advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অব্যাহত থাকুক শুদ্ধি অভিযান

১১ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০১৯ ২৩:৪৬
advertisement

দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে দেশব্যাপী চলমান শুদ্ধি অভিযানে জনমনে কিছুটা হলেও স্বস্তি লক্ষ করা যাচ্ছে। জনগণ মনে করছে, এ ধরনের অভিযান সমাজে বিশৃঙ্খলার পরিমাণ কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতিমুক্ত ও সুশাসননির্ভর যে বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এ অভিযানের মাধ্যমে তার কিছুটা হলেও বাস্তবায়িত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

একই সঙ্গে কিছু আশঙ্কাও জনগণের মাঝে বিরাজ করছে। ক্যাসিনো-কা-ের সঙ্গে জড়িতদের পাশাপাশি অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের এখনো আইনের আওতায় না আনায় আশঙ্কা বিস্তৃত হচ্ছে। প্রতিদিনই সংবাদপত্র ও মিডিয়ায় কমবেশি নানা দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু যে পরিমাণ সংবাদ প্রকাশিত হয়, সে পরিমাণ ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। নানা ফাঁকফোকর গলিয়ে রেহাই পেয়ে যান দুর্নীতিবাজরা। তার পর আবার প্রবল বিক্রমে শুরু করেন অপকর্ম। এই যখন অবস্থা তখন প্রধানমন্ত্রীর সাহসী পদক্ষেপ জনগণের মাঝে আশার আলো জাগিয়ে দেয়।

এটা আমরা সবাই জানি, এ দেশে যারা নানা অপকর্ম করেন তাদের পেছনে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক শক্তিধররা সম্পৃক্ত থাকেন। সেই প্রমাণিত সত্যের জায়গাটি উপলব্ধি করে শুধু ক্যাসিনো-কা-ের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে নয়, নেপথ্য মদদদাতাদেরও চিহ্নিত করার বিষয়টি জনগণকে আরও আশ্বস্ত করবে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ যে, তিনি দলের নাম ভাঙিয়ে বা দলপ্রধানের নাম ব্যবহার করে পবিত্র আমানতকে যারা খেয়ানত করেন তাদের আর ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর মাধ্যমে আবারও প্রমাণ করলেন ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।’

বাংলাদেশে দুর্নীতি ও অনিয়মের ইতিহাস অনেক বিস্তৃত। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনে পিষ্ট বাঙালির দুর্নীতির রেকর্ড খুব একটা নেই। কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব, পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাঙালিদের মধ্যে থাকা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের একটি অংশ দুর্নীতিতে মেতে ওঠে। ওই সময় বঙ্গবন্ধু বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘আমি ভিক্ষা করে নিয়ে আসি। চাটার দল সব খেয়ে ফেলে।’ বঙ্গবন্ধু সে সময় আমলা ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের বারবার সতর্ক করেছিলেন দুর্নীতিমুক্ত থাকার জন্য। বিরোধী রাজনীতির নামে কিছু রাজনৈতিক দল ও নেতা সে সময় বঙ্গবন্ধুকে ঠেকানোর জন্য দুর্নীতিবাজ আমলা, প্রশাসনের কর্মচারীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অসৎ ব্যক্তিদের মদদ দিয়েছিলেন। এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্র্নীতিবিরোধী অনমনীয় মনোভাবের কারণে দেশে অনিয়ন্ত্রিত মাত্রার দুর্নীতি কিছুটা হলেও কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছু চুনোপুঁটি ছাড়া অনিয়ম বা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত রাঘববোয়াল কেউ আইনি জালে ধরা পড়েননি। আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট কয়েকজন ছাড়া প্রশাসন বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবাজ বা অপকর্মকারী কেউ-ই এখন পর্যন্ত ধরা পড়েননি। অভিযোগ আছে, ক্যাসিনো অপকর্ম পুলিশকে ম্যানেজ করে বছরের পর বছর ধরে চলছিল। এসব জায়গা থেকে পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তা নিয়মিত মাসোহারা নিতেন। তারা আজ কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে? যারা ক্যাসিনো পরিচালনা করেছেন বা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারা ধরা পড়লে মদদদাতা হিসেবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ধরা পড়বেন না কেন?

দেশে দুর্নীতি, অনিয়ম বা অপকর্মের যে অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেটা শুধু ক্যাসিনোর জন্য নয়, নানাভাবে সমাজটা কলুষিত হয়েছে বিভিন্ন মাত্রায়। সমাজের বিভিন্ন স্তরে থাকা দুর্নীতিবাজ ও অপকর্মকারীদের যতদিন পর্যন্ত আইনের আওতায় আনা না হবে ততদিন পর্যন্ত দেশ শুদ্ধ হবে না। সব স্তরে থাকা রাঘববোয়াল ও মদদদাতা খলনায়করা যতদিন চিহ্নিত না হবেন ততদিন পর্যন্ত এ ধরনের অভিযানে কোনো স্থায়ী সমাধান হবে না। হয়তো সাময়িকভাবে অপকর্ম বন্ধ থাকবে কিছুদিন। আবার সুযোগ এলে তা বহুগুণ বেড়ে জোর বেগে চলবে।

শুধু রাজনীতিবিদ নয়, অভিযোগ আছে প্রশাসন ও বিভিন্ন বাহিনীতে থাকা দুর্নীতিবাজদের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। ব্যবসায়ী বা অন্যান্য পেশাজীবীর মধ্যেও অনেক দুর্নীতিবাজ রয়েছেন। এই দুর্নীতিবাজদের বিষয়ে কী হবে সেটা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশিত চলমান শুদ্ধি অভিযানের এই পর্যায়ে প্রশাসন ও বিভিন্ন বাহিনীতে শুদ্ধি অভিযান চালানো প্রয়োজন। সাধারণ মানুষ মনে করে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় বাংলাদেশে সব ধরনের দুর্নীতি, অপকর্ম ও অপরাধ হয়ে থাকে। দেশটাকে শুদ্ধ করতে হলে সমাজের সব স্তরে শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন। বাংলাদেশে নানা কারণে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে সেটা মিথ্যা নয়। শৃঙ্খলার মধ্যেও চলছে অনেক বিশৃঙ্খলা। কিন্তু সবই এড়িয়ে যাওয়া বা না দেখার ভান করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত শুদ্ধি অভিযান শেষ পর্যন্ত শুদ্ধতার মধ্য দিয়ে শেষ করা সম্ভব হলে হয়তো দেশটা শুদ্ধতার দিকে যাত্রা করতে পারে।

যারা অব্যাহত অপকর্মের মাধ্যমে নিজের সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছেন অন্যের স্বপ্ন হত্যা করে, যারা মানুষের জীবনের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিয়েছেন অনিশ্চিত ব্যবসার হাতছানি দিয়ে, যারা বিভিন্ন বড় শক্তির ছায়ায় রয়েছেন, যারা তদবির বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা অবৈধ উপার্জন করে বিদেশে পাচার করেছেন, যারা ব্যবসার লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতিকে ব্যবহার করছেন, যারা প্রকৃত আওয়ামী লীগার না হয়ে পুরো পরিবারসহ আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার সুবিধা নিচ্ছেন, রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের সহযোগিতা করেছেন বা করছেন, যারা দলীয় পদ-পদবি ব্যবহার করে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে বিতর্কিত করছেন তাদের কী হবে সেটা নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি বা রাষ্ট্র পরিচালনায় ইতিবাচক প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার অবদান অস্বীকার করা সম্ভব নয়। দেশকে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপকর্মের কলুষমুক্ত করতে এর আগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তারই স্বপ্ন বাস্তবায়নে শেখ হাসিনা যে শুদ্ধি অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন তার ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা থাকা খুবই প্রয়োজন। ক্ষমতায় থেকে সাহস ও সততার সঙ্গে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে যে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন শেখ হাসিনা তার যথার্থ ইতি টানতে না পারলে সংকট বাড়বে। যার দায় হয়তো বাংলার ‘উন্নয়নের বাতিঘর’ শেখ হাসিনার ওপর বর্তাবে। তাই চলমান শুদ্ধি অভিযানকে কেউ যেন অশুদ্ধতার জালে আটকাতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সব অপরাধের মদদদাতা ও খলনায়কদের চিহ্নিত করে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে।

সোহেল হায়দার চৌধুরী : সাংবাদিক ও সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)

advertisement