advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ফাঁদ

১১ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০১৯ ২৩:৪৬
advertisement

আঁতেল হতে হতেও হতে না পারা এক ছোট ভাই সেদিন অফিসে এলো। এ কথা, সে কথার পর বললÑ একটা বিষয় খেয়াল করেছেন?

কী?

আমাদের কিছু প্রবাদের প্রাসঙ্গিকতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। কোনো কোনোটার প্রাসঙ্গিকতা নেই বললেই চলে। বাস্তবতার সঙ্গে যায় না।

তাই? যেমন...।

এই যেমন ধরেন, ‘আঙ্গুর ফল টক’। আমি তো এই প্রবাদ থাকার কোনো মানে দেখছি না।

কেন?

কারণ যখন এই প্রবাদ রচিত হয়, সে সময় আঙ্গুর ফল ছিল ভয়াবহ মিষ্টি। আর এখনকার আঙ্গুর ফল কিসে ভরা?

ফরমালিনে ভরা।

আরে সেটি তো আছেই। কিন্তু স্বাদ কেমন?

টক।

খালি টক। রীতিমতো তেঁতুলের সঙ্গে কম্পিটিশন দেয়। জুস বানাইলে তো বুঝতেই পারবেন না কোনটা আঙ্গুরের আর কোনটা তেঁতুলের। তাই ‘আঙ্গুর ফল টক’Ñ এটা প্রবাদ হতে পারে না।

কেন হতে পারে না?

কারণ এটা এখন বাস্তবতা।

তা হলে প্রবাদ কী হওয়া উচিত? আমি জানতে চাই।

এখনকার প্রবাদ হওয়া উচিত, ‘আঙ্গুর ফল মিষ্টি’।

বাহ! তোমার চিন্তায় তো গভীরতা আছে।

গভীরতার আর দেখছেন কী। এখনো তো হাঁটুজলে আছি।

তা গভীর জলে নামার আগে বলো। লুঙ্গি কাচা দেবো। হাঃ হাঃ হাঃ।

ছোট ভাই আমার রসিকতাকে আমলে নেয় না। সে আগের চেয়েও গম্ভীর। তার মানে, পরবর্তী প্রবাদ এটার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

এবার আসেন পরেরটায়।

কিছুক্ষণ ঝিম মেরে ছোট ভাই মুখ খোলে। আমরা কথায় কথায় কী বলিÑ ‘ঘুঘু দেখেছ কিন্তু ফাঁদ দেখোনি’।

হু-উ-ম, বলি তো। এখানে আবার কী সমস্যা?

মহাসমস্যা। পুরো চিত্রই তো এখন পাল্টে গেছে।

পাল্টে গেছে?

হুম, একদম পাল্টে গেছে।

কীভাবে?

আরে ভাই, আমাদের জীবন এখন ফাঁদে ভরপুর। চারপাশে প্রতারক-দালালের ফাঁদ। রাস্তায় মৃত্যুফাঁদ। অন্ধকার নামলে ছিনতাইকারীদের ফাঁদ। বাজারে দোকানির ফাঁদ। পথে মলম পার্টির ফাঁদ। হাইওয়েতে মরণফাঁদ। একটু বৃষ্টি হলে পানি জমা রাস্তায় রিকশা উল্টে যাওয়ার ফাঁদ।

হুম, সরকারি অফিসে টেবিলের তলার ফাঁদ। ফাঁদের তালিকায় আমিও একটা ফাঁদ যুক্ত করি।

ছোট ভাই মাথা নাড়েÑ রাইট। তার মানে, ঘর থেকে বের হলেই প্রতিনিয়ত চারপাশে আমরা কী দেখছি? অসংখ্য ফাঁদ। চোখ খুললেই ফাঁদ। কিন্তু ঘুঘু? ঘুঘু শব্দটা বলে ছোট ভাই আমার মুখের দিকে তাকায়।

নিরীহ টুনটুনির মতো চেহারা করে আমি তাকাই ছোট ভাইয়ের মুখের দিকে।

কী? শেষ কবে সামনাসামনি ঘুঘু দেখেছেন বলেন তো?

ছোট ভাইয়ের প্রশ্নে আমারও মনে হলো, তাই তো, শেষ কবে ঘুঘু দেখেছি? মনে করার চেষ্টা করলাম। যেটি মনে পড়ল, সেটি ছোট ভাইকে বলা যাবে না। কারণ শেষ ঘুঘু দেখেছি ক্লাস ওয়ানে পড়া ছোট মেয়ের ড্রইং বইয়ে। ফলে চুপ থাকাই শ্রেয়।

কী? মনে করতে পারছেন না তো। মনে না পড়াটাই স্বাভাবিক। কারণ এখন ঘুঘু দেখা যায় না। তার মানে, কী দাঁড়াল?

কী দাঁড়াল?

‘ঘুঘু দেখেছ কিন্তু ফাঁদ দেখোনি’Ñ এই প্রবাদ বর্তমানে শতভাগ অপ্রাসঙ্গিক।

তাই তো মনে হচ্ছে। আমি মাথা নাড়ি।

এ জন্য এটাকে বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে হালনাগাদ করতে হবে।

তা প্রবাদটা এখন কী হওয়া উচিত?

সিম্পল। জাস্ট উল্টো দিন। ‘ফাঁদ দেখেছ কিন্তু ঘুঘু দেখোনি’।

আমি বললাম, ওয়াও। তোমার গলায় মালা দেব, ঘাড়টা প্লিজ নোয়াও।

এবার ছোট ভাইয়ের মুখে হাসি। এখানেই শেষ নয় ভাই। আরও আছে!

হুম।

ওই প্রবাদটা তো শুনেছেন, ‘নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা’।

শুনব না মানে! কী বলো। এটা তো বহুল প্রচলিত প্রবাদ। সেদিনও তোমার ভাবি এই বলে আমাকে খোটা দিল।

আচ্ছা। তো, এখন আপনি আমাকে বলেনÑ এই শহরে আপনি উঠান পাবেন কোথায়? গ্রামে তাও কিছু উঠান আছে। কিন্তু শহরের অনেক ছেলেমেয়ে তো উঠান কী জিনিস, সেটি জানেই না। ত্যাড়া-ব্যাঁকা তো পরের বিষয়।

তা, তুমি কী বলতে চাচ্ছ প্রবাদ হওয়া উচিত, ‘নাচতে না জানলে ড্রয়িংরুম বাঁকা?’

না, তা নয়। তবে আমার মনে হয়, এ প্রবাদটারও সংস্কার দরকার।

সংস্কারপন্থি প্রবাদ? না না, আমাদের দেশে সংস্কারপন্থিদের কোথাও জায়গা হয় না।

আহা, প্রবাদের মধ্যে আপনি রাজনীতি টেনে আনছেন কেন! ছোট ভাইয়ের গলায় হালকা উষ্মা।

বললাম, কারণ রাজনীতিবিদরাও প্রবাদ ব্যবহার করেন।

তাই বলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবাদের আধুনিকায়ন হবে না?

তা অবশ্য হওয়া উচিত। দেশ আধুনিক হচ্ছে। দেশের মানুষ আধুনিক হচ্ছে। প্রবাদ পিছিয়ে থাকবে কেন।

সেটিই। তা হলে আধুনিকায়নের কাজটাও করে ফেলা উচিত।

কিসের!

‘নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা’র। এমনভাবে প্রতিস্থাপন করতে হবেÑ যাতে শহর-গ্রাম সবার কাছেই বোধগম্য হয়।

তো করে ফেলো।

এ জায়গায় ধরা খেয়েই তো আপনার কাছে এসেছি। আমার মাথায় কিছু আসছে না। এ কাজটা আপনি করে দেন।

এই তো বিপদে ফেললে। এটা আবার ওই প্রবাদের মতো হয়ে যাবে না তোÑ ‘অনুরোধে ঢেঁকি গেলা’। হাঃ হাঃ হাঃ।

না না ভাই। আপনি পারবেন। কত কিছু করে ফেলছেন আর এটা পারবেন না?

বলছ?

হু-উ-ম।

আমি মাথাটা স্টার্ট দিয়ে দুই দিনের না কাটা বাসি দাঁড়ি চুলকাই।

‘নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা’র বিকল্প প্রবাদ... উমম... উমম...। পাইছি...।

কী?

‘খাইতে না জানলে মাছে কাঁটা’।

পলাশ মাহবুব : কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার এবং উপ-সম্পাদক, দৈনিক সারাবাংলা

advertisement