advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

হারিয়ে যাওয়া পাখির খোঁজে

খান মাহবুব
১০ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০১৯ ০০:১৬
advertisement

গারো পাহাড় থেকে সুন্দরবনÑ এক চিলতে বাংলাদেশ। ভূমিটা ছোট হলেও বৈচিত্র্যে ভরপুর। তবে সম্প্রতি বছরগুলোয় প্রকৃতির বৈচিত্র্য আমরাই বিনষ্ট করছি। ফলে প্রকৃতির উপাদানগুলো বাস্তব থেকে গল্পে ঠাঁই নিচ্ছে। এই গল্পে নাম নেওয়া তালিকাটা দীর্ঘ হচ্ছে পাখির বেলায়। এখনো বাংলাদেশে পাঁচ শতাধিক পাখি দেখা যায়। তবে প্রতিনিয়ত পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। পাখির আবাসস্থল কমে যাওয়া, খাদ্যাভাব ও বিচরণক্ষেত্রের অপর্যাপ্ত পাখি হ্রাসের অন্যতম কারণ। নগরজীবনে পাখি বলতে ও দেখতে এখন শিশুরা কাক ও শালিককে চিনছে। অথচ আমাদের বেড়ে ওঠার বয়সেও জেলা শহরের ভেতর কিংবা শহরতলিতে কোকিল, ঘুঘু, শ্যামা, দোয়েল, টিয়া, কোড়া, বক, কালকূট ধানটুনি, সুঁইচোরা ইত্যাদি পাখির সাক্ষাৎ মিলত প্রতিনিয়ত। আমরা অনেক পাখির অবস্থা এমন করেছি যে, তারা এখন বিলুপ্তপ্রায়।

পাখিরা ফসল ও ফলের কিছুটা ক্ষতি করলেও উপকার করে ঢের বেশি। এমনকি হুতুমপেঁচারা ফসলের ক্ষেতের ইঁদুর খেয়ে বড় উপকার করে।

পাখিরা প্রকৃতিই অংশ। পাহাড়-নদী, বন-বনানী এসবের সঙ্গে আবশ্যিকভাবে পাখির নাম চলে আসে। কত সুন্দর রঙ-ঢঙের পাখিই না আছে আমার দেশে। পাখির বাহারি রঙ দেখলে মনে হয় প্রকৃতি যেন রঙ মেখে দিয়েছে। পাখির লেজ নাচিয়ে, পাখা মেলে উড়তে, খেলতে দেখলে মনটা ভরে যায়। কিন্তু এখন আর মুক্ততার প্রতীক পাখিকে খুব একটা দেখা যায় না। প্রকৃতির সব উপাদানের মতো পাখির সংখ্যা ও প্রজাতি ক্রমহ্রাসমান। কত মন জোড়ানো নামের পাখিই না আছে আমাদের দেশে। ফুলঝুরি, নীলকণ্ঠ, কমলাবউ, সহেলি, মুনিয়া, নীলপরী, মথুরা, পাপিয়াসহ নানা পাখি। এখন যে অবস্থা দাঁড়াচ্ছে, সত্যিই একদিন এসব পাখির নাম শুধুই বইয়ে পাওয়া যাবে।

কিছুদিন আগেও বিভিন্ন ঋতুতে প্রকৃতির খোলস পাল্টানোর পাশাপাশি পাখিদের গান, শিস, কলোকাকলিতেও যেন ভিন্নতা দেখা দিত। প্রকৃতিতে কোকিল সব ঋতুতে ডাকলেও যেন মনে করা হতো কোকিল কেবল বসন্ততেই ডাকে। শিশুদের বেড়ে ওঠার সঙ্গে চারপাশের নানা জিনিসের মধ্যে পাখির অনেক কিছুর সংযোগ তৈরি করে। পাখিও যেন শিশুর এক পরম বন্ধু। বাড়ির আঙিনায় দোয়েল, শ্যামা, টোনাটুনিসহ হরেক রকম পাখির নাচন দেখার সুযোগ কোথায় এখন? এখন শহর তো দূরের কথা, শহরতলির বাড়িতেও উঠান নেই। উঠান না থাকলে বাড়িতে ডালিম, পেয়ারা, লেবু, জুঁইফুল, বেলি ফুলের গাছ কী করে থাকবে এবং পাখিই বা কী করে বসবে। আমাদের প্রকৃতিকে আমরা পাখির জন্য উপযোগী রাখছি না। পাখি বিপন্নের একটা বড় কারণ হচ্ছে নির্বিচারে পাখি শিকার। বিশেষত জলজ পাখি যেমনÑ কোড়া, কালকূট, ডুবুরি, সুন্দরী হাঁস, বক, শামুকভাঙা, সরালি হাঁস, মেটেহাঁস, মানিকজোড় হাঁস ইত্যাদি শিকারিদের প্রধান টার্গেট।

আমাদের বেড়ে ওঠার বয়সে জেলা শহরের ভেতর নানা রকম গাছগাছালি ছিল, ছিল ঝোপঝাড়। আমরা খেলার ছলে পাখির বাসা, পাখির ডিম, পাখির ছানা দেখতাম এবং তাদের সঙ্গে মিতালি গড়তাম। এখন আমাদের শিশুদের জন্য সেই শৈশব আমরা কী করে দেব। পাখির বসবাসের অভিযোজনের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে পাহাড়-টিলা, বন-বনানী, নদ-নদীতে ভিন্ন ভিন্ন জাতের পাখির সন্ধান মিলত। টিলা পাহাড়ে বাস করত ধনেশ, কাঠময়ূর, বনতিতির ইত্যাদি। বন-বাগানে দেখা মিলত কোকিল, টিয়া, ঘুঘু, মোচাটুনি ইত্যাদি। খোলা মাঠে দেখা যেত হট্টিটি, ধুলোচাটা, সুঁইচোরা, ধানটুনি ইত্যাদি। এ ছাড়া দেখা মিলত বেশ কিছু শিকারি পাখি, এ তালিকায় ছিল ঈগল, কুড়াবাজ, চিল, মধুবাজ ইত্যাদি। এসব পাখির সন্ধান কমতির দিকে।

বাংলাদেশে এখনো যত পাখি দেখা যায়, তার প্রায় অর্ধেক পরিযায়ী পাখি। এরা প্রধানত শীতকালে শীতের দেশ থেকে একটু উষ্ণতার জন্য আসে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, পরিযায়ী পাখির আবাসগুলো প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে। তাই প্রতিবছর পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমছে। এ দেশে সুখ-সুবিধা সবই কমের কাতারে, তবে সমস্যাগুলো দৌড়ে বড় হয়ে যাচ্ছে।

আগেই বলেছিলাম পাখিদেরও বাংলাদেশে খাদ্য ও যথার্থ বাসস্থানের সমস্যা। আমরা যদি পাখির বাসার দিকে তাকাই, তবে দেখব জাতীয় পাখি বাস করে বড় গাছের কোটরে, শ্যামা বাস করে গাছের ডালপালায়, টিয়া বাস করে গাছের কোটরে, খোঁপাবাজ বাস করে উঁচু গাছের ডালে, শকুন বাস করে বড় গাছের মগডালে, কালিম বাস করে জলাভূমির ঝোপঝাড়ে, ফিঙে বাস করে গাছের ডালে, জলময়ূর বাস করে ভাসমান লতাগুল্মের ওপর।

পাখির বাসক্ষেত্রের যে চিত্র পাওয়া গেল, তাতে সহজেই অনুমেয় পাখির জন্য বাসযোগ্য স্থান সংকুচিত।

আমাদের অসচেতনতা কিংবা সাময়িক সুবিধার জন্য প্রকৃতির ওপর অনাচার করছি। পাখিরাও প্রকৃতির অংশ। প্রকৃতিনির্ভর মানুষ প্রকৃতির সাধারণ নিয়মনীতিকে না মেনে নিজের খেয়াল প্রকৃতির ওপর চাপানোর ফলে প্রকৃতিও আমাদের সঙ্গে বৈরিতা করছে।

নবপ্রজন্মকে শেখাতে ও দেখাতে পারছি না, কেমন করে পাখির কলকাকলিতে ভোর হয়। পাখির ঘরে ফেরার সাঁঝের বেলায় দিনের আলো অন্ধকারে মিলে গিয়ে সন্ধ্যা নামে। প্রকৃতি থেকে শেখার উপকরণ পাখি হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সাহিত্য, লোকউপখ্যানে, লোকচারে পাখির কথা বারবার আসে, কিন্তু পাখি কোথায়। শিশুর পাখির মতো মুক্ত হয়ে আকাশটা জয় করতে শেখাব কোন পাখি দেখিয়ে। মানুষের নান্দনিক ভাবনার রসদ পায় প্রকৃতি থেকে। প্রকৃতি অনুকূল না থাকলে মানুষ নন্দন ভাবনায় বিভোর হয়ে সৃজনশীল কাজ করতে পারে না। সৃজনশীল মানুষের বড়ই প্রয়োজন আমাদের অসহিষ্ণু সমাজে সাম্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য। এ জন্যও আমাদের পাখির সান্নিধ্য প্রয়োজন। আমাদের প্রকৃতিতে টিকে থাকার সংগ্রামে হেরে গিয়ে ইতোমধ্যে অনেক পাখি বিপন্ন হয়েছে। অনেক পাখিকে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় কালেভদ্রে। এখনো বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় স্বল্প পরিমাণে সবুজ ঘুঘু, বনবাটান, নীলগলা বসন্ত, মথুরা, কালাঘাড় রাজনÑ এসব পাখিকে টিকিয়ে রেখে বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। পাখি শুধু দৃষ্টিনন্দনই নয়, প্রকৃতিতে ফসলের ক্ষেতের পোকামাকড় থেকে শুরু করে মানবসৃষ্ট নানা জঞ্জাল পরিষ্কার করে।

এখনো বাংলাদেশের অনেক গ্রামগঞ্জে ভোরের আলো ফোটার আগেই দোয়েল সুরেলা আওয়াজ দিয়ে ভোরের বার্তা দেয়। এ বার্তায় কৃষক বুঝতে পারে, ভোর হয়ে যাচ্ছে মাঠে কাজে যেতে হবে। এমন প্রকৃতির সঙ্গে পাখির সম্পর্ক মানুষের জীবনাচরণের সঙ্গে যুক্ত। হারিয়ে যাওয়া তালিকায় যুক্ত হওয়ার আগেই আমাদের সচেতনতা এবং কার্যকর উদ্যোগ পাখিকে টিকিয়ে রাখতে পারে। মনে রাখতে হবে, আমাদের সুন্দরভাবে জীবনযাপনের স্বার্থেই পাখিদের সুরক্ষা দিতে হবে। আমরা তো চাই পাখির কলবরে আচ্ছন্ন থাকে বাংলাদেশ।

পাখি নিয়ে লিখতে বসে বাংলাদেশের অন্যতম পাখি বিশারদ শরীফ খানের পাখি দেখার গল্প পড়ে বিমোহিত হয়েছি। তিনি লিখেছেনÑ

‘... শিশু-কিশোররা পানিতে হাতিয়ে মাছ ধরছিল। অঢেল মাছ ধরা পড়ল খেপজালে। ওদের হাতে আর খেপজালে ধরা পড়ল অনেকগুলো নির্বিষ জলসাপ। জলসাপের লেজ ধরে বোঁ বোঁ করে ঘুরিয়ে শূন্যে ছুড়ে দিল ওরা, শূন্য থেকেই ছোঁ মেরে ধরে নিল শঙ্খচিল আর একজোড়া ঈগল পাখি।’

(সূত্র : বাংলাদেশের পাখি, শরীফ খান তৃতীয় খ- পৃষ্ঠা ৯)

এখন খেপজালে মাছ ধরা বা ঈগল পাখির ছোঁ দুটোই বিরল।

বর্তমান বাস্তবতায় আকাশটাও মুক্ত নয়। চারদিকে বিদ্যুতের তার, খুঁটি, মোবাইল টাওয়ার, উঁচু দালান ইত্যাদি। আজকাল দৃষ্টিটাও সুদূর পর্যন্ত মেলে ধরা যায় না। এ অবস্থায় পাখিরা কী করে অসীমের প্রাণে বিচরণ করবে। কিন্তু পাখিকেও বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিতে হবে। পরস্পরনির্ভর এ পৃথিবীতে পাখিকে টিকিয়ে রাখতে হবে। বিপন্ন হলে চলবে না। প্রকৃতির কোনো একটা উপকরণ হুমকির মুখে পড়লে পুরো পৃথিবীতে মানববসতির জন্য হুমকি চলে আসে। পাখিদের হারিয়ে যেতে দেব না আমরাÑ এ শুধু অঙ্গীকার নয়, বরং কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। তা না হলে আগামী প্রজন্ম হয়তো জীবনানন্দ দাশের কবিতায় পড়বেÑ

‘এখানে ঘুঘুর ডাকে অপরাহ্নে শান্তি আসে মানুষের মনে,

এখানে সবুজ শাখা আঁকাবাঁকা হলুদ পাখিরা রাখে ঢেকে।

আর খুঁজতে থাকবে ঘুঘু পাখিকে।’

কাজেই ঘুঘুসহ সব পাখিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

খান মাহবুব : খ-কালীন শিক্ষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement