advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বুয়েটে কাল থেকে তালা

বিশ^বিদ্যালয় প্রতিবেদক
১১ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০১৯ ০৯:৩০
advertisement

আজ শুক্রবার বেলা ২টার মধ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম যদি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপস্থিত হয়ে তাদের ১০ দফা দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা না দেন, তা হলে আগামীকাল শনিবার থেকে প্রতিষ্ঠানটির সব ভবনে তালা লাগিয়ে দেওয়া হবে-গতকাল এ ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

এ হুমকির প্রেক্ষাপটে আজ বিকাল ৫টায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বৈঠকে বসবেন বলে জানিয়েছেন উপাচার্যের ব্যক্তিগত সচিব কামরুল হাসান।

পিটিয়ে হত্যা করা বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ স্মরণে আগামী রবিবার ঢাকায় নাগরিক শোক শোভাযাত্রা আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় নেতাদের অংশগ্রহণে গতকাল ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে শোকর‌্যালি করেছে ছাত্রলীগ। হত্যাকারীদের শাস্তি দাবিতে গতকাল মানববন্ধন ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

সহপাঠী ফাহাদকে হত্যার প্রতিবাদে গতকাল চতুর্থ দিনের মতো চলেছে বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন; সারা দিন স্লোগানে স্লোগানে বুয়েট ক্যাম্পাস ছিল উত্তাল। ১০ দফা দাবি আদায়ে গতকাল আন্দোলন কর্মসূচি শুরু হয় বেলা ১১টা থেকে। ১৫ মিনিট পর তারা সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। এর পর শুরু হয় বিক্ষোভ মিছিল। মিছিলটি বিভিন্ন হল প্রদক্ষিণের পর বুয়েটের শহীদ মিনার চত্বরে এসে থামে। এ সময় ‘আমার ভাইয়ের রক্ত/বৃথা যেতে দেব না’; ‘এক আবরার কবরে/লক্ষ আবরার বাহিরে’; ‘শিক্ষা সন্ত্রাস/একসঙ্গে চলে না’; ‘অত্যাচারীর ঠিকানা/এই বুয়েটে হবে না’; ‘ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই/হত্যাকারীর ফাঁসি চাই’ ইত্যাদি স্লোগানে চারপাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

শহীদ মিনারের সমাবেশে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমরা আন্দোলন করলেও বুয়েট কর্তৃপক্ষ এতে কর্ণপাত করছে না। তার আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের এখনো কিছু বলেননি। আবরারের বাড়িতে বুয়েটের ভিসির সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনারও নিন্দা জানান তারা।

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর ১০ দফা দাবি আদায়ে পথে নামা বুয়েট শিক্ষার্থীরা গতকাল বিক্ষোভকালে বলেন, ফাহাদকে হত্যা করার পর আমাদের বেঁধে দেওয়া ৩০ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে উপাচার্য কেন ঘটনাস্থলে আসেননি, এর জবাবদিহিতা করতে হবে তার। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে যেসব ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, এ পর্যন্ত সেসবের কিছুই নেওয়া হয়নি জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আন্দোলনকারীরা। তারা বলেন, অভিযুক্তদের এ পর্যন্ত বহিষ্কার না করায় আপাতদৃষ্টিতে প্রতীয়মান হয় যে, অভিযুক্তদের পক্ষেই বরং অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন।

ফাহাদ হত্যার বিচারসহ ১০ দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বুয়েটের ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামের গতকালের বৈঠক শেষ পর্যন্ত স্থগিত হয়ে গেছে। দিনভর এ বৈঠক নিয়ে ভিসির ব্যক্তিগত কর্মকর্তার সঙ্গে চলে শিক্ষার্থীদের দরকষাকষি। জানা গেছে, গণমাধ্যমের উপস্থিতি ছাড়া বৈঠক অনুষ্ঠানে সম্মত হননি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তদুপরি তাদের আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করা শিক্ষক সমিতির নেতাদেরও ডাকা হয়নি বৈঠকে। কার্যত এ দুটি কারণে শেষ পর্যন্ত বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভিসির বৈঠক ভেস্তে যায়। পরে শিক্ষার্থীরা সব ভবনে তালা লাগিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়।

এ হুমিকর পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আজ শুক্রবার বিকাল ৫টায় বুয়েট অডিটোরিয়ামে বৈঠকে বসার কথা জানিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। বিষয়টি নিশ্চিত করে উপাচার্যের ব্যক্তিগত সচিব কামরুল হাসান বলেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে শুধু জাতীয় গণমাধ্যমকেই সভায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। কারণ কিছু ফ্রিল্যান্স ইউটিউবার এবং অজানা অনলাইন পোর্টাল প্রায়ই বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে দেয়।

এদিকে উপাচার্যের সাথে বৈঠকের বিষয়ে নিয়ে আজ সকাল দশটার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানাবেন বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থী সৌমেন বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক ড. মিজানুর রহমান জানান, আন্দোলনকারীদের ১০ দফা দাবির অন্যতম একটি হচ্ছে-বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা। এ ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনা করতে হবে এবং সেভাবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

উপাচার্যের পদত্যাগসহ বুয়েট শিক্ষক সমিতির ৭ দফা

প্রশাসনিক অদক্ষতা ও ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে নির্লিপ্ততার অভিযোগে বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ, প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধ, ছাত্ররাজনীতি বন্ধে প্রশাসনের সহায়তাসহ সাত দফা দাবি তুলে ধরেছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। সমিতির প্রত্যাশা, উপাচার্য নিজে যদি পদত্যাগ না করেন, তা হলে সরকার তাকে অপসারণের ব্যবস্থা নেবে।

বুয়েট শহীদ মিনারের পাশে গতকাল বেলা পৌনে ৩টার দিকে শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দসহ অন্য শিক্ষকরা এ সাত দফা সিদ্ধান্তের কথা জানান। এর একদিন আগে শিক্ষক সমিতির জরুরি সভায় এ সাত দফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় জানিয়ে সিদ্ধান্তগুলো তুলে ধরেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি একেএম মাসুদ। এ সময় ১০ দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা হাততালি দিয়ে তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানান।

বুয়েট শিক্ষকদের সভায় গৃহীত সাত সিদ্ধান্ত হলো-এক. ফাহাদ হত্যাকা-ে জড়িত সবার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ; দুই. ফাহাদের পরিবারকে মামলা পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান; তিন. ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের জড়িতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে বুয়েট থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার; চার. বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে অবৈধভাবে কক্ষ দখলকারীদের বিতাড়িত করে হলের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা; পাঁচ. তদন্ত কমিটি গঠন করে অতীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত বিভিন্ন নির্যাতন ও র‌্যাগিংয়ের তথ্যসমূহ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনলাইনে সংগ্রহ করে দোষীদের শনাক্তকরণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান; ছয়. বুয়েটে সকল প্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রাজনৈতিক সংগঠনভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধকরণ এবং বুয়েট শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুযায়ী সকল প্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রাজনৈতিক দলভিত্তিক শিক্ষক রাজনীতি থেকে বিরত থাকা এবং সাত. ইতিপূর্বে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন নির্যাতনের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দীর্ঘদিনের নির্লিপ্ততা, নিষ্ক্রিয়তা; বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিসিপ্লিনারি আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আবাসিক হলসমূহে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উপাচার্যের ধারাবাহিক অবহেলা ও ব্যর্থতাই আবরার ফাহাদ হত্যায় উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষার্থীদের সাহস জুগিয়েছে। এসব ব্যর্থতার কারণে বুয়েট উপাচার্য তার পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। এমতাবস্থায় অনতিবিলম্বে বুয়েটের উপাচার্য পদ থেকে পদত্যাগ করার জন্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামের প্রতি আহ্বান। তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে তাকে অবিলম্বে দায়িত্ব হতে অপসারণে সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ।

রবিবার ঐক্যফ্রন্টের শোক শোভাযাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ফাহাদ স্মরণে আগামী রবিবার ঢাকায় নাগরিক শোক শোভাযাত্রা কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে মতিঝিলে ঐক্যফ্রন্ট নেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের কার্যালয়ে ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়। রবিবার বেলা ৩টায় শোক শোভাযাত্রাটি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে শুরু হবে। বৈঠকে জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, তানিয়া রব, আবদুল মালেক রতন, বিএনপির ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, শহীদুল্লাহ কায়সার, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণফোরামের জগলুল হায়দার আফ্রিক, মোশতাক হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ছাত্রলীগের শোকর‌্যালি

ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করার প্রতিবাদে গতকাল শোকর‌্যালি করেছে ছাত্রলীগ। র‌্যালি শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে এ হত্যাকা-ে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত শোকর‌্যালিতে অংশ নেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ ও ঢাকা শহরের অন্যান্য শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেন এ ধরনের অপরাধ সংঘটনে কেউ যেন সাহস না পায়, সে জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জয় এ বিষয়ে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন। দুপুর ১২টায় মধুর ক্যান্টিন থেকে শুরু হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যসহ পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে শোকর‌্যালি। শেষ হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে।

ছাত্রলীগের এই শোকর‌্যালির কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল, টিএসসি, শামসুননাহার হলের সামনে কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স আটকে যায়। র‌্যালিতে থাকা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের রাস্তা ছাড়ার অনুরোধ করলে তারা একটু পর ছাড়বেন বলেও ছাড়েননি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, র‌্যালির কারণে প্রায় ১৫ মিনিট অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকে।

রাবিতে মানববন্ধন

রাবি প্রতিনিধির পাঠানো খবরে বলা হয়েছে, ফাহাদের হত্যাকারীদের শাস্তি দাবিতে গতকাল রাবিতে মানববন্ধন ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। সকালে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও প্রশাসনিক ভবনের সামনে দুই ঘণ্টাব্যাপ্তির এ কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির সহস্রাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী সহমত পোষণ করে স্বাক্ষর করেন।

advertisement