advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ভিন্নমত হলেই চলে নির্যাতন

নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০১৯ ১১:২৮
প্রতীকী ছবি
advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্নমত ও আদর্শের নেতাকর্মী-শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ছিল। এতদিন ঘটনাগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলেও বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার পর তা সামনে চলে এসেছে।

এখন অনেকেই বলছেন, বেপরোয়া ছাত্রলীগের হাতে এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা প্রায় ঘটে। আবরার হত্যার পর তা প্রকাশ পেয়েছে শুধু। শিক্ষার্থীদের হলে উঠানো থেকে আসন বণ্টন, অবাধ্য হলে মারধর-নির্যাতন ও হল থেকে বের করে দেওয়া, টেন্ডার বাণিজ্য কোনো কাজই ছাত্রলীগের কথার বাইরে হয় না।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর গত ১১ বছরে ছাত্রলীগ এতটাই লাগামছাড়া হয় যে, সারাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমান্তরালে গড়ে তুলেছে নিজস্ব প্রশাসন। হলের ছাত্রদের দলীয় কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য করা, গেস্টরুমে রাজনৈতিক বৈঠকে নিয়মিত হাজিরা দিতে হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের। জোট সরকারের আমলে জাতীয়বাদী ছাত্রদলের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ ছিল।

শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র একই। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হয়ে ভিন্নমতের অনেক ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থীরা এখন হলছাড়া। অনেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাই ছেড়ে দিয়েছেন।

তবে বিভিন্ন সময় এ পরিস্থিতির পরিবর্তন করা হবে বলে ছাত্রলীগের নেতারা বললেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। উপরন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা পুরস্কৃত হয়েছেন। বাগিয়ে নিয়েছেন ছাত্রলীগের বড় বড় পদ। আর সিট বণ্টনসহ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনেকটাই নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ছাত্রলীগের কিছু উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মী কখনো কোনো অপরাধে সম্পৃক্ত হলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিই। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো হল প্রশাসনই নিয়ন্ত্রণ করে। ছাত্রলীগের নিয়মিত শিক্ষার্থীরা হলে অবস্থান করে। নিয়ন্ত্রণ করে না।

আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছাত্রলীগের নির্যাতনে সাধারণ শিক্ষার্থীর মৃত্যু, দেশত্যাগ, হলত্যাগের ঘটনা নিতান্তই কম নয়। কেবল ভিন্নমতের ছাত্রসংগঠনই নয় নিজ দলের নেতাদেরও শিবির অভিযোগে মারধর করে থানায় হস্তান্তরের ঘটনাও ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এসএম হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক আবু তাহেরকে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে গত বছরের অক্টোবরে হল শাখা ছাত্রলীগেরই একটি গ্রুপ এ কা- ঘটায়। গত কয়েক বছরে ছাত্রলীগের মধ্যেই এমন ‘ব্লেম গেমের’ অনেক ঘটনা ঘটেছে।

জানা গেছে, ফরিদপুরের অটোরিকশাচালক ইসহাক মোল্লার ছেলে হাফিজুর মোল্লা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হন। ছাত্রলীগের ‘বড় ভাইদের’ হাতধরে হাফিজুর উঠেছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলে। থাকতেন দোতলার দক্ষিণ পাশের বারান্দায়। হলে ওঠার বিনিময়ে হাফিজুরকে ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে যেতে হতো। হলের গেস্টরুমে নিয়মিত রাজনৈতিক বৈঠকে হাজিরায় থাকতে হতো।

তার পরিবারের অভিযোগ, শীতের রাতের গেস্টরুমের নিয়মিত বৈঠকে হাজির হওয়ার ধকল সইতে পারেননি তিনি। ফলে আক্রান্ত হন নিউমোনিয়া ও টাইফয়েডে। চলে যান গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের পূর্ব শ্যামপুরে। শারীরিক অবস্থা বেশি খারাপ হলে ভালো চিকিৎসার জন্য রওনা দেন ঢাকায়। পথেই তিনি মারা যান। ঘটনাটি ২০১৬ সালের।

একই হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী এহসান রফিক। তাকে হলের একটি কক্ষে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। এতে এহসানের একটি চোখের কর্নিয়া গুরুতর জখম হয়। তার কপাল ও নাক ফেটে যায়। পরে তাকে দেশ-বিদেশে চিকিৎসা করা হলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। এক সময় নিরাপত্তাহীনতার কারণে হল ছাড়েন তিনি। এখন মালয়েশিয়ায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেছেন। অথচ ওই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রলীগের যে সাত নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করেছিল, তাদের মধ্যে প্রায় সবাই হলেই থাকছেন। এমনকি যাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের কথা বলা হয়েছে, তিনিও হলে থাকেন। একই ঘটনায় ছাত্রলীগ থেকেও তিনজনকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু বহিষ্কৃত প্রত্যেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয়।

এর আগে ২০১০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে মারা যান আবু বকর সিদ্দিক। টাঙ্গাইলের দিনমজুর বাবার সন্তান আবু বকর সিদ্দিক পড়তেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে। থাকতেন স্যার এফ রহমান হলে। হল ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের কারণে তিনি মারা গেলেও সে ঘটনায় কাউকেই দোষী সাব্যস্ত করা যায়নি।

গত বছরের আগস্টে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের বুয়েটের এক ছাত্রকে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করে ছাত্রলীগ। দাঈয়ান নাফিস প্রধান নামের ওই শিক্ষার্থী বুয়েটের ১৫তম ব্যাচের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী। তবে এ কাজে কেবল বুয়েট ছাত্রলীগই নয়, যুক্ত হয়েছিলেন ঢাবি ছাত্রলীগ ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতারাও। স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীও। ওই বছরই শিবির সন্দেহে দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা পিটিয়ে আহত করে। আরাফাত হোসেন নামের ওই ছাত্র বুয়েটের মেটেরিয়াল অ্যান্ড মেটালারজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (এমএমই) ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী ছিলেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও গত কয়েক বছরে শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের এমন বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে। ২০১৫ সালে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের ৪৪তম ব্যাচের ছাত্র রায়হানুল ইসলাম রায়হানকে রাতভর নির্যাতন করে জাবি ছাত্রলীগের কর্মীরা।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার এক শিক্ষার্থী ঠিকমতো কানে শুনতে পাচ্ছেন না বলে সম্প্রতি অভিযোগ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে। সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৪৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. রাজন মিয়া ৪৫তম ব্যাচের দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনেন। রাকিব বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল রানার অনুসারী ও সাকিব সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ানের অনুসারী হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত।

বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও আমাদের সময়ের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সর্বত্রই ছাত্রলীগের একক আধিপত্য। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হলগুলো নিয়ন্ত্রণে অনেকটা ঠুঁটো জগন্নাথ। শিক্ষার্থীদের হলে তোলা থেকে আসন বণ্টন পর্যন্ত সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তাদের কথার অবাধ্য হলে পিটিয়ে হলছাড়া করা হয়। আর যারা বাধ্য হয়ে হলে থাকেন তাদের নিয়মিত ছাত্রলীগের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে হয়। তবে এসব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসন কোনো খবরই রাখে না। শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের কোনো ঘটনা গণমাধ্যমে আলোচিত হলে টনক নড়ে প্রশাসনের। তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একই চিত্র ছিল বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের ক্ষেত্রে। হলে হলে ত্রাস সৃষ্টির পাশাপাশি টেন্ডার ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে তখন সংঘর্ষ ছিল নিয়মিত ঘটনা।

২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল থেকে নির্যাতন করে পুলিশে সোপর্দ করা হয় শরীফ আহমেদ প্রধানকে। শরীফ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন।

গতকাল আমাদের সময়কে তিনি বলেন, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। দীর্ঘক্ষণ মারধর করলেও বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসনের কেউই এগিয়ে আসেনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এ বিষয়ে বলেন, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি এক ধরনের নিষিদ্ধ। ছাত্রলীগের একক নিয়ন্ত্রণে। তারা গু-াপা-া দিয়ে দখলদারি কায়েম করেছে। আবরারদের মতো শিক্ষার্থীদের হত্যাকা- থামাতে হলে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি উন্মুক্ত করে দিতে হবে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির নামে মাস্তানতন্ত্র, দখলদারিত্ব নিষিদ্ধ করতে হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, বর্তমান সময়ে ছাত্ররাজনীতির নামে যা হচ্ছে তা ছাত্র রাজনীতি নয়। এরা একটি রাজনৈতিক দলের সহযোগী হিসেবে কাজ করে। তিনি বলেন, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো জনগনের সাপোর্ট ছাড়াই নির্বাচিত হতে চায় সেখানে ছাত্রসংগঠনগুলোকে স্পেশাল ফোর্স বলা হয়। দেশের রাজনীতিকেই চেঞ্জ করতে হবে। তাহলেই ছাত্র রাজনীতিতে পরিবর্তন আসবে।

 

advertisement