advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসিক্ত মানবিক বাংলাদেশ

১১ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০১৯ ২৩:৪৬
advertisement

মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ও ধর্মীয় সম্প্রীতি দুটোই আমার খুব প্রিয় বিষয়। আমার প্রাণের বিষয়। মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্মীয় সম্প্রীতি নিয়ে লিখতে গেলে প্রথমেই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ দুই বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘ধর্মের সরল আদর্শ’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘আমার গৃহকোণের জন্য একটি প্রদীপ আমাকে জ্বালাইতে হয়, তবে তাহার জন্য আমাকে কত আয়োজন করিতে হয়Ñ সেটুকুর জন্য কত লোকের উপর আমার নির্ভর। কোথায় সর্ষপ-বপন হইতেছে, কোথায় তৈল-নিষ্কাশন হইতেছে, কোথায় তাহার ক্রয়-বিক্রয়Ñ তাহার পরে দীপসজ্জারই বা কত উদ্যোগÑ এত জটিলতায় যে আলোটুকু পাওয়া যায় তাহা কত অল্প। তাহাতে আমার ঘরের কাজ চলিয়া যায়, কিন্তু বাহিরের অন্ধকারকে দ্বিগুণ ঘনীভূত করিয়া তোলে।...’

‘বিশ্বপ্রকাশক প্রভাতের আলোককে গ্রহণ করিবার জন্য কাহারও উপরে আমাকে নির্ভর করিতে হয় নাÑ তাহা আমাকে রচনা করিতে হয় না, কেবলমাত্র জাগরণ করিতে হয়। চক্ষু মেলিয়া ঘরের দ্বার মুক্ত করিলেই সে আলোককে আর কেহ ঠেকাইয়া রাখিতে পারে না।...

‘যেমন আলোক, তেমনি ধর্ম। তাহাও এইরূপ অজস্র, তাহা এইরূপ সরল। ...’

‘আমরা নিজেরা যাহা রচনা করিতে যাই, তাহা জটিল হইয়া পড়ে। আমাদের সমাজ জটিল, আমাদের সংসার জটিল, আমাদের জীবনযাত্রা জটিল।...’

‘এমন হইল কেন? ইহার একমাত্র কারণ, সর্বান্তঃকরণে আমরা নিজেকে ধর্মের অনুগত না করিয়া ধর্মকে নিজের অনুরূপ করিবার চেষ্টা করিয়াছি বলিয়া। ধর্মকে আমরা সংসারের অন্যান্য আবশ্যকদ্রব্যের ন্যায় নিজেদের বিশেষব্যবহারযোগ্য করিয়া লইবার জন্য আপন-আপন পরিমাপে তাহাকে বিশেষভাবে খর্ব করিয়া লই বলিয়া।’

‘ধর্ম আমাদের পক্ষে সর্বশ্রেষ্ঠ আবশ্যক সন্দেহ নাইÑ কিন্তু সেইজন্যই তাহাকে নিজের উপযোগী করিয়া লইতে গেলেই তাহার সেই সর্বশ্রেষ্ঠ আবশ্যকতাই নষ্ট হইয়া যায়। ’ (‘ধর্মের সরল আদর্শ’, রবীন্দ্ররচনাবলী, সপ্তম খ-, পৃষ্ঠা ৪৬০-৬১)

একটু বড় উদ্ধৃতি দিতে হলো। কিন্তু, এটুকুর মধ্যেই ধর্মীয় সম্প্রীতির বাণীটুকু নিহিত আছে। ধর্ম আর সত্য সংলগ্ন দুই বিষয়। সত্যকে ধারণ করলেই ধর্মকেও খুঁজে পাওয়া যায়। ব্যক্তি ও তার চারপাশের প্রতিবেশের মধ্যে যে সমন্বয় তা এক পরম সত্যেরই বহির্প্রকাশ। ব্যক্তির চাওয়া-পাওয়ার চেয়েও জীবন অনেক বড়। স্বদেশ ও ধর্ম তাকে পরার্থপরতায় ব্রতী হতে উৎসাহ জোগায়। রবীন্দ্রনাথ ‘সাধনা : দি রিয়েলাইজেশন অব লাইফ’ প্রকাশনায় (১৯১৬) এসব কথাই লিখেছিলেন। তার ভাষায়, গধহ’ং ধনরফরহম যধঢ়ঢ়রহবংং রং হড়ঃ রহ মবঃঃরহম ধহুঃযরহম নঁঃ রহ মরারহম যরসংবষভ ঁঢ় ঃড় যিধঃ রং মৎবধঃবৎ ঃযধহ যরসংবষভ, ঃড় রফবধং যিরপয ধৎব ষধৎমবৎ ঃযধহ যরং রহফরারফঁধষ ষরভব, ঃযব রফবধ ড়ভ যরং পড়ঁহঃৎু, ড়ভ যঁসধহরঃু, ড়ভ এড়ফ.

এই অনুভবের সঙ্গে আমরাও একাত্ম হব নিঃসন্দেহে। রবীন্দ্রনাথের আদর্শ বুকে ধারণ করেই বঙ্গবন্ধু বেড়ে উঠেছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবনাদর্শনে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ছিল খুবই প্রবল। তাই দেখা যায় পাকিস্তান আমলে যখন রবীন্দ্রনাথকে পূর্ব পাকিস্তানে নিষিদ্ধ করে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছিল তার বিরুদ্ধে সোচ্চার যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও অন্যতম প্রেরণার উৎস ছিলেন। আর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বস্তুত ধর্মীয় সম্প্রীতিরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

যদি সত্যি সত্যি ধর্মীয় সম্প্রীতি ধরে রাখা যেত তা হলে ভারতবর্ষ এমনভাবে ভাগ হতো না। ব্রিটিশ শাসনের আগে বাংলায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার উপস্থিতি সেভাবে পাওয়া যায় না। যদিও বলা হয় আর্যদের আগমনের ফলে যে ‘বেদ’ সৃষ্টি হলো তার মধ্যে যে বর্ণপ্রথা আছে তা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতারই উদাহরণ। এবং এক সময় বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণদের হাতে চার্বাক দার্শনিকদের যে নিগৃহের শিকার হতে হয়েছে তাও এক প্রকার ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাই। তবে তা সুদূর অতীতের কথা। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশ্ববিখ্যাত ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার ‘তর্কপ্রিয় ভারতীয়’ গ্রন্থে অবশ্য বলেছেন, হাজার বছর ধরেই ভারতীয় সংস্কৃতির মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা ছিল। তা না-হলে এত জাতপাত নিয়ে একটা দেশ এত শত বছর ধরে টিকতে পারত না। অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘মতবৈচিত্র্যের দীর্ঘ ইতিহাস শুধু যে ভারতের বিকাশ ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে কার্যশীল থেকেছে তাই নয়, আমার মতে এটি ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা উদ্ভবের পিছনে, এমনকি ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার যে রূপ গ্রহণ করেছে তার পেছনেও বিরাট অবদান রেখেছে। বলা দরকার, পশ্চিমী দুনিয়ার বিভিন্ন অংশে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে যা বোঝানো হয়, ভারতীয় ধর্মনিপেক্ষতার রূপটি অবিকল সেরকম নয়।’ (তর্কপ্রিয় ভারতীয়, অমর্ত্য সেন, পৃষ্ঠা- ১৪)

নৃতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদের হাত ধরে নয়, ভারত ভাগ হয়েছে ধর্মীয় উন্মদনার হাত ধরে। কিন্তু ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ যে দুই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে এক রাখতে পারে না তার প্রমাণ পাকিস্তান বিভাজন। মুক্তিযুদ্ধ ধর্মের ভিত্তিতে হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনাভিত্তিক। তাই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানের যে চার মূল নীতি যুক্ত করেছিলেন তার একটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি অংশে ৮ (১) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাÑ এই নীতিসমূহ এবং তৎসহ এই নীতিসমূহ হইতে উদ্ভূত এই ভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে।’ (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান, পুনঃমুদ্রণ : ২০০৬, পৃষ্ঠা-৩)

দ্বিতীয় ভাগের ১২নং অনুচ্ছেদে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা’ শিরোনামের তার বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি বাস্তবায়নের জন্যÑ

(ক) সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িকতা,

(খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান,

(গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার,

(ঘ) কোনো বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার উপর নিপীড়ন

বিলোপ করা হইবে।’ (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান, পুনঃমুদ্রণ : ২০০৬, পৃষ্ঠা-৩)

একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে এ চারটি মূলনীতি আসলে একই নীতিÑ প্রতিটি নীতির মধ্যেই সম্প্রীতির বাণী উচ্চারিত। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক হতে হলে অবশ্যই একটি দেশের অধিবাসীদের ধর্মনিরপেক্ষ হতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতার মানে, ধর্মহীনতা নয়Ñ ধর্মীয় সম্প্রীতি। আর যেখানে সম্প্রীতি বহমান সেখানে সমতাও বহমান। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাই এমন, যেখানে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা থাকবে, বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বজায় থাকবে এবং সমাজে কোনো বৈষম্য থাকবে না।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শুধু মুসলমানরাই অংশ নেননি, হিন্দু সম্প্রদায়সহ অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষই অংশ নিয়েছেন। এর কারণ মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটা জনযুদ্ধ। এই জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রত্যেক ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণির-পেশার মানুষই যার যার মুক্তির পথ অন্বেষণ করেছিল। আসলেই সে ছিল এক হিরন্ময় সময়। সুখে-দুঃখে আমরা সেদিন এক হয়েছিলাম। সত্যি সত্যি বিশ্বাস করতাম যে ‘মানুষ মানুষের জন্য।’

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে শারীরিকভাবে তার প্রিয় মানুষদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় আর সেজন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও বিলুপ্ত হয়ে যেতে বসে। তার জের আমাদের টানতে হয়েছে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। এর মধ্যে অনেক সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষ এ দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। পুরো সমাজে চলে ধর্মান্ধ সব উন্মাদনা। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে হিন্দু সম্প্রদায়সহ সংখ্যালঘু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের যথাযথ সম্মান ও নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ২০০১ সালে ফের ছন্দপতন। সে সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সদ্যগঠিত সরকারের মদদে কী ধরনের তা-ব ঘটেছে তা কারও ভুলে যাওয়ার কথা নয়। সেদিন এ সম্প্রীতির বাংলাদেশ ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছিল। সেই তিমির বিনাশ করেই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে এগোতে হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে আজ অবধি শেখ হাসিনার সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ব সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সব ধর্মের সহাবস্থান এবং তাদের মানবতাবাদী চিরন্তন আদর্শের চর্চা হোক তা নিশ্চিত করে চলেছেন। তিনি কতটা সফল হয়েছেন সেটা আপনারাই বিচার করবেন। তাই আজ আমরা সবাই নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। আজকের এ বাংলাদেশ হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসিক্ত মানবিক বাংলাদেশ। কোনো অপশক্তিই একে রোধ করত পারবে না। তাই আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম গেয়েছিলেন সম্প্রীতির এক অমর গানÑ

‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।/মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তাহার প্রাণ ।।/এক সে আকাশ মায়ের কোলে/যেন রবি শশী দোলে,/এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ির টান।।/এক সে দেশের খাই গো হাওয়া, এক সে দেশের জল,/এক সে মায়ের বক্ষে ফলাই একই ফুল ও ফল।/এক সে দেশের মাটিতে পাই/কেউ গোরে কেউ শ্মশানে ঠাঁই/এক ভাষাতে মাকে ডাকি, এক সুরে গাই গান।।’

অনুরূপ অনুভূতি খুঁজে পাই জ্ঞানতাপস ড. শহীদুল্লাহর কণ্ঠেও। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা হিন্দু-মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য যে আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। মা-প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারা ও ভাষায় বাঙালির এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে মালা-তিলক-টিকিতে এবং টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই। আর অভিন্ন এই বাঙালি সত্তাই আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধেও সড়কে একসঙ্গে সুখ-দুঃখের গান গেয়ে হাঁটতে শিখিয়েছে।’ আজও সেই সম্প্রীতির অনুভব বুকে নিয়েই আমরা সামনের দিকে হেঁটে যাচ্ছি। এই অভিযাত্রা অব্যাহত থাকুক, মানবতার জয় হোক। সামাজিক শান্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি চলমান থাকুক।

ড. আতিউর রহমান : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ

advertisement