না। ঘুষ-দুর্নীতি-চাঁদাবাজি-অনাচারবিরোধী অভিযান কতদিন ও কতদূর পর্যন্ত চলে, তা দেখতে হবে। ’৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু অনাচারের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান শুরু করলেও দলের ভেতর থেকে সেটির বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ ওঠায় অল্পদিন পরেই তিনি তা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই অভিযানের ‘শক্ত হাত’ শেষ পর্যন্ত ‘লুটপাটের ব্যবস্থা’ অপসারণে পদক্ষেপ পর্যন্ত পৌঁছায় কিনা সেটিও দেখতে হবে। এসব না দেখে এই অভিযান সম্পর্কে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। তবে মানুষ চায় যে এই অভিযান সঠিক পথে ও শক্তভাবে অগ্রসর হোক!

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

advertisement