advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পচন ঠেকাতে ‘বিকল্পের’ কোনো বিকল্প নেই

28.jpg
৭ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৭ অক্টোবর ২০১৯ ০১:১৩
মৃুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। পুরোনো ছবি
advertisement

‘ঘুণে ধরা এ সমাজ ভাঙতে হবে’Ñ পাকিস্তান আমল থেকে এ কথা আমরা বলে চলেছি। সাম্প্রতিক কিছু ‘চমকপ্রদ’ দুরাচারের ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ‘শুদ্ধি অভিযান’ পরিচালনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে এখন প্রায় সবকিছুতেই ‘উইপোকা’ ঢুকে পড়েছে। তিনি মিথ্যা বলেননি। যে পচন প্রক্রিয়া সমাজ ও রাষ্ট্রকে আজ গ্রাস করেছে, তাতে তাকে ‘উইপোকা ধরার’ মতো বিষয় বলা যায় বৈকি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলেননি। ছোটবেলা থেকে বিজ্ঞবানদের মুখে শুনে এসেছি, ‘উইপোকার’ কোনো দাওয়াই নেই। কোনো বাড়িতে ‘উই ধরলে’ তা থেকে বাঁচার কেবল একটি উপায়ই আছে। সেটি হলোÑ বাড়ির ভিটা স্থানান্তর করে সেই নতুন ভিটার ওপর বাড়ি পুনর্নির্মাণ করা। বর্তমানে সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতিতে যে গভীর পচন ধরেছে তার দুর্ভোগ থেকে বাঁচতে কোনো দাওয়াইয়ে বা মেরামতি শুদ্ধি অভিযানে কাজ হবে না। বাঁচতে হলে ভিটা স্থানান্তরের মতো প্রচলিত ‘লুটপাটের ব্যবস্থা’ বদল করে মুক্তিযুদ্ধের নীতি-আদর্শে সমাজতন্ত্র অভিমুখী ধারায় দেশ ঢেলে সাজাতে হবে।

সম্প্রতি দেশবাসী এ কথা জেনে যারপরনাই বিস্মিত হয়েছে যে, ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে বছরের পর বছর ধরে সরকার ও প্রশাসনের নাকের ডগায় কয়েক ডজন অবৈধ ‘ক্যাসিনো’ চালু ছিল। এসব ক্যাসিনোতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার জুয়ার কারবার চলত। ক্ষমতাসীন দল, প্রশাসন, কোটিপতি ব্যবসায়ী, সমাজের ‘উপরতলার’ ভিআইপি/সিআইপিদের মধ্যে অনেকেই এই ‘ক্যাসিনো’ কারবারের সঙ্গে জড়িত ছিল। এর আগেই একের পর এক ছাত্রলীগ নেতাদের কোটি কোটি টাকার ‘পার্সেন্টেজ ব্যবসা’ ও ‘চাঁদাবাজির’ প্রামাণ্য খবর, সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রে ‘বালিশ’-কা-, ‘পর্দা’-কা-, ‘ঢেউটিন’-কা- ইত্যাদি সব অকল্পনীয় লুটপাটের একটার পর একটা ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়েছিল। এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন মহলের পাপকর্ম উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল। সমাজ ও রাষ্ট্রের এহেন পচনের দুর্গন্ধ দেশবাসীকে নতুন করে হতবাক ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সবার মনে আজ প্রশ্নÑ সমাজ ও রাষ্ট্রের এরূপ পচন ঘটল কীভাবে? কী তার উৎস? এ পচন থেকে বাঁচার উপায়ই বা কী?

দশকের পর দশক ধরে যেভাবে দেশ চলছে তাতে ক্ষমতাসীন মহল ও দেশের ১ শতাংশ বিত্তবান সুবিধাভোগী মানুষ আজ সুখে আত্মহারা। কিন্তু অবশিষ্ট ৯৯ শতাংশ দেশবাসী আজ দিশেহারা। দেশের সাধারণ মানুষ ‘বেপরোয়া লুটপাট’ ও ‘অপরাধমূলক কাজকর্মের’ এহেন বিস্তারের চিত্র দেখতে দেখতে প্রায় সবকিছুর ওপর আজ ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে তারা মুক্তি চায়। এই অবস্থার ‘পরিবর্তন’ চায়। কিন্তু সে ‘পরিবর্তন’ কীভাবে আসতে পারে তার দিশা তাদের কাছে স্বচ্ছ নয়। এরূপ ‘পরিবর্তন’ আনতে পারার মতো শক্তির পর্যাপ্ত দৃশ্যমান উপস্থিতিও সেভাবে এখনো তাদের চোখে পড়ছে না। তাই ক্ষোভে ফুঁসলেও তারা তাদের হাত গুটিয়ে রেখেছে। চলতি অবস্থার মধ্যেই ‘কোনরকমে বেঁচে-বর্তে থাকার’ জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করে চলেছে। দেশের সামনে আজ প্রধান চ্যালেঞ্জের উৎস এখানেই নিহিত রয়েছে।

জীবনযন্ত্রণায় কাতর দেশের শ্রমজীবী মানুষসহ জনগণের এই হতাশা ও ক্ষোভ এখনো স্বতঃস্ফূর্ত ও অসংগঠিত। প্রগতি ও গণতন্ত্রের শক্তি এখনো তাকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় সংগঠিত করে ‘বিকল্প’ রাজনৈতিক শক্তির আকার দিতে সক্ষম হয়নি। তাই এই হতাশা ও স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভকে বহুলাংশে কাজে লাগাতে পারছে দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। তারা বর্তমান ব্যবস্থার ‘বিকল্প’ প্রতিষ্ঠিত হতে না দিয়ে তার ‘নব-সংস্করণ’ দ্বারা নিজেদের শ্রেণিগত শোষণ-লুণ্ঠনের ‘ব্যবস্থা’ অব্যাহত রাখার পথ করে রেখেছে। ‘গদি বদল’ ঘটিয়ে হলেও ‘ব্যবস্থা বদলের’ সম্ভাবনা ঠেকিয়ে রাখতে পারছে। ফলে দেশ সমস্যা-সংকটের আবর্তে অব্যাহতভাবে বন্দি হয়ে থাকছে। উগ্র সাম্প্রদায়িক শাসন, সেনা শাসন ইত্যাদি আরও বিপজ্জনক পথে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও এ কারণে আজ দেশে সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে দেশে আজ বিরাজ করছে সংকটের পাহাড়। এসব পর্বতপরিমাণ সংকটের ওপর আরও অতিরিক্ত সংকটটি হলো সংকট নিরসনের সম্ভাবনা দেখতে না পাওয়ার সংকট।

এই অবস্থার জন্য দায়ী হলো দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক ‘ব্যবস্থা’। এর নিদর্শন রয়েছে সব ক্ষেত্রে। ধরা যাক নিয়ন্ত্রণহীন দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতির বিষয়টি। নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রের দাম প্রতিদিনই হু-হু করে বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে ডবল হয়ে গেছে। জনজীবনের এই দুঃসহ যন্ত্রণা সম্পর্কে সরকার অনেকটাই নির্বিকার। এসব ক্ষেত্রে সে শুধু চাহিদা-সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাজারদর ও বাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকছে। অথচ তার অনেক কিছু করার ছিল ও আছে। কিন্তু সে তা করেনি। সরকার নিজে নিত্যব্যবহার্য পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রাখার উপযুক্ত ব্যবস্থা করেনি। রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেনি। শক্তিশালী, দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত গণবণ্টন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেনি। বরং নিজেই সে বারবার বিদ্যুৎ, পেট্রল, ডিজেল, পানি, গ্যাস ইত্যাদির দাম বাড়িয়েছে। অথচ গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয় বাড়েনি বললেই চলে।

অন্যদিকে অল্প কিছু মানুষকে বিপুল ধন-সম্পদের মালিক হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। সরকারের উঁচু মহলের যোগসাজশে এসব করা হচ্ছে। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, যুবক ও ডেসটিনির বাটপারি, হলমার্ক-সোনালী ব্যাংক কেলেঙ্কারি, ভূমিদস্যুতা, চোরাকারবারির রমরমা ব্যবসা, কমিশন বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য প্রভৃতি যে কয়েকটি বড় বড় কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকেই দেশব্যাপী সর্বক্ষেত্রে লুটপাটের সীমাহীন ব্যাপ্তি ও মাত্রা অনুমান করা যায়।

বড় বড় লুটপাটের এসব ঘটনার পাশাপাশি তৃণমূল পর্যন্ত ঘুষ-দুর্নীতি, দলবাজি, তদবিরবাজি, বেপরোয়া দখলদারিত্ব, ভর্তি বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য, জবরদস্তি ইত্যাদির বিস্তার আজ ভয়াবহ মহামারীর আকার ধারণ করেছে। বেড়েছে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি। এসবকে ভিত্তি করে ছড়িয়ে পড়েছে হত্যা, খুন, কিডন্যাপিং, নারী-নির্যাতন, সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী লালন, গডফাদারদের দৌরাত্ম্য, প্রভাব বিস্তার নিয়ে হানাহানি ইত্যাদিসহ অপরাধমূলক নানা কাজকর্ম। একই সঙ্গে অব্যাহত আছে ক্রসফায়ার-হত্যা-গুমের লোমহর্ষক সব ঘটনা। মানুষের জীবনে নিরাপত্তা বলতে আজ আর কিছু নেই। বেডরুম থেকে খোলা মাঠ, কোথাও মানুষ আজ নিরাপদ নয়।

এদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনসেবাÑ সবকিছুকেই পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্রÑ সবকিছুকেই এখন ‘বাণিজ্যিকীকরণ’ করা হয়েছে। লুটপাটের প্রয়োজনে পরিবেশ, প্রকৃতি, প্রাণী-উদ্ভিদজগৎÑ সবকিছুকেই ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। নগদ লাভের লালসায় বিনষ্ট করা হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব।

সামষ্টিক অর্থনীতিতেও এখন রুগ্নতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর্থিক খাতসহ সামষ্টিক অর্থনীতিতে তারল্য সংকট, বিনিয়োগ সমস্যা, সুদের হারের অস্থিরতাসহ নানারকমের অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হচ্ছে। শোষকদের নিজেদের হাতে সৃষ্টি করা ক্ষমতার ভারসাম্য ও ‘প্রশান্তির কাঠামো’ টিকে থাকতে পারছে না। গোটা ‘ব্যবস্থাই’ আজ তার ভেতর থেকেই অস্থিরতা, নৈরাজ্য ও ভাঙনের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে।

অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতি সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ এখন কালো টাকার মালিক ‘লুটেরা অর্থশক্তির’ হাতে চলে গেছে। ‘রাজনীতি’ দখল করে নিয়ে তারাই ‘রাষ্ট্রযন্ত্রকে’ ব্যবহার করে দেশের ওপর নিরঙ্কুশ খবরদারি করছে। দেশে এখন এই ‘ত্রি-অপশক্তির’ একটি ‘ক্রিমিনাল সিন্ডিকেটের’ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অতিসম্প্রতি এই অপরাধ চক্রের ‘মূল সর্দারের’ আসনটি ‘রাজনীতি’ ও ‘লুটেরা অর্থশক্তিকে’ পেছনে ফেলে ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ হাতে চলে গেছে। এর ফলে রাষ্ট্রের চরিত্রে প্রতিক্রিয়াশীল ও ফ্যাসিস্ট প্রবণতার নতুন মাত্রিকতা যুক্ত হয়েছে।

সংবিধানকে এখনো মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনা হয়নি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের শ্রেণিচরিত্র বদলে গেছে। এক সময় এই দলে প্রাধান্য ছিল মধ্যবিত্তের। আওয়ামী নেতৃত্বে এখন লুটেরা ধনিক শ্রেণির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি জন্মলগ্ন থেকেই ছিল লুটেরা ধনিকশ্রেণি দ্বারা পরিচালিত দল। এভাবে গত সাড়ে চার দশক ধরে দেশে এই লুটেরা শ্রেণির শাসন লাগাতারভাবে অব্যাহত থেকেছে। এর পরিণতিতে অর্থনীতি, সমাজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ক্রমাগতভাবে ‘পচন প্রক্রিয়া’ গভীরতর ও বিস্তৃততর হয়েছে। এরই পাশাপাশি গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা আজ বস্তুত ধ্বংস হয়ে গেছে। জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। গত ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে ‘রাষ্ট্রযন্ত্রকে’ সরাসরি ব্যবহার করে ‘দিনের ভোট আগের রাতে’ সম্পন্ন করে ক্ষমতাসীনরা আরও এক দফা ‘ক্ষমতার মসনদ’ দখল করে নিয়েছে।

বাজার অর্থনীতি জন্ম দিয়েছে বাজার রাজনীতির। বাণিজ্যিকীকরণ ও দুর্বৃত্তায়নের খড়গের নিচে পড়ে রাজনীতি হয়ে পড়েছে রুগ্ন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লুটেরাদের মদদে ‘হালুয়া-রুটির অপরাজনীতির’ দাপট ‘আদর্শের রাজনীতিকে’ কোণঠাসা করে ফেলেছে। এসবই হলো বহুলাংশেই দেশি-বিদেশি শাসক শ্রেণির রাজনৈতিক-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফসল।

আমাদের দেশের ওপর সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদ, বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নিয়ন্ত্রণ আরও বেড়েছে। প্রতিবেশী মিয়ানমারের সৃষ্ট ‘রোহিঙ্গা’ সমস্যা দেশকে নানাদিক থেকে সংকট ও বিপদের মধ্যে নিপতিত করেছে। ভারতের সঙ্গে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য দূর করা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা, এনআরসির নামে ‘অনাগরিক’ ঘোষণা করে লাখ লাখ মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার আশঙ্কা ইত্যাদি অনেক সমস্যা মাথার ওপর চেপে বসে আছে। পাকিস্তান ও তার গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র অন্তর্ঘাত ও ষড়যন্ত্রের বিপজ্জনক উপস্থিতি অব্যাহতই রয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ উস্কে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ তার ষড়যন্ত্রকে জোরদার করতে সক্ষম হচ্ছে। ভেতর-বাহির সবদিক থেকেই দেশ আজ সংকট ও বিপদের মুখে রয়েছে।

৩০ লাখ মানুষ বুকের রক্ত দিয়ে এ দেশকে স্বাধীন করেছিল। সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদÑ এই চার মূলনীতির ধারায় দেশকে পরিচালিত করার যে স্বপ্ন সেদিন তারা দেখেছিল, তা আজ ছিনতাই হয়ে গেছে। শোষণ, দারিদ্র্য, বৈষম্য, অন্যায়-অনাচারে দেশ আজ ডুবতে বসেছে। একদিকে দারিদ্র্যের সাগর ও অন্যদিকে অল্পকিছু মানুষের হাতে কল্পনাতীত বিত্তবৈভব। দেশে এখন কার্যত পৃথক দুই-অর্থনীতি, দুই-সমাজ, দুই-দেশ তৈরি হয়েছে।

দেশের এই পরিণতির জন্য দায়ী হলো দীর্ঘদিনের সামরিক শাসন, স্বৈরশাসন এবং দীর্ঘতর সময়ের জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই দুটি বুর্জোয়া দলের শাসন। এসব প্রতিটি সরকারই সাম্রাজ্যবাদনির্ভর লুটেরা ধনবাদী ‘অবাধ বাজার-অর্থনীতির’ পথ অনুসরণ করেছে। তারা প্রত্যেকেই একই লুটেরা-ধনবাদী ‘ব্যবস্থায়’ দেশ শাসন করেছে ও করছে। তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে সৃষ্টি হয়েছে এসব সমস্যা-সংকটের ক্রমবর্ধমান বোঝা।

জনগণের নিত্যদিনের এসব দুর্ভোগ-যন্ত্রণা থেকে এবং সমাজের সার্বিক অবক্ষয় ও পচন থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তাই আজ প্রয়োজন লুটেরা ধনিক স্বার্থাভিমুখী পুঁজিবাদী ধারা পরিবর্তন করে মুক্তিযুদ্ধের ধারায়, তথা সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে গরিব মেহনতি ও নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত মানুষের স্বার্থে দেশ পরিচালনা করা। তা করতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় নীতি আমূল ঢেলে সাজানো। অর্থাৎ ‘ব্যবস্থা’ বদল করা। এজন্য প্রয়োজন বুর্জোয়া রাজনৈতিক শক্তির পর্যায়ক্রমিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশে বামপন্থি-গণতান্ত্রিক ‘বিকল্প’ শক্তির শাসন প্রতিষ্ঠা করা।

সে ক্ষেত্রে আজ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের দাবিতে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শানিত করা। কারণ আওয়ামী লীগের হাতে দেশের শাসনভার অব্যাহত থাকলে দেশ ও জনগণ আরও গভীর সংকটে ডুবে যাবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বদলে তারই অন্য একটি ‘নব সংস্করণ’ ক্ষমতায় আসলে অবস্থার কোনো মৌলিক বদল ঘটবে না। তা হবে ‘ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত চুলায় ঝাঁপ দেওয়ার’ মতো ব্যাপার। তাই আওয়ামী দুঃশাসনের অবসানের জন্য সংগ্রামের পাশাপাশি একই সঙ্গে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ধারার ক্ষেত্রে আমূল বিপ্লবী পরিবর্তন সংগঠিত করতে হবে। এজন্য গতানুগতিক তাৎক্ষণিকতার বাইরে গড়ে তুলতে হবে শ্রেণি আন্দোলন ও গণআন্দোলনের নতুন জোয়ার।

দেশ ও সমাজকে অব্যাহত পচন থেকে বাঁচাতে হলে ‘বিকল্প’ গড়ে তোলা একান্তভাবে জরুরি ও আবশ্যক। দেশকে আজ যে পচনের মুখে এনে দাঁড় করানো হয়েছে তাতে ‘বিকল্পের’ কোনো বিকল্প নেই।

‘বিকল্প’ গড়ে তোলার কাজটি কঠিন হলেও তা অসম্ভব নয়। কারণ তার উপাদানগুলো দেশে বিদ্যমান আছে। তবে সেগুলো এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ‘বিকল্পের’ সব সম্ভাব্য উপাদান ও শক্তিগুলোকে একত্রিত করতে পারলে তা গড়ে তোলা সহজ হবে। জনগণ একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ‘বিকল্পের’ জন্য অধীর হয়ে আছে। ‘বিকল্পের’ সম্ভাব্য শক্তির মধ্যে একাগ্রতা ও একতা সে কারণে আজ অপরিহার্য ও জরুরি। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে অবিলম্বে যদি তারা এ কাজে দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে না আসে তা হলে তারাও ইতিহাসের কাছে অপরাধী হয়ে থাকবে।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

advertisement