advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

এক আঙিনায় মসজিদ-মন্দির মিলেমিশে ধর্মীয় আচার

লালমনিরহাট প্রতিনিধি
৯ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৯ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০৮
advertisement

একই আঙিনায় পাশাপাশি একটি মসজিদ ও একটি মন্দির। একই জায়গায় থাকা দুই ধর্মের দুই উপাসনালয়ে শত বছর ধরে পারস্পরিক সহযোগিতায় চলছে ধর্মীয় আচার ও রীতিনীতি। এ যেন ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য এক দৃষ্টান্ত।

লালমনিরহাট শহরের পুরানবাজারের কালীবাড়ি এলাকায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদ ও মন্দিরের প্রাঙ্গণ একটি। সামনের খোলা জায়গাটিতে পূজা উপলক্ষে যেমন মেলা বসেছে, তেমনি ওয়াজ মাহফিলসহ মুসলমানদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানও হয়ে থাকে।

হানাহানি ও মতবিরোধ ছাড়াই শত বছর ধরে এভাবেই পারস্পরিক সহযোগিতায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষরা। সম্প্রীতির এই স্থানটি দেখতে বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময় দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীরা আসেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৮৩৬ সালে দুর্গামন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর আগে সেখানে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা হওয়ায় পুরানবাজার এলাকার জায়গাটি অনেকের কাছে কালীবাড়ি নামেই পরিচিত। এর পর মন্দির প্রাঙ্গণে ১৯০০ সালে একটি নামাজঘর নির্মাণ করা হয়। এ নামাজ ঘরটিই পরবর্তী সময় পুরানবাজার জামে মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করে।

কালীবাড়ি মন্দির কমিটির কোষাধ্যক্ষ সনদচন্দ্র সাহা জানান, প্রায় দেড়শ বছর আগে কালীমন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। যার কারণে এলাকাটির নামকরণও করা হয় কালীবাড়ি। পরবর্তী সময় বাজার গড়ে উঠলে বাজারের ব্যবসায়ী ও শহরের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মন্দিরের পাশেই ফাঁকা জায়গায় একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। যা এখন পুরানবাজার জামে মসজিদ নামে প্রতিষ্ঠা পায়। সেই থেকে একটা উঠানে পাশাপাশি চলছে হিন্দু ও মসলিম দুই ধর্মের দুই উপাসনালয়। এখানে মসজিদ-মন্দির প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয় সম্প্রীতির দিক দিয়ে লালমনিরহাট জেলবাসী এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি আরও জানান, পূজা শুরুর আগে মসজিদ ও মন্দির কমিটি বসে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত মতে, আজানের সময় থেকে প্রথম জামাত নামাজ পর্যন্ত মন্দিরের মাইক, ঢাক-ঢোলসহ যাবতীয় শব্দযন্ত্র সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। ওই সময় পুরোহিত নীরবে পূজা করবেন ঢাক-ঢোল ছাড়াই। নামাজের প্রথম জামাত শেষ হলে মন্দিরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়ে যায়। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ও বাদ্যযন্ত্র এবং মাইক বাজিয়ে শুরু হয়ে যায় পূজা অর্চনার কাজ। যুগের পর যুগ ধরে একই নিয়মে চলছে মসজিদ ও মন্দিরের কার্যক্রম। এখানে সামান্যতম বিশৃঙ্খলা কোনোদিন হয়নি। মন্দিরের কার্যক্রম ভালোভাবে চলাতে মুসলমানরা সব সময় সব ধরনের সহায়তা দিয়ে আসছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটে ছিল। কিন্তু লালমনিরহাটের কালীবাড়িতে তার আগুনের আঁচ কোনোদিন পড়েনি। দেশের কোথাও হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হলে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা সুবিধা নিতে মন্দিরে যদি হামলা করে তাই কোথাও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে মুসলমানরা মন্দির দিনরাত্রি পাহারার ব্যবস্থা করে থাকে। এভাবে শত শত বছর ধরে মসজিদ-মন্দিরটি পাশাপাশি চলছে। স্বাধীনভাবে দুই ধর্মের মানুষ এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করছেন।

পুরানবাজার জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফজল মিয়া জানান, ধর্মীয় সম্প্রীতির এটি এক জ্বলন্ত প্রমাণ। যুগ যুগ ধরে একই উঠানে চলছে নামাজ ও পূজা অর্চনা। নামাজের সময় মন্দিরের ঢাক-ঢোল বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে মন্দিরে পূজা চলে পুরোদমে। আজান ও নামাজে তো খুব বেশি সময় লাগে না। এ সময়টুকু তারা (পূূূজারি) ঢাক-ঢোলসহ শব্দযন্ত্র বন্ধ রাখেন। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই যুগ যুগ ধরে এ সম্প্রীতির বন্ধনে ধর্মীয় উৎসব পালন করছেন বলে দাবি করেন তিনি।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ এ জেলার মানুষ। ধর্ম যার যার উৎসব সবারÑ এটাই এখানকার মানুষ লালন ও বিশ্বাস করে। যার মূর্ত প্রতীক এক উঠানে কেন্দ্রীয় কালীবাড়ি মন্দির ও পুরানবাজার জামে মসজিদ।

advertisement