advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

এয়ারপোর্ট পাবলিক টয়লেটে এত মধু!

মাসে অবৈধ আয় পঁচিশ লাখ টাকা

ইউসুফ সোহেল
৯ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৯ অক্টোবর ২০১৯ ১১:৫৬
ছবি : সংগৃহীত
advertisement

রাজধানীর বিমানবন্দর রেলস্টেশনের পাশে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ‘এয়ারপোর্ট পাবলিক টয়লেট’। এর চত্বর ঘিরে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে বেশকিছু হোটেল ও দোকানপাট। এগুলোয় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে ওই টয়লেট থেকে।

শুধু তাই নয়, প্রতিদিন গ্যালন গ্যালন পানি বিক্রি হচ্ছে সেখান থেকে। অসংখ্য মোটরসাইকেল ও বিমানবন্দরের রেন্ট-এ কারের গাড়ি ধোয়ার মাধ্যমেও হাজার হাজার টাকা তুলে নিচ্ছেন টয়লেটটি দেখভালকারীরা। জরাজীর্ণ এ শৌচাগারে আগন্তুকদের কাছ থেকে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত রেটের চেয়ে দ্বিগুণ টাকা আদায়েরও অভিযোগ। অবৈধভাবে সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৯০ হাজার এবং মাসে কমপক্ষে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র।

অবশ্য ডিএনসিসি সূত্র বলছে, এ টাকার এক আনাও সরকার পাচ্ছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে টয়লেট ঘিরে বিশাল অঙ্কের এ টাকা যাচ্ছে কোথায়? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কিছু নেতাকর্মী ও ডিএনসিসির অসাধু কয়েক কর্মী পাবলিক টয়লেটটি নিয়ন্ত্রণ করছেন।

এদিকে সীমানা জটিলতা নিরসনের দোহাই দিয়ে টাকার খনি এ শৌচাগার আয়ত্বে নিতে ডিএনসিসির ৪৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনিসুর রহমান নাঈম লিখিত আবেদন করেছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। অন্যদিকে জটিলতা এড়াতে সেটি ভেঙে ফেলার ফরিয়াদ জানিয়েছেন ১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আফসার উদ্দিন খান।

স্থানীয়দের ভাষ্য, শৌচাগারটি ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগে ২০১৭ সালের ২০ জুলাই দেখভালের দায়িত্বে থাকা মো. রোকন মিয়াকে তিন মাসের সাজা দেন ডিএনসিসির ভ্রাম্যমাণ আদালত। জব্দ করা হয় পানির মোটর। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান টয়লেটের দখলদার জনৈক তাজুল ইসলাম। তিনি পার্শ্ববর্তী এক কাউন্সিলরের অনুসারী বলে জানা যায়। ডিএনসিসির ১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের জিম্মায় টয়লেটটি হস্তান্তরের পর এটির দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় নজরুল ইসলাম মোহন নামে একজনকে। কিন্তু গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর পরই মোহনের কাছ থেকে তা জবরদখলে নেন তাজুল।

এ বিষয়ে নজরুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, ‘২০১৭ সালে এয়ারপোর্ট পাবলিক টয়লেটটি ডিএনসিসির ১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের জিম্মায় দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সাজিদ আনোয়ার। পরে কাউন্সিলর আমাকে এটি দেখভালের দায়িত্ব দেন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে প্রায় ৮ মাস আগে আমাকে উচ্ছেদ করে সেটি দখলে নেন তাজুল ইসলাম। তাকে নেপথ্য ইন্ধন দেন ডিএনসিসির ৪৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর। এ বিষয়ে আমি উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি।’

জানা গেছে, পাবলিক টয়লেট থেকে আশপাশে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে ভাড়া আদায়, দোকান-হোটেল ভাড়া, গ্যারেজ ভাড়া, পানি বিক্রি, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার ধোয়া, শৌচাগারে নির্ধারিত রেটের চেয়ে দিগুণ টাকা আদায়ের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৯০ হাজার টাকা আসে। সে হিসাবে মাসে তোলা হচ্ছে কমপক্ষে ২৫ লাখ, আর বছরে কয়েক কোটি টাকা। মোটা অঙ্কের এ টাকা কাকে দেন-এমন প্রশ্নের জবাবে দখলদার তাজুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, ‘বৈধভাবে ও নিয়ম মেনেই পাবলিক টয়লেটটি পরিচালনা করছি। যিনি ইজারা নিয়েছেন, তার কাছেই টাকা দেই। বিষয়টি ৪৯ নম্বর কাউন্সিলর অবগতও আছেন।’ তবে কে ইজারা নিয়েছেন, জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তাজুল ইসলাম।

এয়ারপোর্ট পাবলিক টয়লেটের সঙ্গে নিজের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই দাবি করে ৪৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনিসুর রহমান নাঈম বলেন, ‘আমার এক ওয়ার্ড, ওই টয়লেটটি অন্য ওয়ার্ডে। আমি কেন ওই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করব? রাজনৈতিক ক্যারিয়ার প্রশ্নবিদ্ধ করতে একটি মহল আমার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। তবে টয়লেটটি যেখানে অবস্থিত সেই স্থানটি ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওতায়। তাই সীমানা জটিলতা নিরসনে আমি ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিতভাবে জানিয়েছি।’

এ বিষয়ে ১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আফসার উদ্দিন খান বলেন, ‘এয়ারপোর্ট পাবলিক টয়লেট ঘিরে কিছু মানুষ অবৈধভাবে আয় করছে বলে শুনেছি। কিন্তু কিছু করার ক্ষমতা কি আমার আছে? তাই নানা ধরনের জটিলতার কারণে ওই টয়লেটটি ভেঙে ফেলতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে এরই মধ্যে জানিয়েছি।’

ডিএনসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সাজিদ আনোয়ার বলেন, ‘নানা অনিয়মের অভিযোগে ২০১৭ সালে একবার এয়ারপোর্ট টয়লেটের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছিল। এর পর এটি স্থানীয় কাউন্সিরের জিম্মায় দেওয়া হয়। ওই টয়লেট ঘিরে বর্তমানে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড চলছে, বিষয়টি আমি অবগত নই। অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, এয়ারপোর্ট পাবলিক টয়লেটের সীমানা ঘিরে গড়ে উঠেছে অন্তত ৩৫টি দোকান, গ্যারেজ, খাবার হোটেল ও সেলুন। এগুলোয় অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে ওই টয়লেট থেকেই। শতশত গ্যালনে পানি ভরে ভ্যানগাড়ি দিয়ে তা বিক্রি করতেও দেখা গেছে। এ ছাড়া পাবলিক টয়লেট ইজারার নিয়মানুযায়ী, পায়খানা ৩ টাকা ও প্রস্রাব ২ টাকা করে নেওয়া কথা। কিন্তু এ টয়লেটে পায়খানায় ১০ আর প্রস্রাবে ৫ টাকা করে আদায় করেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পান দোকানি জানান, তাজুল ইসলামের কাছে মাসে দোকান ভাড়া বাবদ তিনি দেন সাত হাজার টাকা। আর অগ্রিম দিতে হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। মাসে ১০ হাজার টাকাও দোকান ভাড়া দিতে হয় কোনো কোনো দোকানদারকে। টয়লেটের সামনের জায়গাতে গাড়ি ধোয়ার ব্যবসা করছেন দায়িত্বরত কর্মচারীরা। মূলত এটিই তাদের মূল ব্যবসা। এখানে প্রতিদিন কমপক্ষে ২০০ মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ধোয়ার কাজ করা হয়। মোটরসাইকেল ১২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা আর প্রাইভেটকার ধোয়া হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা করে।

advertisement
Evall
advertisement