advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পদার্থে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

জাহাঙ্গীর সুর
৯ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৯ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০৭
advertisement

ব্রহ্মা-ের বিবর্তন এবং এই মহাবিশ্বে পৃথিবীর কী অবস্থানÑ এসব নিয়ে মানুষের বোঝাপোড়াকে আরও সমৃদ্ধ করার কৃতিত্বস্বরূপ পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন বিজ্ঞানী। বিকল্প পৃথিবীর দিশারিরা হলেনÑ জেমস পিবলস, মিশেল মেয়র ও দিদিয়ার কুইলজ। আমাদের সময় গত বছর মিশেল মেয়রকে তার গবেষণা নিয়ে আলাপের জন্য ইমেইলে চেষ্টা করেছিল।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন জ্যোতিঃপদার্থবিদ প্রিয়ম্বদা নটরাজন এবং বাংলাদেশের বিজ্ঞানবক্তা আসিফ এ প্রতিবেদককে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

নোবেল কমিটি জানিয়েছে, ভৌত মহাবিশ্বসৃষ্টি নিয়ে তত্ত্বীয় অবদানের জন্য পুরস্কারের অর্ধেক পাবেন কানাডা বংশোদ্ভূত মার্কিন বিজ্ঞানী পিবলস। সূর্যের মতো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরা একটি বহির্জাগতিক গ্রহ আবিষ্কারের জন্য বাকি অর্ধেক পাবেন সুইস বিজ্ঞানী মেয়র ও কুইলজ।

মহাবিশ্বতাত্ত্বিক পিবলস প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক।

জ্যোতিঃপদার্থবিদ মেয়র জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। কুইলজ জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক।

নোবেল কমিটি পুরস্কারের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব গত ৫০ বছরে আমূলে যতটা বদলেছে, তার শতভাগ কৃতিত্ব জেমস পিবলসের। আগে যা কেবলই কল্পনা ছিল, সেসবকে বিজ্ঞানে রূপ দিয়েছে তার গবেষণা। মহাবিশ্ব সম্পর্কে আজ আমরা যা কিছু ধারণা করি, তার তাত্ত্বিক ভিত্তি তিনিই দাঁড় করিয়েছিলেন গত শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে।

মহাবিস্ফোরণ (বিগ ব্যাং) মডেল অনুযায়ী, প্রায় ১৪০০ কোটি বছর আগে মহাবিশ্বের সৃষ্টি। প্রথমে এটি অত্যন্ত উতপ্ত ও ঘন ছিল। এর পর থেকে অদ্যাবধি ব্রহ্মা- প্রসারিত হচ্ছে। সবধারে বিস্তারের সুবাদে সে যেমন বড় হয়েছে, তেমন শীতলও হয়েছে। মহাবিস্ফোরণের প্রায় চার লাখ বছর পর মহাবিশ্বটা প্রথম স্বচ্ছ বা দৃশ্যমান হয় এবং মহাশূন্যে প্রথমবারের মতো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে আলো। এমনকি এই ক্ষণে, আপনি যখন এই লেখাটি পড়ছেন, তখনো আপনার চারপাশে আছে ওই সুপ্রাচীন রশ্মি। এদের পিঞ্জরে লুকানো আছে মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য। পিবলস নিজের তত্ত্ব দিয়ে হিসাব কষে দেখিয়েছেন, মহাবিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ আমরা দেখতে পাই। একথার অর্থÑ এই কাগজÑকালি ও লেখা, আপনি আর আমি, এই পৃথিবী, এই সৌরজগৎ, পুরো আকাশগঙ্গা ছায়াপথÑ এবং যা কিছু আমরা দেখি, তা মূল মহাবিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশ কৃষ্ণবস্তু (ডার্ক ম্যাটার) ও কৃষ্ণশক্তি (ডার্ক এনার্জি)Ñ আমরা তাদের দেখতে পাই না, তাদের সম্পর্কে আমরা জানিও খুবই কম।

১৯৯৫ সালের অক্টোবরের এ রকমই একটি দিনে মেয়র ও কুইলজ ঘোষণা করেন যে, আকাশগঙ্গায় তারা এমন একটি দূর গ্রহ খুঁজে পেয়েছেন, যা আমাদের সূর্যের মতোই একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। গ্রহটির নাম ৫১ পেগাসি বি। ফ্রান্সের এক মানমন্দির থেকে তারা এর দেখা পান। এটি পৃথিবী থেকে ৫০ আলোকবর্ষ দূরে (মানে, আলোর গতিতে ওখানে যেতে ৫০ বছর লাগবে; আলো ১ সেকেন্ডে তিন লাখ কিলোমিটার দৌড়ায়)। ভিনগ্রহটার সঙ্গে আমাদের গ্রহরাজ বৃহস্পতির সাজুয্য আছে।

নোবেল কমিটি বলছে, ৫১ পেগাসি বি আবিষ্কার জ্যোতির্বিজ্ঞানে একটি বিপ্লব বয়ে এনেছে। আকাশগঙ্গায় গত দুই যুগে চার হাজারের বেশি ভিনগ্রহের সন্ধান মিলেছে। নতুন নতুন, বিচিত্র সব বহিঃগ্রহ এখনো ধরা পড়ছে। এদের আকার, গড়ন ও ঘোরার কক্ষপথ জানাশোনা গ্রহব্যবস্থার চিরচেনা চিত্র সম্পর্কে আমাদের ধারণায় কুড়ালাঘাত করছে। আমরা এখন এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিÑ মহাবিশ্বে আর কোথাও প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছে কিনা?

আমরা বহিঃগ্রহ খুঁজে বেড়াই কেন? এ প্রশ্নটি রেখেছিলাম যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী প্রিয়ম্বদা নটরাজনের কাছে। গতকাল সামাজিকমাধ্যমে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আর কোথাও জীবন আছে কিনা, জানতে চাওয়ার এমন আগ্রহের প্রথম ধাপ’ হলোÑ ভিনগ্রহের সন্ধানে অভিযান।

সূর্যের সাক্ষাৎ মৃত্যুর যে নিশ্চিত নিয়তি, সেই পরিণাম থেকে পৃথিবী থেকে পালিয়ে প্রাণে বাঁচতেই কি মানুষ ভিনগ্রহের সন্ধান চালাচ্ছে? এমন প্রশ্ন করলে অধ্যাপক নটরাজন বলেন, ‘আমরা তো আমাদের পৃথিবীটাকে নির্বোধের মতো মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি, সূর্যের মৃত্যুর কত্ত আগেই। আমরা সুন্দর এই পৃথিবীকে বাঁচাতে পারি যদি এবং কেবল যদি এখনই পদক্ষেপ নিই।’

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ‘দ্বিতীয় পৃথিবীর সন্ধানে’ বিষয়ে বিজ্ঞানবক্তৃতা করেছেন ডিসকাশন প্রজেক্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা আসিফ। তিনি গতকাল টেলিফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনি আর আমি এই যে আলাপ করছি, ঠিক এই সময় প্ল্যাংক স্কেলে কোথাও যে একটা মহাবিশ্ব সৃষ্টি হচ্ছে না, কে বলবে। ভাবতেই বিস্ময় লাগে! বহির্জগতে গ্রহের সন্ধান দিলে বিজ্ঞানীদের দাবিকে অনেক লোকে বায়বীয় মনে করত। এ ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার দিয়ে এমন চিন্তন ও গবেষণাকে মানুষের মঙ্গলকামী বলে স্বীকৃতি দেওয়া হলো।’

‘মহাবৃত্ত’ নামের বিজ্ঞান সাময়িকীর সম্পাদক আসিফ প্রয়াত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগানকে স্মরণ করে বলেন, ‘মহাবিশ্বটা যত বড়, যত বিচিত্রই হোক না কেন, তা আসলে মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মহাবিশ্বের বিবর্তন বোঝা মানে মানুষ নিজেরই আদি-কাঠামোর সন্ধান চালাচ্ছে।’

advertisement