advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী প্রভোস্টের বাসায় ‘ধর্ষণচেষ্টা’, কোথায় নিরাপদ ছাত্রীরা?

জাকির হোসেন তমাল
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৭:২১ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৮:৫৫
প্রভোস্টের ছোট ভাই শ্যামল বণিক
advertisement

রাজশাহী শহরে টিউশনি পাওয়া একটু কঠিন বটে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনেক চেষ্টা করেও সহজে একটা টিউশনি পান না। দীর্ঘ দিনের সেই সংকট এখনো কাটেনি। তারপরও নিজের যোগ্যতা ও যোগাযোগের মাধ্যমে অনেকের বাসায় গিয়ে টিউশনি করান তারা। সেখানেই এবার পড়েছে ‘কালো থাবা’, যা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এক ছাত্রী টিউশনি করাতেন ক্যাম্পাসের পাশে ধরমপুর এলাকার যোজক টাওয়ারের একটি বাসায়। ওই বাসাটি তার হল প্রভোস্টের, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা বিভাগের নারী অধ্যাপক। হলে পরিচিত হওয়ার পর এবং নিজের এলাকার হওয়ায় ওই অধ্যাপকের বাসায় গত দুই মাস ধরে পড়াচ্ছিলেন তিনি। এর জন্য মাসে তাকে দেওয়া হতো দুই হাজার টাকা। সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত হল প্রভোস্টের বাসায় গিয়ে তার মেয়েকে ইংরেজি বিভাগে পড়াতেন ওই ছাত্রী।

টিউশনি শুরুর পর সব ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু গত মঙ্গলবার ওই ছাত্রীর ওপর নেমে আসে এক ‘কালো থাবা’, যা থেকে বাঁচতে ওই ছাত্রী ফোন করেন পুলিশের বিশেষ সেবা দেওয়ার ৯৯৯ নম্বরে। ফোন পেয়ে সেই বাসায় যান পুলিশ সদস্যরা। গিয়ে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করেন।

ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়েছে কি না, বিষয়টি নিশ্চিত হতে শারীরিক পরীক্ষার জন্য তাকে ভর্তি করা হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে। ওই ঘটনায় সেই অধ্যাপকের ছোট ভাই শ্যামল বণিককে আটক করে পুলিশ। গতকাল বুধবারই ওই ছাত্রীকে ‘ধর্ষণচেষ্টা’র অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে থানায় মামলা করা হয়। সেই মামলায় শ্যামল বণিককে কারাগারে পাঠানো হয়।

সেই রাতে যা ঘটেছিল

শ্যামল বণিকের বোন ওই হল প্রভোস্ট জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ছিল তার স্বামীর মৃত্যুবার্ষিকী। এ কারণে টিউশনি শেষে ইংরেজি বিভাগের ওই ছাত্রীকে রাতে তার সঙ্গে থাকার অনুরোধ করা হয়। তাই রাতে তিনি সেই নারী অধ্যাপকের সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমাতে যান। তাদের পাশের কক্ষে ছিলেন অধ্যাপকের দুই মেয়ে, আরেকটি কক্ষে ছিলেন তার ভাই শ্যামল বণিক। রাত দেড়টার দিকে হল থেকে ওই অধ্যাপকের কাছে ফোন যায়। হলের এক আবাসিক ছাত্রীর ঝামেলা হয়েছে, বিষয়টি মীমাংসা করানোর জন্য ওই হলের প্রভোস্ট বাসা থেকে রাত ২টার দিকে হলে যান। 

গভীর রাতে হলে যাওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য, জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক, ছাত্রলীগের সভাপতি, পুলিশসহ অনেককে ফোন করেন ওই হল প্রভোস্ট। পরে তিনি রাত ২টার দিকে হলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

প্রভোস্ট হলে যাবেন শুনে ওই ছাত্রীও তার সঙ্গে হলে ফিরতে চেয়েছিলেন। তিনি ওভাবে প্রভোস্টের বাসায় থাকতে চাননি। কিন্তু ওই প্রভোস্ট তাকে হলে আনেননি। এ বিষয়ে প্রভোস্ট জানান, এত রাতে ছাত্রীকে হলে নিয়ে আসাটা খারাপ দেখায় বিধায় তিনি তাকে রুমে রেখে এসেছিলেন। রাত ৩টার দিকে বাসা থেকে তার কাছে ফোন আসে। সমস্যার কথা শুনে তাৎক্ষণিক তিনি বাসায় যান। গিয়ে শোনেন, তার ভাই ওই ছাত্রীকে ‘ধর্ষণ’ করেছেন। এরই মধ্যে পুলিশ গিয়ে তার ভাইকে আটক করে এবং ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে। 

ভাইকে বাঁচাতে ওই ছাত্রীর ‘দোষ খুঁজছেন’ প্রভোস্ট

নিজের ভাই সম্পর্কে ওই অধ্যাপক বলছিলেন, ‘আমার ভাই দীর্ঘ দিন ধরে বাসাতেই থাকে। সে নিরামিষভোজী, শাক-সবজির বাইরে তেমন কিছুই খায় না। সে ইসকন (কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ) ভক্ত।’ এসব বলে ভাইকে এই ঘটনায় নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করেছিন তিনি।

এসব তথ্য দেওয়ার আগে ওই প্রভোস্ট দীর্ঘ এক বক্তব্য তুলে ধরেন। গতকাল প্রায় ঘণ্টা খানেকের ওই বক্তব্যে তিনি ইংরেজি বিভাগের ওই ছাত্রীর নানা দোষ-ত্রুটির কথা বলতে চেষ্টা করেন। শুধু তাই নয়, এই ঘটনায় নিজের ভাইকে বাঁচাতে ওই ছাত্রীর দোষ খুঁজতে হলে মিটিং বসান। হলের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কয়েকজন ছাত্রীকে দিয়ে ওই ছাত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরার চেষ্টা করেন। সেগুলো আবার সাংবাদিকদের কাছেও বলেন।   

অথচ নিজের বাসায় টিউশনি করানো ছাত্রীর এমন পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষকের মুখে ভিকটিমের দোষ খোঁজার বিষয়টিও এক ধরনের অপরাধ। গণমাধ্যমকর্মী, হলের ছাত্রী ও অন্যদের কাছে এখন ওই ছাত্রীকে খারাপ হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন প্রভোস্ট। বিষয়টি খুবই পরিতাপের। একজন শিক্ষক বড় অভিভাবক হিসেবে কাজ করেন। সেই অভিভাবক যখন অপরাধকে গোপন রাখতে একজন ভিকটিম ছাত্রীকে আরও ফাঁসাতে চান, তখন স্পষ্ট হয় ওই প্রভোস্ট অপরাধ করছেন। সেই অপরাধে তার বিচার হওয়া উচিত।  

আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা

সেই প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ করেছেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ওই ছাত্রীর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে ‘মিথ্যা তথ্য‘ দেওয়ার কারণে সবার সামনে প্রভোস্টকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে তার বাসায় এমন ঘটনার জন্য তিনি নৈতিকভাবে পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন, তাই তাকে পদত্যাগের দাবি জানান। সেই দাবির পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হল প্রভোস্টের পদ থেকে ওই অধ্যাপককে সরিয়ে দেওয়ার মৌখিক সিদ্ধান্ত নেয়।     

ছাত্রীদের বিশ্বাস ‘ভেঙে গেছে’

বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী অধ্যাপকের বাসায় তার সন্তানকে পড়াতে গিয়ে যদি কোনো ছাত্রীকে এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়, ছাত্রীরা যাবেন কোথায়? টিউশনি করানোর সবচেয়ে নিরাপদ স্থানই তো আক্রান্ত হলো। তাহলে ছাত্রীরা কীভাবে টিউশনি করাবেন? কীভাবে তারা সামনে এগিয়ে যাবেন?  

ইংরেজি বিভাগের ওই ছাত্রী যদি জানতেন, তার শিক্ষকের বাসায় তিনি এমন পরিস্থিতিতে পড়বেন, তা-ও আবার সেই অধ্যাপকের ভাইয়ের দ্বারা, তাহলে কোনো দিন হয়তো তিনি সেখানে পড়াতে যেতেন না। কিন্তু যখন তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবুও নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। এরপর ওই ছাত্রীর কী হবে, কেউ জানেন না। তার পাশে কে দাঁড়াবে, এই অন্যায়ের প্রতিবাদ কীভাবে হবে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কে দেবে, সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি কি ধর্ষণের পক্ষে? 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী তার হল প্রভোস্টের বাসায় গিয়ে ‘ধর্ষণচেষ্টা’র শিকার হলেন, এমন তথ্য জানার পরও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ওই ছাত্রীর পাশে দাঁড়ায়নি বা অধ্যাপকের বিচার চায়নি। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট কাউন্সিলে থাকা শিক্ষকরাও কোনো বিবৃতি দেয়নি। তাহলে তারা কি এই অপরাধকে ওই প্রভোস্টের মতোই গোপন করতে চাইছেন, অন্যায়ের পক্ষে থাকছেন? প্রশ্নগুলো এখন খুব স্বাভাবিকভাবেই এসে গেছে।

আজ ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দেখা যায়নি, প্রভোস্ট কাউন্সিলের সদস্যদের দেখা যায়নি। যে প্রভোস্টদের কাছে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিধান করার দায়িত্ব, তারাই আজ অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলছেন না, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন না। বিষয়টি খুবই পরিতাপের।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনা বোধহয় আগে কখনো ঘটেনি। তাই এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিধান করেন। গত কয়েক দিন আগে তিনি ক্যাম্পাসে অনেক শিক্ষার্থীদের ধরেছিলেন, তাদের অপরাধ ছিল সিনেট ভবনে আড্ডা দেওয়া। এখন ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি কী করবেন, সেটাই দেখার বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তা করার সময় এসেছে। প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা হয়তো তাদের সেই দায়িত্ব পালন করবেন। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ স্থান তৈরি করবেন।   

জাকির হোসেন তমাল : সাংবাদিক

advertisement