advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ধাপে ধাপে ঊর্ধ্বমুখী হবে অভিযান

আলী আসিফ শাওন
৯ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৯ অক্টোবর ২০১৯ ০৯:৫৯
advertisement

অনিয়ম-দুর্নীতিবিরোধী সরকারের বর্তমান অভিযান চলমান থাকবে। ধাপে ধাপে এ অভিযানের গতি আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে। প্রথমে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে এ অভিযান শুরু হলেও পরে দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ব্যবসায়ীসহ সব পেশাজীবী এ অভিযানের আওতায় আসবেন বলে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে। আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের আগ পর্যন্ত এ অভিযানের গতি আরও বাড়বে।

সরকারের প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা আমাদের সময়ের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, আওয়ামী লীগ টানা তিন মেয়াদে সরকারি দল হওয়ায় সারাদেশে অনেক স্থানেই সরকারি দলের নেতাকর্মীরা বেপরোয়া হয়ে পড়েছেন। এখন একটা লাগাম টানার প্রয়োজনীয়তা নিজ থেকেই অনুভব করছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মূলত সেই ভাবনা থেকেই তিনি সরকারি একাধিক সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে একটি তালিকা তৈরি করেন। সেই তালিকা অনুযায়ী সম্প্রতি অভিযান শুরু হয় জোরেশোরে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার বলেন, যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী স¤্রাটকে আটক না করার ব্যাপারে প্রচ- চাপ ছিল। কিন্তু নেত্রী অটল ছিলেন। এর অর্থ, মেঘ কেটে গেছে। এখন থেকে প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে আটক করা হবে। অনেকেরই ব্যাংক ব্যালেন্সের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার জানামতে স¤্রাটদের সময় একটা তালিকা করা হয়েছিল ৩০৩ জনের। এ তালিকায় রাজনীতিবিদ, আমলা, শিক্ষক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অনেকেই আছেন। সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আওয়ামী লীগের অনেকেই ভেবেছিলেন, ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী স¤্রাটকে হয়তো আটক করা হবে না। কারণ এর আগে আটক হওয়া যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, যুবলীগের সমবায় সম্পাদক জিকে শামীম ও মোহামেডান ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন অতীতে অন্য দলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। সরকারি সুবিধা নিতে আওয়ামী লীগে ভিড়েছিলেন। কিন্তু স¤্রাট পারিবারিকভাবেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত।

যুবলীগ নেতা হলেও পেশিশক্তি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক দিয়ে অনেক মন্ত্রী-এমপির চেয়ে কম ছিলেন না তিনি। ফলে স¤্রাট আটকের পর আওয়ামী লীগের অনেক সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এখন আতঙ্কে রয়েছেন। বিশেষ করে যারা আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদে নিজ নির্বাচনী এলাকায় আধিপত্যবাদের রাজনীতির মধ্য দিয়ে ‘ত্রাসের রাজত্ব’ কায়েম করেছেন এবং বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাদের অনেকেই এখন সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করে জানার চেষ্টা করছেন, তালিকায় তাদের নামে আছে কিনা।

স¤্রাট গ্রেপ্তারের দিন মন্ত্রিসভার একজন সদস্য এ প্রতিবেদককে বলেন, পরিস্থিতি আপাতত পর্যবেক্ষণ করছি আমরা। এখন কোনো মন্তব্য করার সময় আসেনি। মনে হচ্ছে, ডিসেম্বর পর্যন্ত ঝড় চলবে।

অভিযানের ধরনের বিষয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত সবাইকে যে পুলিশ দিয়ে আটক করা হবে বিষয়টি তা নয়। অনেকে দুদকের জালেও ফাঁসবেন। ইতোমধ্যে দুদক অনেকের সম্পদের তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অনিয়মে অভিযুক্ত যারা সরাসরি আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন, তারা পদ হারাবেন। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই দলে একটা বড় পরিবর্তন আনতে চান দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা। সে কারণে তিনি শুধু আওয়ামী লীগেরই নয়, দলটির চার সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনও করার নির্দেশ দিয়েছেন নভেম্বরের মধ্যে। মূলত এসব সম্মেলনের মধ্য দিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে ‘দুষ্টচক্রের বলয়’ থেকে মুক্ত করতে চান। যেটা তিনি এর আগে ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলনে করেছিলেন; দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেটের হাত থেকে ছাত্রলীগকে বের করে এনেছিলেন।

এবার একই বিষয় দেখা যাবে যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের ক্ষেত্রেও। কারণ এ সংগঠন দুটিও পৃথক দুটি বলয়ের বৃত্তে বন্দি দীর্ঘদিন থেকে। আওয়ামী লীগের একজন সভাপতিম-লীর সদস্য যুবলীগ এবং একজন সাংগঠনিক সম্পাদক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনা চান, আওয়ামী লীগসহ দলের সব সংগঠন ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আদর্শিক রাজনীতির চর্চা করুক। যে কারণে ডিসেম্বরের আগেই দলের নেতাদের বিষয়ে জোরদার অভিযানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। এর পর ধাপে ধাপে সরকারি আমলা, শিক্ষক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ অন্য পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাবেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ দুজন নেতা আমাদের সময়ের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ১৯৮১ সাল থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও আর্থিকভাবে প্রচ- সৎ তিনি। যে কারণে এখন শুধু বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসেবেই বিশ্ববাসী তাকে চেনে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ৭৩ বছরে পা দিয়েছেন বাংলাদেশের স্থপতির কন্যা। তিনি এখন চান একটি দুর্নীতিমুক্ত, সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করতে। সে কারণেই অভিযানের বিষয়টি নিয়ে খুবই সিরিয়াস তিনি।

এ জন্য সম্প্রতি নিউইয়র্ক থেকে দেশে ফিরে ভারত সফরের আগে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে এক অনির্ধারিত বৈঠকে তিনি বিষয়টি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, আপনারা কাউকে বাঁচানোর জন্য কোনো তদবির করবেন না আমার কাছে। কেউ কোনো অপরাধীকে আশ্রয় দেবেন না। আমার কাছে কিন্তু সব খবরই আছে। তার এ নির্দেশনার পরই সবাই যা বোঝার বুঝে গেছেন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য লে. কর্নেল ফারুক খান অভিযান চলাকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিউইয়র্কে ছিলেন। তিনি গতকাল আমাদের সময়ের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, দুর্নীতিবিরোধী এ অভিযান নতুন কিছু নয়। এর আগেও আমাদের দলের একজন প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে জনগণের সেন্টিমেন্টের বিপক্ষে কথা বলায়, সাত জন এমপি দুদকের বারান্দায় যাওয়া-আসা শুরু করেছেন। একজন এমপি জেলে রয়েছেন; একজন ডিআইজি শাস্তি পেয়েছেন, একজন কর্নেল শাস্তি পেয়েছেন। এর অর্থ এটাই, সব সেক্টরেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চান প্রধানমন্ত্রী।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শুদ্ধি অভিযানের আওতায় যারা আসবে দল তাদের কারও কোনো দায়িত্ব নেবে না। আমাদের নেত্রী পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে তারা দলের কোনো জায়গায় থাকতে পারবে না।

advertisement