advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

জাতির বিবেকের কাছে অপরাধী হয়ে থাকল ছাত্রলীগ

আবুল মোমেন
৯ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৯ অক্টোবর ২০১৯ ০১:৫৪
advertisement

ঘটনাটা সবার জানা হয়ে গেছে। দেশে প্রতিদিনই অনেক নৃশংস ঘটনা ঘটছে। তার মধ্যে কোনো ঘটনা জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের হত্যাকা- সমগ্র জাতির হৃদয়কে রক্তাক্ত করেছে; বিবেককে ঝাঁকুনি দিয়েছে। মানুষ আর এমন বিবেকহীন নারকীয় আচরণ নিতে পারছে না। তরুণরা প্রতিবাদী কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছে, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকরা নিজেদের
পরিম-লে চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে চলেছেন।
সবাই জানেন বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের দখলে থাকে এবং সেই শক্তিতে ক্যাম্পাস ও এলাকাজুড়ে তাদের আধিপত্য চালাতে থাকে। এর সঙ্গে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং মারামারির ঘটনা ছিল সাধারণ। এক সময় সামরিক স্বৈরাচারদের আমলে ছাত্রশিবির দখলবাজি কায়েম করে ভিন্নমতাবলম্বীদের কঠোর শাস্তি দিয়ে দমন করে রাখত। ২০০৯ থেকে ছাত্রলীগ সেই কাজটি করে যাচ্ছে। সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক ছাত্রাবাসে তাদের টর্চার রুমের কথা বলাবলি হয়। লেজুড়বৃত্তিতে ব্যস্ত প্রশাসন এসব ঘটনা জেনেও উপেক্ষা করে যায়। ফলে কেবল ভিন্ন দল ভিন্ন মত নয়, অবৈধ অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে তৈরি হয়ে থাকে অন্তর্দলীয় কোন্দল, যা প্রায়ই হিংসাত্মক ঘটনায় প্রকাশ পায়।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছেÑ ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত ছাত্রলীগের হাতে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৯ দলীয় ক্যাডার-কর্মী খুন হয়েছেন। আর এ সময়ে তাদের হাতে অন্য দলের কর্মী খুন হয়েছেন ১৬ জন। ৫৪ জন তরুণের এরকম নিষ্ঠুর অকাল-অকারণ মৃত্যু মেনে নেওয়ার মতো ঘটনা নয়। সরকার এবং সমাজ বিষয়টায় কিন্তু যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি, যার ফলে সর্বশেষ আবরার ফাহাদের মতো মেধাবী তরুণকে এভাবে নির্মম হত্যার শিকার হতে হলো।
গণমাধমের খবরে এটা স্পষ্ট যে, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে সম্পাদিত কয়েকটি চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে দেওয়া তার মতামতের জন্য ফাহাদকে প্রাণ দিতে হয়েছে। তার মতামতগুলো পড়ে অবশ্য কোনোভাবেই মনে হয়নি সে শিবিরপন্থী বরং একজন সংবেদনশীল তরুণের প্রতিবাদী কণ্ঠই এতে প্রকাশ পেয়েছে। ছাত্রলীগ কর্মীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করে শিবিরকর্মী হিসেবে প্রচরণা চালিয়ে হত্যাটি জায়েজ করে নিতে চেয়েছিল। সমালোচনা ও ভিন্নমতকে রুদ্ধ করার বলপ্রয়োগের রীতি তারা এবার নতুন প্রয়োগ করেনি। ফলে সময়মতো এই বর্বর শক্তিটি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ না নেওয়ার দায় কি খোদ আওয়ামী লীগ এড়াতে পারে?
আওয়ামী লীগের সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী অনেক দিন ধরেই দলে ঢুকে পড়া বতলববাজদের বিরুদ্ধে এবং বিশৃঙ্খলা ও অন্যায়-অনিয়মের প্রতিবাদ করছেন। এবারও তিনি এই নৃশংস হত্যাকা-ের শক্ত প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
আমি মনে করি দেশের উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে এই অরাজক বাস্তবতা এবং ভিন্নমত ও সাধারণ ছাত্রদের প্রতি ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা বন্ধে প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
দেখা যাচ্ছেÑ ছাত্রলীগের নেতৃত্ব এবং প্রভাবশালী কর্মীরা দীর্ঘদিনে দুর্নীতিতে জড়িয়ে ও আধিপত্য বিস্তারে খুন-জখমসহ যে কোনো অপরাধে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত একযুগে ছাত্রলীগ দেশ, সমাজ বা ছাত্রদের কোনো ইতিবাচক ইস্যুতে রাজপথে নামেনি। তবে যুদ্ধাপরাধীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে সৃষ্ট শাহবাগের গণজাগরণ, স্কুল ছাত্রদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন কিংবা সাধারণ ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের পেছনে জনগণ সম্পৃক্ত হলেও ছাত্রলীগ বিভিন্ন সময় এসব আন্দোলনে হামলা চালিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ তারা জাতির বিবেকের ওপর চরম হামলা চালাল।
জাতির বিবেকের ওপর এই হামলার পর প্রধানমন্ত্রী কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভুল করবেন। আমরা দেখছি, ছাত্রলীগে দুর্নীতি ও আধিপত্যের ব্যাধি অত্যন্ত গভীর, কেবল দুই-চার নেতা বদল বা বহিষ্কার করে এ দলকে শুদ্ধ করা যাবে না। দলে ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা এবং দল পুনর্গঠনের লক্ষ্যে অন্তত ছয় মাসের জন্য সংগঠন বন্ধ রাখা উচিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সহাবস্থান, সমতার ভিত্তিতে কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতাসহ গঠনমূলক ভূমিকা গ্রহণের প্রস্তুতি নতুন নেতৃত্বের থাকতে হবে। এ ছাড়া ছাত্রত্বের সঙ্গে বেমানান জীবনযাপন, অবৈধ অর্থ উপার্জন, অস্ত্রসহ বেআইনি কার্যকলাপ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। আমরা বুঝতে পারি অর্থ, অস্ত্র, ক্যাডারবাহিনীর দৌরাত্ম্যে ছাত্রলীগ বর্তমানে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এর ফলে বর্তমানে তাদের যেসব কার্যকলাপ দেখা যাচ্ছেÑ তার সবই নেতিবাচক এবং এতে দল-সরকারের ভাবমূর্তির ক্ষতি হচ্ছে, দেশের ভবিষ্যৎ নষ্ট হচ্ছে।
আমরা বলবÑ সৎ, নবীন, তারুণ্যশক্তির ওপর নির্ভর করাই শ্রেয়। কারণ তারা সৃজনশীল, তাদের থাকবে কাজের আগ্রহ; ইতিবাচক ভাবমূর্তি অর্জনের প্রেরণা। সংগঠনের খোলনলচে বদল করে ছাত্রলীগকে নতুনভাবে শুরু করতে হবে। নয়ত আমাদের আশঙ্কা, আবরার ফাহাদই তাদের হাতে শেষ হত্যাকা- নয়, আরও আরও রক্তপাতের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। রক্তের মিছিল ৫৪ জনে শেষ হবে না, কেবল প্রলম্বিত হবে।
আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই আমরা। অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হবে বলে মনে হয় না। সম্ভবত তাদের মধ্যে অনেকেই ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে। দ্রুত বিচার এবং কঠোর শাস্তিই তাদের প্রাপ্য।
তবে বলতেই হবেÑ কিছু তরুণের কঠোর শাস্তিতে জাতির বিবেকের ক্ষত সারবে না। তার জন্য এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধেও কাজ করতে হবে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলকে।

advertisement