advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ফুসফুসে দগ্ধ ঘা

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০১:০২
advertisement

বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব বাংলাদেশে ভয়াবহভাবে দেখা যাচ্ছে। সাত সকালে বাইরে বেরোলেই মুখোমুখি হতে হয় প্রচ- তাপদাহের। সূর্যের তেজে বিপর্যস্ত জনজীবন। বৃষ্টির সময় বৃষ্টি না হয়ে তাপে পুড়ছে চারদিক। শরৎ-হেমন্ত কখন আসে, কখন যায় কিছুই টের পাওয়া যায় না। শরতের সেই মন ভোলানো জ্যোৎস্না নেই, আকাশে ছেঁড়া মেঘের ভেলা নেই। হেমন্তের শিশিরের ছিটেফোঁটা নেই। নবান্নের গান নেই। আগের মতো ফুলের সৌরভে মাতে না বাড়ির আঙিনা। গাছে গাছে রঙবেরঙের পাখপাখালি দেখা যায় না আগের মতো। বরং পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ায় বেড়ে গেছে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ। উষ্ণ আবহাওয়া এসব অপকারী কীটপতঙ্গের প্রজননে আরও রসদ জোগাচ্ছে। ডেঙ্গুর বাড়বাড়ন্তই তার বড় প্রমাণ।

দিনের আকাশে রাতের অন্ধকার। কু-লী পাকানো ধোঁয়ায় ক্রমেই ঢেকে যাচ্ছে সূর্যের অবয়ব। চারদিকে গনগনে আগুনের লেলিহান শিখা এগিয়ে যাচ্ছে গাছের সারি গ্রাস করতে। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার কেবলই আগুন! দাউ দাউ আগুন। বনের ভেতর ভারী বাতাস। সে বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠছে বন্যপ্রাণীর করুণ আর্তিতে। কোথায় ছায়া? কোথায় আশ্রয়? নিষ্ঠুর আগুনে জ্বলছে জাগুয়ার, শিম্পাঞ্জি, লেমুর, শ্লথ, কাঠবিড়ালি, সাপ, তাপির, মানাতি, ইঁদুর, বাদুড়, ব্যাঙসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী। আগুনের বিষবাষ্পে ঝলসে যেতে যেতে ঢলে পড়ছে মৃত্যুর কোলে। এ কোনো গল্প নয়। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আমাজনের দাবনলের খ-চিত্র।

প্রকৃতির বিপুল বিস্ময় আমাজন। বিশ্বের রহস্যঘেরা জায়গা। অনেক দুর্লভ প্রাণীর বসবাস এ বনে। বলতে গেলে আমাজন নদীই আমাজন বনকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এ নদী আমাজন অঞ্চলের প্রাণবৈচিত্র্যের প্রধান উৎস এবং হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা এ জঙ্গলের সূতিকাগার। নয়টি দেশের প্রায় ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে বিস্তৃত আমাজন বনাঞ্চল। আয়তনে বাংলাদেশের তুলনায় ৩৮ গুণ বড়। এ বনের ৬০ শতাংশ ব্রাজিল, ১৩ শতাংশ পেরু, ১০ শতাংশ কলম্বিয়া এবং বাকি ১৭ শতাংশ অন্যান্য ছয়টি দেশে (বলিভিয়া, ইকুয়েডর, ভেনিজুয়েলা, গায়ানা, সুরিনাম ও ফরাসি গায়ানা) অবস্থিত। পৃথিবীতে যে পরিমাণ চিরহরিৎ বন বা রেইনফরেস্ট আছে, তার অর্ধেকই হলো আমাজন। এ বনে ৪০ হাজার প্রজাতির প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কোটি গাছ রয়েছে। বিশ্বের ২৫ শতাংশ ফার্মাসিউটিক্যাল ওষুধের গাছ আসে আমাজান থেকে। আমাজন বনাঞ্চলে ৩০ লাখ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ রয়েছে। বনটিতে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ জায়গা বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ ব্যবহার করছে। এদের বেশিরভাগ ব্রাজিলীয়।

‘পৃথিবীর ফুসফুস’খ্যাত রহস্যঘেরা স্থান আমাজন। বনটিতে এমনও অনেক জায়গা আছে, যেখানে আজ পর্যন্ত মানুষের পা পড়েনি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেইনফরেস্ট তো বটেই, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রিভার বেসিনও। নিউইয়র্ক শহরে ১২ বছরে যত পানি ব্যবহৃত হয়, আমাজন নদীতে তার চেয়েও বেশি পানি প্রবাহিত হয় একদিনে। বিপুল প্রবাহে বয়ে চলা আমাজন নদীর অববাহিকায় প্রায় সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার ব্যাপ্তি নিয়ে অবস্থান এই চিরহরিৎ বনের। পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয় আমাজন থেকে। তার থেকেও বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নেয় এ বনভূমি। প্রায় ২০০ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশাল এ বনাঞ্চল।

আমাজনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, বনটি প্রাচীনকাল থেকেই দুর্গম। অতীতে মানুষ এ বনে সোনা, রুপার খোঁজ করত, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এ রহস্যঘেরা বনে অনেক সম্পদ ছড়িয়ে আছে বলে মানুষের ধারণা। যেমন পর্তুগিজের মানুষ বিশ্বাস করত, বিশাল এ বনের মধ্যে লুকিয়ে আছে ‘এলডোরাডো’ নামের এক গুপ্ত শহর। ধারণা করা হতো, শহরটি সোনায় মোড়ানো। ওই সোনার শহরের খোঁজ আজও চলছে। সোনার শহরের ধারণাটি এসেছে গ্রিক পৌরাণিক গল্প থেকে। ওই গল্পে বলা হয়েছেÑ ‘এলডোরাডো’ নামক সোনায় মোড়ানো শহরটি পাহারা দেয় একশ্রেণির বিশেষ নারী যোদ্ধা। যাদের গল্পে ‘আমাজন’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। পর্তুগিজ, স্প্যানিশ ও ফ্রেঞ্চ অভিযাত্রীরা প্রতিযোগিতায় নামেন ওই ‘এলডোরাডো’ শহর আবিষ্কারের জন্য। কিন্তু এ পর্যন্ত কেউই ওই কাল্পনিক শহরের খোঁজ পাননি। শহরের সন্ধান না পেলেও আমাজনের নামটি স্থায়ী হয় সেই নারী যোদ্ধাদের নামে। তাদের নামানুসারেই জঙ্গলের নাম হয় ‘আমাজন’।

আমাজন পুড়ছে। গাছপালা পুড়ছে। জীবজন্তু পুড়ছে। পৃথিবীর ফুসফুস পুড়ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও এক ধাপ বাড়ল। এমনিতেই মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে। ঝুঁকি বাড়ছে উপকূলবেষ্টিত নিম্নাঞ্চলের। পুরোপুরি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দিন গুনছে অনেক দেশ। এর মধ্যে আমাজন পুড়ে গিয়ে সৃষ্টি হলো অপূরণীয় আরেক ক্ষতের।

কত অল্প সময়ের মধ্যে দুরারোগ্য ডেঙ্গুর জীবাণু কেড়ে নিল অমূল্য প্রাণ! এভাবে প্রতিনিয়ত দুরারোগ্য ব্যাধি হুমকির মুখে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। মহাবিপন্ন শকুনের কথাই ধরা যাক। শকুন হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি থেকে। আগের মতো উঁচু কোনো গাছ নেই, যে গাছে শকুন বাসা বাঁধবে। অথচ এই শকুন ক্ষতিকর রোগজীবাণুগ্রস্ত মৃত পশু খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এদিকে আমরা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ নানা রোগের অশনিসংকেত নিয়ে পার করছি অস্থির সময়। দাবানলের কারণে আমাজনের আজকের এই দুর্দশা আমাদের সামগ্রিক দুর্দশাকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিল।

প্রকৃতিবিদরা বলেন, বনে দাবানল একটি সাধারণ ঘটনা। দাবানল তৈরি হতে পারে বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে, যেমনÑ বজ্রপাত, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, এলনিনো ধরনের আবহাওয়ার চক্রাকার পরিবর্তন, দাবদাহ ইত্যাদি। এমনকি শুকনো মৌসুমে গাছের ডাল শুকিয়ে এতটাই খটখটে হয়ে থাকে যে, বাতাসের কারণে ডালে ডালে ঘষা লেগেও আগুন ধরতে পারে। আমাজনের শুকনো মৌসুম জুলাই থেকে অক্টোবর। এ সময় আগুন লাগার হারটা অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি। কিন্তু পরিবেশ সংরক্ষণবাদীদের অভিযোগ, আমাজনে আগুন লাগায় প্রকৃতিসৃষ্ট কারণের চেয়ে মনুষ্যসৃষ্ট কারণই বেশি দায়ী। গবাদিপশুর চারণভূমি হিসেবে জমি ব্যবহার করতে চাওয়া কৃষকরা কৃষিজমি বাড়াতে শুকনো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন। এ সময় বন শুকনো থাকায় খুব সহজেই আগুন লেগে যায়। অনেক সময় সিগারেট বা ক্যাম্পফায়ার থেকেও আগুনের সূচনা হয়ে থাকে। তবে এবার সোনা ও মূল্যবান খনিজ সন্ধানীদের দিকেও আঙুল উঁচিয়েছেন পরিবেশবাদীরা। তাদের দাবিÑ স্বার্থান্বেষী লোলুপগোষ্ঠী বনের উপরিভাগ পরিষ্কারের জন্য আগুনের সূচনা করে থাকতে পারে, যা এবার মাত্রা ছাড়িয়েছে একাধিকবার আগুন লাগার ঘটনাকে। ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘ইনপে’র এক সমীক্ষা বলছেÑ এ বছর আমাজনে ৭২ হাজার ৮৪৩টি দাবানলের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় যা ৮৩ শতাংশ বেশি!

দাবানলে দগ্ধ পৃথিবীর ফুসফুস। নিঃশেষ করে দিয়েছে আমাজনের অনেকটা জীবনীশক্তি। আমাজনের দাবানলে সৃষ্ট ধোঁয়া ও কালো ছাইয়ের আস্তরণ মেঘে চড়ে পাড়ি দিয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৭০০ মাইলেরও বেশি পথ। ছড়িয়ে পড়েছিল আমাজন সংযুক্ত আশপাশের দেশজুড়ে। ব্রাজিলের সাও পাওলোর আকাশ ছেয়ে গিয়েছিল ছাইভরা মেঘে। শহরটি ঘণ্টাখানেকের জন্য ডুবেছিল কালো অন্ধকারে। ব্রাজিলের রোরাইমা প্রদেশ থেকে পেরুর আকাশেও হানা দিয়েছিল সেই ধোঁয়া। অক্সিজেনের আধার পুড়ে গিয়ে প্রকৃতিতে যোগ হয়েছে ২২৮ মেগা টন কার্বন ডাই-অক্সাইড। গাছের আগুনের জন্য বাতাসে মিশেছে প্রাণঘাতী গ্যাস কার্বন মনোক্সাইড, যা বৈশ্বিক আবহাওয়া ও জলবায়ুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং হুমকির।

আবহাওয়া, ভৌগোলিক অবস্থান, ক্রমাগত বিরূপভাবে পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক জলবায়ু, মানুষের করাল আঘাতসহ নানা কারণে ধ্বংস হচ্ছে আমাজন। গত ৪০ বছরে আমাজনের প্রায় ২০ শতাংশ ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। ২০০৪ সালে আমাজনের ২৭ হাজার বর্গকিলোমিটার বন উজাড় হয়েছিল, যা একটি রেকর্ড। বন উজাড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে কাঠ। অবৈধভাবে উজাড় হওয়া আমাজন এখন চারণক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাজনের ভেতর সোনার খনি খুঁজে বেড়ায় সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিরা। শত শত বছর ধরে আমাজন এই সোনা সন্ধানী চোরাকারবারিদের হাতে ধ্বংস হচ্ছে। প্রতিদিনই আমাজনকে ধ্বংস করে চলেছে মানুষ। পেনসিলভানিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক জেমস এলকক বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমাজন অরণ্য আগামী ৫০ বছরের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে পারে। ব্যাপক অপরিকল্পিত বন নিধনই হবে এর কারণ। ইমপের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালে আমাজনের ৭ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বনাঞ্চল হারিয়ে গেছে, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে ক্ষতির কারণ না হলেও উদ্ভূত বৈশ্বিক পরিস্থিতি এ দেশের বিপক্ষে। বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনধারণের গতি-প্রকৃতি। আগে যে জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তিনি এখন নদীতে আর আগের মতো মাছ পান না। বাধ্য হয়ে তিনি শহরে যাচ্ছেন বিকল্প জীবিকার জন্য। দক্ষিণাঞ্চলে যে কৃষক চাষের জমিতে সোনালি স্বপ্নের আবাদ করতেন, তিনি এখন নোনা মাটিতে সব স্বপ্ন-সাধ পুঁতে চাকরি নিচ্ছেন কল-কারখানায়। চাপ বাড়ছে শহরাঞ্চলে। দূষিত হচ্ছে নগরী। ভারী হচ্ছে ঝুঁকির পাল্লা। এখন পৃথিবীর ফুসফুস আমাজনের অনেকটা পুড়ে যাওয়ায় সে পাল্লা আরও ভারী হলো।

মুকিত মজুমদার বাবু : চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন

advertisement