advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বিপ্লবী নারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

অলোক আচার্য
২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০১:০২
advertisement

স্বাধীনতা এমন একটি শব্দ যা মানুষের জন্মগত অধিকার। মুক্ত হাওয়া, মুক্ত পরিবেশ এবং বাধাহীন শৈশবে বেড়ে ওঠার সঙ্গে আত্মপরিচয়ে বাঁচতে শেখার নাম স্বাধীনতা। বাংলার ইতিহাসে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর থেকে বাংলার স্বাধীনতা অন্যের হাতে চলে যায়। আজ আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ব্রিটিশ এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানিদের হাত থেকে স্বাধীন হতে বহু জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছে। যুগে যুগে এসেছে বীর নারী-পুরুষ। যারা স্বাধীনাতর স্বপ্ন দেখেেেছন এবং দেখিয়েছেন। ব্রিটিশ শাসনামলে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা এমন একজন নারীর নাম প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতেও পারব, প্রাণ নিতেও মোটেও মায়া হবে না। কিন্তু নিরীহ জীব হত্যা করতে সত্যি মায়া হয়, পারব না এই উক্তিটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মরণীয় নাম প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের।

পৃথিবীতে যুগে যুগে দেশের জন্য বুকের রক্ত বিলিয়ে দিয়েছেন। আমাদের দেশ পাকিস্তানিদের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার আগে অর্থাৎ দেশভাগের আগে ব্রিটিশদের অধীনে ছিল। তখন ভারতবর্ষকে মুক্ত করার জন্য বহু আন্দোলানকারী ব্রিটিশদের হাত থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করতে আন্দোলন করেছেন। কিশোর, যুবা, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে সবাই এই আন্দোলন করেছেন। ক্ষুদিরাম বসু নিজের হাতে বোমা বানিয়ে ট্রেনে হামলা চালিয়েছিলেন সাহেবদের দর্প চূর্ণ করতে। দুর্ভাগ্যবশত সেই বোমায় নিহত হয় নিরীহ ভারতবাসী। সে অপরাধে তার ফাঁসি হয়। এ রকম বহু স্বাধীনতাকামী স্বাধীনতার জন্য বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষদের স্বাধীনতাকামীদের নামই বেশি শোনা যায়, আলোচিত হয়। নারী স্বাধীনতাকামীদের কথা খুব একটা আলোচনায় আসে না। হয়তো সে সংখ্যা হাতেগোনা বলেই। প্রীতিলতার নাম ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে একসঙ্গে গাঁথা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে অনেক বিপ্লবী পুরুষের নাম শোনা গেলেও নারী বিপ্লবীর নাম কমই শোনা যায়। এদের গুটিকয়েকজনের মধ্যে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার নামটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে এবং থাকবে। একজন নারী সেই সময়ের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মাতৃভূমি মুক্ত করতে, চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে যে আত্মাহুতি দিয়েছিল তা আজও মানুষের মনে অম্লান। তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তিনি ছিলেন প্রথম বিপ্লবী মহিলা শহীদ যা যুগ যুগ ধরে নারীদের অনুপ্রেরণা দেয়, সাহস জোগায়। প্রীতিলতার জন্ম ১৯১১ সালের ৫ মে এবং মৃত্যু ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বার।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। আজকের নারী সমাজে পুরুষতান্ত্রিক যে মনোভাব, যে অত্যাচার তার বিরুদ্ধে প্রীতিলতার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার শিক্ষা নেওয়া যায়। দেশের জন্য, দেশের মানুষের স্বাধীনতার জন্য, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন প্রীতিলতা। যে বছর তিনি শহীদ হন সে বছর পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব দখলের সময় তিনি ১৫ জনের একটি বিপ্লবী দল পরিচালনা করতেন।

ভীষণ লাজুক স্বভাবের প্রীতিলতার ডাকনাম ছিল রানী। তার মা তাকে এই নামে ডাকত। লাজুক স্বভাবের এই মেয়েটিই যে একদিন প্রচ- সাহসিকতার সঙ্গে দেশের জন্য জীবন বাজি রাখবে তা কজনে ভেবেছিল। প্রখর মেধার অধিকারী হওয়ায় তার পিতা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার মেয়েকে ডা. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি করান। ঢাকার ইডেন কলেজে পড়ার সময় বিপ্লবী লীলা নাগের সংস্পর্শে আসে। এই লীলা নাগ ওই সময় দীপালি সংঘের সংস্পর্শে আসেন। দীপালি সংঘ ছিল ঢাকার বিপ্লবী দল শ্রীসংঘের নারী শাখা। তার বিপ্লবী চেতনা মূলত এখান থেকে প্রভাবিত হয়েছে। একটি বিপ্লবী চেতনা জন্ম থেকেই থাকে। প্রয়োজন কেবল সময় ও সঠিক পথের। বিকশিত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রীতিলতার সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত আছে আরেক সংগ্রামী মাস্টারদা সূর্যসেন।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে বহু নাম জড়িয়ে রয়েছে। বহু বিল্পবীর রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে ভারত ও পাকিস্তান এবং তার অনেক পরে বাংলাদেশ হয়েছে। মাস্টারদার যোগ্য শিষ্য প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন। ১৯৩২ সালের ১৩ জুন চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের প্রধান কেন্দ্র ধলঘাটের ঘাঁটিতে মাস্টারদার সঙ্গে প্রথম দেখা করেন প্রীতিলতা। তার আগে তার বান্ধবী কল্পনা দাশের কাছে মাস্টারদার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা পোষণ করেন। এই বান্ধবীই তাকে মাস্টারদার সান্নিধ্যে আসার ব্যবস্থা করেন। স্কুলজীবন থেকেই প্রীতিলতা তার মনে স্বাধীনতার ইচ্ছা পোষণ করত। সেটা তাই পড়া বইয়ের তালিকা থেকেই বোঝা যায়। প্রীতিলতা যখন দশম শ্রেণির ছাত্রী তখন লুকিয়ে লুকিয়ে তিনি বাঘা যতীন, ক্ষুদিরাম, দেশের কথা আর কানাইলাল পড়তেন। মনে হয় মনে মনে তিনি নিজেকে স্বাধীনতার একজন যোদ্ধা হিসেবে প্রস্তুত করছিলেন। এসব বই প্রীতিলতাকে বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে। ভেতরে ভেতরে দেশকে শত্রুমুক্ত করার স্বপ্ন দেখতে থাকেন। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের, বিশেষ করে বিট্রিশ শাসনের হাত থেকে দেশের মানুষকে বাঁচানোর চিন্তা করতে থাকেন। প্রীতিলতার মায়ের ডাকা রানী নামটি সার্থক। কারণ তিনি আজও মানুষের মনে রানীর মতোই বেঁচে আছেন।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বিপ্লবী চেতনার যে বিশ্বাস জন্ম দিয়েছেন তা যুগ যুগ ধরে স্বাধীনতাকামী মানুষকে প্রেরণা দিয়েছে। তা আজও প্রবহমান। কারণ বিপ্লবের মৃত্যু হয় না।

অলোক আচার্য : শিক্ষক ও সাংবাদিক

advertisement