advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

নির্যাতনে অনেকেই ছেড়েছেন বুয়েট

নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০১৯ ০১:৩২
আবরারের পায়ে নির্যাতনের চিহ্ন। ছবি : সংগৃহীত
advertisement

র‌্যাগিং ও ভিন্নমতের কারণে ছাত্রলীগের নির্যাতনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে অন্তত ৩০ শিক্ষার্থী অন্যত্র ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্যাতিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৪ সাল থেকে এ বছর পর্যন্ত এ শিক্ষার্থীরা বুয়েট ত্যাগ করেন। তাদের অধিকাংশকেই শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে নির্যাতন করা হয়। এর আগেও নির্যাতনের শিকার হয়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী বুয়েট ত্যাগ করেন। শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থীদের চালু করা ওয়েবপেজে গত

৯ অক্টোবর পর্যন্ত ১৬৬টি অভিযোগ পড়েছে। ২০১৭ সালের ৩১ মার্চ পেজটি খোলা হয়। পেজটি গতকাল বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এর পর নতুন একটি পেজ খুলেছেন শিক্ষার্থীরা। নতুন পেজের ঠিকানাটি হলো-http://gitreports.com/issue /BUET-Reports/anonymous-report. 

নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৭ সালে বুয়েটের সোহরাওয়ার্দী হলে তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আসাদ রহমানকে ঘণ্টাব্যাপী নির্যাতন করা হয়। পরের বছর তিনি বুয়েট ছেড়ে একটি পাবলিক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। একই বছরে আবদুর রহিম নামে আরও এক শিক্ষার্থী নির্যাতনের কারণে বুয়েট ত্যাগ করে সিলেট এমজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগের আগে দুজনই কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি।

আবদুর রহিম আমাদের সময়কে বলেন, আমার স্বপ্নই শেষ হয়ে গিয়েছে। এখনো বুয়েটের দিনগুলো ভুলতে পারছি না। আবরারের ঘটনার পর তো মনে হচ্ছে, জীবন নিয়ে যে ফিরতে পেরেছি; সেটাই ভাগ্য।

গত বছর বুয়েটের নজরুল ইসলাম হলের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাইফুল্লাহ নামের এক শিক্ষার্থীকে ব্যাপক মারধর করা হয়। তিনিও বুয়েট ছাড়েন।

বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি খন্দকার জামী-উস সানি আমাদের সময়কে বলেন, যারাই এমন র‌্যাগিংয়ের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই। অপরাধীর পরিচয় অপরাধী, তার পরিচয় ছাত্রলীগ না।

বুয়েটের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক একেএম মাসুদ জানান, ক্ষমতাসীন ছাত্ররা প্রভাব বিস্তার করতে র‌্যাগের নামে নির্যাতন করে আসছে। কিন্তু এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রশাসন বরাবরই নিশ্চুপ। আবরারের খুনের দায় প্রশাসন এড়িয়ে যেতে পারে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় প্রতিটি হলেই নিয়মিত র‌্যাগিংয়ের শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতি এবং শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয় সাপ্তাহিক বন্ধ থাকায় প্রতি সপ্তাহে বুধ এবং বৃহস্পতিবার গেস্টরুমে রাজনৈতিক হাজিরার দিন ধার্য থাকে। সেদিনই অনেকে র‌্যাগিংয়ের শিকার হন।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, বুয়েটের ৮ হলের প্রতিটিতে কমপক্ষে ৫টি ‘রাজনৈতিক কক্ষে’ শিক্ষার্থীদের ডেকে মারধর ও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন করা হয়। হলের ছাদেও চলে এই ধরনের নির্যাতন। ছাত্রলীগের নেতা ও কর্মীরাই এ ধরনের নির্যাতন করে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ সবাই জানলেও কেউ প্রতিবাদ করত না।

জানা গেছে, ২০১৮ সালে শেরেবাংলা হলের ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের রুবেল নামে এক শিক্ষার্থীও নির্র্যাতনের শিকার হন। গত বছরের ৯ আগস্ট সোহরাওয়ার্দী হলের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দাইয়্যান নাফিজকে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের গুজব ছড়ানোর অভিযোগে বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি খন্দকার জামী-উস সানির নেতৃত্বে মারধর করা হয়। সে সময়ে ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ওই শিক্ষার্থীকে ফেসবুক লাইভে এনে গুজব সৃষ্টি করেছেন এ মর্মে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করেন। ২০১৫ সালে রাব্বানীর নেতৃত্বে বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী শাহাদাৎ হোসেইনকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়।

চলতি বছরের ২৭ জুন আহসানউল্লাহ হলে ২০৫ নম্বর রুমে তিনজনকে মারধর করার প্রতিবাদ জানান অভিজিৎ কর নামে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক শিক্ষার্থী। এ কারণে তাকেও নির্যাতন করা হয়। আঘাত পাওয়ার কারণে তিনি একটি কানের শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন। ২০১৩ সালে এনামুল হক নামে এক শিক্ষার্থীকে মেকানিক্যাল কুইজ পরীক্ষার দেওয়ার সময় হল থেকে তুলে এনে আহসানউল্লাহ হলের টর্চার সেলের ৩১৯ নম্বর রুমে মারধর করা হয়।

অভিযোগ দেওয়ার ওয়েবপেজ ঘেঁটে ছাত্রলীগ কর্তৃক শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন নির্যাতনের ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। ড. এমএ রশিদ হলে এক ছাত্রকে কান দিয়ে গরম পানি ঢেলে দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে বুয়েট সভাপতি শুভ্র জ্যোতি টিকাদার এক ছাত্রকে মারধর করে। তার মুখে লাথি মেরে রক্তাক্ত করার পর আরেক ছাত্রলীগ নেতা ক্ষত স্থানে লবণ ছিটিয়ে দেয়।

র‌্যাগিংয়ের নামে এক শিক্ষার্থীকে পেটানোর কারণে তার কান ফেটে যায়। এ অভিযোগের সত্যতা মেলায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে হল থেকে বহিষ্কার হন আহসানউল্লাহ হলের ছাত্রলীগ নেতা সৌমিত্র লাহিড়ী। কিন্তু দলীয় প্রভাবে তিনি হলেই থাকতেন।

বুয়েটের সিএসই বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে ওয়ানস্টপ অনলাইন রিপোর্টিং সিস্টেম (ইউ রিপোর্টার) নামে একটি সার্ভার গড়ে তোলেন। এতে বুয়েটের যে কোনো শিক্ষার্থী নিজের পরিচয় প্রকাশ না করে অভিযোগ জানাতে পারেন। রবিবার রাতে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার পর বেশকিছু নতুন অভিযোগ জমা পড়ে।

বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান মোস্তফা আকবর বলেন, বিটিআরসির পেজ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা আছে। এরই মধ্যে যে পরিমাণ অভিযোগ জমা পড়েছে, এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ কাজ করতে পারে।

advertisement