advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

২০১৯ একদিকে সুন্দরবন বিনাশ, অন্যদিকে গ্যাস রপ্তানির আয়োজন

১৬ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০১৯ ০১:০৫
advertisement

বাংলাদেশে গ্যাস রপ্তানির অপচেষ্টা চলছে নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে। বিশ^ব্যাংকের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছিল আশির দশক থেকে। এর বিরুদ্ধে তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে দেশের জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, গ্যাস রপ্তানির একাধিক অপচেষ্টা প্রতিরোধ করা হয়েছে। তার কারণেই এখনো দেশে শিল্প-কারখানা চলছে, বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, সিএনজি ব্যবহারে পরিবেশ আরও বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে। এর কারণেই বছরে ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার তেল আমদানি থেকে রক্ষা পেয়েছে দেশ।

কিন্তু চক্রান্ত থামেনি। ২০০৮ সালে আবার উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি বা ‘পিএসসি ২০০৮’-এ গ্যাস রপ্তানির বিধান রাখা হয়। এর অধীনে ২০০৯ সালে সরকার জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি করে মার্কিন কোম্পানি কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে। কনোকো ফিলিপস তাদের শেয়ারের দাম বাড়িয়ে লাভবান হয়, কোনো কাজের কাজ করেনি। আমরা কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে সেই চুক্তির বিরোধিতা করেছি রাজপথে, গবেষণা, লেখালেখি ও বিতর্কের মাধ্যমে। আমরা ‘খনিজ সম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধ আইন’ করার দাবি জানিয়েছি, সরকারের সুবিধার জন্য এ আইনের খসড়া তৈরি করে সরকারকে জমা দিয়েছি। গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের যথাযথ পথ প্রস্তাব করেছি।

জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে আন্দোলন ও জনমতের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের মডেলে রপ্তানির বিধান বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই মডেল পরে সংশোধন করা হয়, তাতে আবারও রপ্তানিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়। এই সংশোধিত মডেলে ২০১৪ সালে ভারতের ওএনজিসি অগভীর সমুদ্রের ৪ ও ৯ নম্বর ব্লক, সিঙ্গাপুরের কোম্পানি ক্রিস এনার্জি এবং অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানি সান্টোস যৌথভাবে ১১ নম্বর ব্লকের ইজারা পায়। ২০১৭ সালে চুক্তি সই হয় কোরীয় কোম্পানি দাইয়ুর সঙ্গে। কস্ট রিকভারি বা বিনিয়োগ না উঠে আসা পর্যন্ত বিদেশি কোম্পানির অংশ হিসেবে তেল-গ্যাসের অনুপাত ৫৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৭০ শতাংশ। বাংলাদেশের অংশ কেনার দাম তখন আরও বাড়ানো হয়। প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম বাড়িয়ে করা হয় সাড়ে ৬ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫০০ টাকা। উপরন্তু প্রতিবছর ২ শতাংশ করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়।

দায়মুক্তি আইন, যা ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০’ নামে অভিহিত, তাকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করেই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সরকার দরপত্র ছাড়া একের পর এক চুক্তি করছে। এই দায়মুক্তি আইন দিয়ে সব অস্বচ্ছতা-দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে জবাবদিহিতার পথ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে বছরের পর বছর। গ্যাস সংকটের কারণে যেখানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন এখন ৫০০-৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদিত হয়, সেখানে পেট্রোবাংলার আমদানি করা এলএনজিভিত্তিক গ্যাস দিয়ে বিনা টেন্ডারে মেঘনাঘাটে ৭১৮ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করা হয়েছে ভারতীয় কোম্পানি রিলায়েন্সের সঙ্গে। আরও চুক্তির প্রস্তুতি চলছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের সমুদ্রে তেল-গ্যাস সম্পদ নিয়ে সরকার বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে অধিকতর জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তির প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মন্ত্রিসভা উৎপাদন অংশীদারি চুক্তির সর্বশেষ মডেল ‘পিএসসি ২০১৯’ অনুমোদন করেছে। এটি করা হয়েছে গভীর ও অগভীর সমুুদ্রে বাংলাদেশের গ্যাস-তেলসহ খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করার জন্য। এ মডেলে পিএসসির আগেরগুলোর তুলনায় বিদেশি কোম্পানির জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, তাদের গ্যাস রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে, বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে বাংলাদেশকে যে গ্যাস কিনতে হবে, তার দাম আরও বাড়িয়ে প্রতি হাজার ঘনফুট ৭ দশমিক ২৫ ডলার করা হয়েছে, তার সঙ্গে ট্যাক্সও মওকুফ করা হয়েছে।

জাপানের একটি সংস্থা জাইকার মাধ্যমে ২০১৬ সালে প্রণীত মহাপরিকল্পনা (পিএসএমপি ২০১৬) অনুযায়ী সরকার দেশের বিদ্যুৎ খাতে কয়লা, এলএনজি ও পারমাণবিক নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। এটা করা হচ্ছে গ্যাস সংকটের কথা বলেই। স্থলভাগ ও সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আমরা অনেক দিন থেকেই দাবি জানিয়ে আসছি। সরকার এই পথে কখনো যায়নি, বরং সক্ষমতা বাড়ানোর বদলে যতটুকু সক্ষমতা আছে তা আরও সংকুচিত করা হয়েছে। জাতীয় সংস্থাকে সুযোগ না দিয়ে স্থলভাগেও কয়েক গুণ বেশি খরচে বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হয়েছে। সমুদ্রের সম্পদ অনুসন্ধানে উদ্যোগ না নিয়ে গ্যাস সংকট জিইয়ে রাখা হয়েছে, তার পর তার অজুহাতে কয়েক গুণ বেশি দামে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। গ্যাস সংকটের অজুহাতেই ব্যাপকভাবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হচ্ছে, এমনকি দেশের প্রাকৃতিক রক্ষাবাঁধ সুন্দরবন ধ্বংস করতেও সরকারের দ্বিধা নেই, করছে দেশবিনাশী রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। পারমাণবিক বিদ্যুতের ঝুঁকি ও বিপদের যে কোনো সীমা-পরিসীমা নেই, তা সর্বজনবিদিত। বাংলাদেশের মতো ঘন জনবসতি, পানি ও আবাদি জমির ওপর বিপুলভাবে নির্ভরশীল একটি দেশে এই ঝুঁকি বিশে^র যে কোনো দেশের চেয়ে অনেক বেশি। এ সত্য অগ্রাহ্য করে রূপপুরে বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প করা হচ্ছে, একে অভিহিত করা হচ্ছে ‘জাতীয় গৌরব’ হিসেবে। অন্যদিকে এই একই সরকার দেশের নিজস্ব গ্যাস-তেল সম্পদ রপ্তানির বিধান রেখে বিদেশি কোম্পানি ডাকছে। এসব উদ্যোগে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানি ও তাদের দেশি কমিশনভোগীদের পকেট ভারীর ব্যবস্থা হচ্ছে, আর বাংলাদেশের জন্য সৃষ্টি করা হচ্ছে মহাবিপর্যয় ও জাতীয় নিরাপত্তাহীনতা।

আমরা বরাবর বলেছি, যেহেতু সমুদ্রের গ্যাস সম্পদের সম্ভাব্য বিশাল মজুদ দেশের ভবিষ্যতের বড় অবলম্বন, সেহেতু জাতীয় সংস্থার মালিকানায়, প্রয়োজনে বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়ে বা কোনো নির্দিষ্ট কাজে দক্ষতার ঘাটতি থাকলে সাব-কন্ট্রাক্টর নিয়োগের মাধ্যমে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ করা হোক। এভাবে জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর কর্মসূচি নিলে দক্ষ জনশক্তি নির্মাণ সম্ভব, দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের শক্তিশালী ভিত নির্মাণ সম্ভব। কিন্তু সরকারের তাতে আগ্রহ নেই।

প্রধানমন্ত্রী বরাবরই দাবি করেন, তিনি দেশে ৫০ বছরের গ্যাস মজুদ নিশ্চিত না করে গ্যাস রপ্তানির বিরোধী, তা হলে বারবার এ ধরনের উদ্যোগ কেন? তা হলে আমাদের প্রস্তাবিত ‘খনিজ সম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধ আইন’ পাস করতে অসুবিধা কী? ৫০ বছরের মজুদের বদলে গ্যাস সংকট বহাল থাকা অবস্থায় কীভাবে গ্যাস রপ্তানি চুক্তি হয়? কী যুক্তিতে সরকারের রপ্তানি নীতিতে খনিজ সম্পদ রপ্তানিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে?

সাগরের গ্যাস নিয়ে আত্মঘাতী নীতির পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীসহ একাধিক কর্মকর্তা মিয়ানমারের দৃষ্টান্ত টানেন। ঠিক, বাংলাদেশের নিকটবর্তী প্রতিবেশী মিয়ানমার গ্যাস রপ্তানিভিত্তিক চুক্তির ওপর নির্ভরশীল থেকেছে দশকের পর দশক। তাদের গ্যাসের মজুদ বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। কিন্তু এই পথে সে দেশে বিদ্যুতের সংকট, শিল্পায়নের সংকট কাটেনি। দারিদ্র্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদিতে বাংলাদেশের চেয়েও পিছিয়ে সেই দেশ। সে দেশে মোট রপ্তানি আয়ের অর্ধেকই আসে গ্যাস রপ্তানি থেকে। বিশ্বজুড়ে গ্যাসের দাম পড়ে যাওয়ায় সেই আয়ও কমে গেছে। নিজেদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধান না করে মিয়ানমার কেন তার সীমিত সম্পদ রপ্তানি করছে? করছে কারণ এর সুবিধাভোগী দেশি সামরিক জান্তা, তার সহযোগী ক্ষুদ্র গোষ্ঠী এবং বিদেশি কোম্পানি, তারাই ক্ষমতা আঁকড়ে আছে। নিজেদের সক্ষমতা বিকাশেও তারা নজর দেয়নি। আফ্রিকার খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ অনেক দেশের অভিজ্ঞতা এ রকমই। কতিপয় গোষ্ঠীর স্বার্থ নিশ্চিত করতে গিয়ে দেশে অগণতান্ত্রিক শাসন টিকে থেকেছে দশকের পর দশক। গোত্রীয় সংঘাত, সহিংসতার পাশাপাশি মানুষের দুর্ভোগ, চাকচিক্যের আড়ালে দেশের দৈন্য দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। বাংলাদেশ এ পথে যেতে পারে না।

সরকার যদি মিয়ানমার বা নাইজেরিয়াকে আদর্শ বিবেচনা না করে মালয়েশিয়া, ভারত, চীন বা নরওয়ের দিকে দৃষ্টি দেয়, তা হলে জাতীয় মালিকানা, সক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানের বিকাশের দিকেই তার নজর দেওয়ার কথা। এসব দেশের কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে সরকারের আগ্রহ, কিন্তু এসব দেশ কীভাবে জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করেছে তার থেকে শিক্ষা নেওয়ার কোনো আগ্রহ নেই। উল্টো জ¦ালানি মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা বা বাপেক্সে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার যোগ্যতা হলো এই ঘোষণা দেওয়া যে, ‘আমরা কিছুই করতে পারব না, আমাদের যোগ্যতা নেই।... এসব চুক্তি করতেই হবে।’

প্রকৃতপক্ষে স্থলভাগ ও সমুদ্রের বিশাল সম্পদ অনুসন্ধান, উত্তোলন ও ব্যবহারের যথাযথ নীতি গ্রহণ করলে সুন্দরবিনাশী রামপাল কিংবা দেশধ্বংসী রূপপুর প্রকল্পের কোনো যৌক্তিকতা থাকে না, ব্যয়বহুল এলএনজিও আমদানি করতে হয় না। বরং গ্যাস অনুসন্ধানে এবং নবায়নযোগ্য জ¦ালানি বিকাশে জাতীয় সক্ষমতা বাড়ালে ঘরে ঘরে শিল্প-কৃষিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হবে, বিদ্যুতের দামও কমবে, বিদ্যুতের নামে রামপাল, রূপপুরের মতো প্রকল্প দিয়ে সারা দেশের মানুষকে মৃত্যুকূপে ঠেলে দেওয়ার দরকার হবে না। অথচ সরকার করছে উল্টোযাত্রা।

এর বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধ ছাড়া বাংলাদেশের রক্ষা পাওয়ার আর কোনো উপায় নেই।

আনু মুহাম্মদ : শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সম্পাদক, সর্বজনকথা

advertisement