advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

প্রতিটি গেস্টরুমই যেন ছাত্রলীগের ‘টর্চার সেল’

বাকৃবি প্রতিনিধি
১১ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০১৯ ১৩:৪৫
ছবি : সংগৃহীত
advertisement

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) সাধারণ শিক্ষার্থীদের কারণে-অকারণে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়-এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়ার নামে আবাসিক হলের প্রায় প্রতিটি গেস্টরুমই পরিণত হয়েছে একেকটি ‘টর্চার সেলে’। নির্যাতন সইতে না পেরে প্রথম বর্ষের অনেক শিক্ষার্থী হল ছাড়ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার হয়নি বলে অভিযোগ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

অবশ্য এ বিষয়ে ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. ছোলায়মান আলী ফকির বলেন, ‘গেস্টরুমগুলোয় নির্যাতন বন্ধ করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। হল প্রভোস্ট এবং ছাত্র সংগঠনগুলোকে আমলে নিয়েই গেস্টরুম কালচার বন্ধ করতে আমরা কাজ করব।’

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯টি আবাসিক হলেই আছে এমন গেস্টরুম। এগুলো তৈরি হয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আত্মীয়স্বজন এবং দর্শনার্থীদের জন্য। কিন্তু শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতি রাতে হলের সাধারণ র্শিক্ষার্থীদের গেস্টরুমে হাজিরা দিতে হয়। প্রত্যেককেই সারাদিনের কাজের জবাবদিহিতা করতে হয়। দিনের বেলায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নামে রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এ ছাড়া মিছিলে না যাওয়া, নেতাদের সালাম না দেওয়া এবং তাদের আদেশের বিঘ্ন ঘটলেই শিক্ষার্থীদের ওপর চলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। এ ছাড়া ছাত্রদল-শিবির সন্দেহে প্রায়ই মারধর করার অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। র‌্যাগিয়ের ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, ১৯৮০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন ঘটনায় নিহত হয়েছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি হত্যাকা-েরও বিচার হয়নি। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৩১ মার্চ রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশরাফুল হক হলে ছাত্রলীগের কর্মীদের বেধড়ক পিটুনিতে মারাত্মকভাবে আহত হন মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ছাত্র ও একই সংগঠনের নেতা সাদ ইবনে মমতাজ। পরে তিনি ময়মনসিংহ শহরের একটি ক্লিনিকে মারা যান। অভিযুক্ত ছয় ছাত্রকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এ বিষয়ে ২ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এদের মধ্যে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তারা সবাই জামিনে মুক্ত রয়েছেন। এর পর ৫ বছর পেরোলেও ওই মামলার নিষ্পত্তি হয়নি এখনো।

এ ছাড়া গত ৪ আগস্ট হলের ছাত্রলীগের সভাপতিকে সালাম না দেওয়ার অভিযোগে প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে রাতভর নির্যাতন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জামাল হোসেন হলের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। রাত ১টা থেকে শুরু করে ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত কক্ষে আটকে রেখে ক্রিকেটের স্ট্যাম্প দিয়ে মারধর করা হয় ওই শিক্ষার্থীকে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে শিবির সন্দেহে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হলেই শিক্ষার্থীদের রাতভর নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে তদন্ত কমিটি গঠন করলেও ঘটনায় জড়িত কারও বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব, ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়া এবং বিচারহীনতায় ছাত্রলীগের এমন বর্বরতা বেড়েই চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এসব বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’

এ বিষয়ে বাকৃবি ছাত্রলীগের সভাপতি মো. সবুজ কাজী বলেন, বর্তমান কমিটিতে নির্যাতনের ঘটনা নেই বললেই চলে। সংগঠনের পক্ষ থেকে আমি প্রত্যেক নেতাকর্মীকে নির্দেশনা দিয়েছি গেস্টরুমের ভালো দিকগুলো বাস্তবায়ন করতে, যাতে হলের সিনিয়র-জুনিয়র সবাই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট কাউন্সিলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. শংকর কুমার দাশ বলেন, ‘প্রতিটি হলে শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো ধরনের চাপে না থাকে এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকে এ লক্ষ্যে সব প্রভোস্ট কাজ শুরু করেছেন। হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিগগিরই যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।’

advertisement