advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ফার্স্ট ক্লাসের সনদ নয়, সত্যিকারের মানুষ চাই

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক
৮ অক্টোবর ২০১৯ ২০:৪৮ | আপডেট: ৮ অক্টোবর ২০১৯ ২০:৫২
advertisement

বোর্ড স্টান্ডধারী শিক্ষার্থীরা কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ফার্স্ট ক্লাস পায় না, শিক্ষকদের প্রিয়পাত্র হয় না; তা যেমন গবেষণার দাবি রাখে তেমনি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়া শিক্ষার্থীরা কেন ছাত্রাবস্থায় যৌক্তিক আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে না, সহপাঠী ও সামাজিক বিপদ-আপদে রাজনীতি করা ছাত্রটির আগে এগিয়ে আসে না, তা নিয়েও গবেষণা প্রয়োজন।

অত্যন্ত ভালো রেজাল্টধারীরা অতীত স্বীকৃত মেধার কারণে ব্যক্তিত্ব ও রুচিবোধের ততটা নিচে নামতে পারে না, অপেক্ষাকৃত ঠুনকো মেধার কাছে আত্মসমর্পণ করে না- সে যুক্তি কী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?

এদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে ১০/২০ মিনিটের ভাইভা যেমন মেধাযাচাইয়ের মাপকাঠি হতে পারে না, তেমনি গুটিকয়েক নষ্ট শিক্ষকের বদান্যতায় ভালো রেজাল্ট করা ছাত্রটি ভালো শিক্ষক হবে, তার কোনো গ্যারান্টি দেওয়া যায় না। যেখানে ভালো ফলাফলের দায়ভার কতিপয় নষ্ট শিক্ষকের হাতে, সেখানে ভালো মানুষের প্রত্যাশা হবে স্বপ্নপুরীতে- বাস্তবে নয়, এটাই স্বাভাবিক, এটাই নিয়ম।

গত কয়েক দশকে বিভাগে প্রথম হওয়া শিক্ষার্থীর যেমন পরোপকারের দৃষ্টান্ত বিরল, তেমনি তাদের রাজনৈতিক মতবাদের সরলতায়ও রয়েছে অধিক গরল। ফার্স্ট-সেকেন্ড হওয়া ছাত্রের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক চেতনা না থাকার ফলে সময় ও সুযোগে যেকোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী হিসেবে তাদেরকে চালিয়ে দিতে নিয়োগকারীরও তেমন কোনো সমস্যা হয় না।

সহজে সব দোষ রাজনৈতিক দলের ওপর দেওয়া হলেও বাস্তবে তার মূল কারণ, গুটিকয়েক সুবিধাবাদী শিক্ষকের নগদ সুবিধাভোগের ফলাফল। ৯০ দশক থেকে অনেকটা এ বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে।

এর ফলাফল- শিক্ষকের লেখা ব্যানারেই বেশি থাকে ভুল, যদিও তাদের হাসিকাশিতেই জিম্মি থাকে রাজনৈতিক দলের দোষ-গুণ। এখানে মানবিক মানুষ বা যথাযথ যোগ্যতার বিষয়টিও যেন অপাংক্তেয়-হাস্যরসের পাত্র!

একটু অন্যভাবে পরখ করলে দেখা যায়, শিক্ষকের জন্য বরাদ্দকৃত গবেষণা জার্নালগুলোও যথাযথ প্রকাশিত হয় না, বা তারা লেখা দিতে পারেন না। অথচ রাষ্ট্রের অনেক তরুণ তুমুল প্রতিযোগিতা করে আন্তর্জাতিক জার্নালে জায়গা করে নিচ্ছেন। অনেকে গবেষণা করেও স্বীকৃতি পান না, আবার কোনো রকমে ১২ বছর পার হলেই অধ্যাপক পদের তকমা লাগাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো শিক্ষক ভুল করেন না।

অতীতে ছাত্র রাজনীতির দোহাই থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে উপাচার্য ও গুটিকয়েক শিক্ষকের দুর্নীতি ও নৈতিকতা বিরোধী কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অস্থিরতার খবর হচ্ছে। অতীতে শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় ছাত্র আন্দোলনের খবর হলেও বর্তমানে শিক্ষকের নষ্ট কর্মের কারণে ছাত্ররা প্রতিবাদী হচ্ছে।

কতিপয় নষ্ট শিক্ষকের মেকি আদর্শের লেবাশের ফলে গোটা শিক্ষক সমাজ বার বার কলংকিত হচ্ছে। অন্যান্য পেশাজীবীর দখলে যাচ্ছে শিক্ষকের জন্য সংরক্ষিত সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় পদ। অথচ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে মেধা ও যোগ্যতাবলে একসময় শিক্ষা সচিবের পদও অলংকৃত করেছিলেন আমাদেরই শিক্ষক।

এসব সিন্ডিকেট নির্ভর, মানবতাহীন, মেকি মেধাবী শিক্ষকের হাত থেকে গোটা শিক্ষক সমাজকে মুক্ত করার সময় কী আসবে না? দেশের প্রয়োজন যখন মানবিক ছাত্রের, তখন কেন এতো দৌরাত্ম সিন্ডিকেট নির্ভর তথাকথিত মেধাবী নামক চামচার, ব্যক্তিত্বহীন, মানবতাহীন ধান্ধার।

যেখানে কোনোভাবেই চেতনাগত রাজনৈতিক আদর্শ-দর্শনের প্রভাব নেই, সেখানেই আজ দলবাজীর মহাকাল। তাহলে কেন শুধু দায়ভার রাজনৈতিক দলের-গোটা শিক্ষক সমাজের? মানবতার শ্রেষ্ঠ জায়গাতেই কেন আজ মানবতা ঠুকরে কাঁদে? শ্রদ্ধা জানাই সত্যিকারের মেধাবী ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষকদের।

 

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক
Email : dr.mmh.ju@gmail.com

advertisement