advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

প্রথম বর্ষেই চুপসে যায় স্বপ্নফানুস

১৮ অক্টোবর ২০১৯ ০১:৩১
আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০১৯ ০১:৩১
advertisement

দেশসেরা মেধাবীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণে পছন্দের শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হন, তারাই শুধু প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। এখানে ভর্তি হওয়ার সময় এসব মেধাবী মুখের বুকজুড়ে স্বপ্ন থাকে আকাশছোঁয়ার; কিন্তু ভর্তির পর যখন গণরুম, গেস্টরুম আর ‘সিট সংকট’-এর বঞ্চনা শুরু হয়; তখন তাদের স্বপ্নমাখা প্রত্যাশা অল্পসময়ের মধ্যেই চুপসে যায়।
ঢাবি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের হলে সিট দেওয়ার নিয়ম নেই। এ কারণে দূর-দূরান্ত থেকে রাজধানীতে পড়তে আসা নবীন শিক্ষার্থীরা পড়েন অকূল পাথারে। বাধ্য হয়েই তারা দ্বারস্থ হন ছাত্রনেতাদের। আর ছাত্রনেতারা তাদের এ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে নিজের মুঠোয় নিয়ে নেন; চালান নির্যাতন-নিপীড়নও।
প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ভর্তি করার সময় তার নামের পাশে একটি করে হলের নাম যুক্ত করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। হাসিমুখে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর প্রথম মুখ মলিন হয়, যখন সে বুঝতে পারে হলে তার থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। বাইরে থাকার আর্থিক অবস্থা ও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বহু শিক্ষার্থীকেই নিরুপায় হয়ে আশ্রয় নিতে হয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের কাছে। হল প্রশাসনের

অভ্যন্তরে তাদের আছে আলাদা প্রশাসনব্যবস্থা। সেই প্রশাসনব্যবস্থা এতটাই শক্তিশালী যে, হল প্রশাসনকে চলতে হয় তাদের পরামর্শে। ফলে অন্যান্য বর্ষে যখন সিট ফাঁকা হয়, তখন কোন রুমে কে উঠবে সেই সিদ্ধান্ত দেওয়ার একচ্ছত্র এখতিয়ার থাকে ক্ষমতাসীন দলের অনুগত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের হাতে। ছাত্রলীগের অধীনে হলে ওঠার পর সাধারণত একজন শিক্ষার্থীর ঠাঁই হয় গণরুমে। গণহারে যেসব রুমে গাদাগাদি করে থাকতে হয়, সেসব রুমকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘গণরুম’ বলা হয়ে থাকে। বৈধভাবে চারজন থাকতে পারেন এমন এক-একটি রুমের নামে যখন গণরুমের কলঙ্ক যুক্ত হয়, তখন সেই রুমে বসবাস করে অন্তত ২৫-৩০ জন করে। কোনো কোনো গণরুমে রাতে এককাত হয়ে ঘুমাতে হয়, শিক্ষার্থীরা ঘুমানোর এই পদ্ধতিকে নাম দিয়েছেন ‘ইলিশ ফালি’।
নিয়তি মেনে নিয়ে অগত্যা গণরুমে যেসব শিক্ষার্থী থাকেন, তাদের কাছে অপর আতঙ্কের নাম গেস্টরুম। বাংলায় অতিথিকক্ষ হলেও এখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একদমই অতিথিসুলভ আচরণ করা হয় না। বরং কংস মামার চরিত্রে হাজির হয় গেস্টরুমের আমন্ত্রণকারীরা। অনেক ক্ষেত্রেই টর্চার সেলের বৈধ নাম গেস্টরুম। ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ দুই নেতাÑ এ চারজনের অনুসারী নিয়ে হলে হলে গড়ে ওঠে চারটি গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপ পৃথকভাবে তার অনুসারীদের নিয়ে গেস্টরুমে বসে। প্রথম বর্ষকে দ্বিতীয় বর্ষ, দ্বিতীয় বর্ষকে তৃতীয় বর্ষÑ এভাবে ধারাবাহিকভাবে জুনিয়রদের সিনিয়র নেতারা গেস্টরুমে ডেকে থাকেন। কোনো কোনো হলে আবার গণরুমও ভাগ্যে জোটে না। ফলে বাধ্য হয়েই থাকতে হয় হলের বারান্দা, মসজিদ, গেমসরুম, টিভিরুম কিংবা ছাদে খোলা আকাশের নিচে। খোলা আকাশের নিচে ঘুমাতে গিয়ে হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টিতে রাতে ঘুমের পরিবর্তে বৃষ্টির জলে নিজেদের চোখের নোনাজল আড়াল করতে হয় শিক্ষার্থীদের। মশার কামড়ে প্রায়ই ভুগতে হয় এ শিক্ষার্থীদের। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে যেসব শিক্ষার্থী বারান্দায় রাতযাপন করেন, তারা ওই স্থানের নাম দিয়েছেনÑ মশাবাহিত রোগের নামানুসারে ‘ডেঙ্গু ব্লক’।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলোর একপেশে আধিপত্যের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আবাসনবঞ্চিত হচ্ছেন। দলমত নিয়ে যাদের আগ্রহ নেই কিংবা যারা এসব বিষয়ে নির্লিপ্ত, তারা বরাবরই আবাসিক-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর ভিন্নমতাবলম্বীরা তো ক্ষমতাসীন দলের অনুগত ছাত্র সংগঠনের নেতাদের কাছে ক্যাম্পাসেই অনাহূতের মতো। এ থেকে উত্তরণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত কার্যকর ভূমিকা রাখা; কিন্তু বাস্তবতার বিচারে প্রশাসনের ভূমিকা প্রহসনতুল্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনসূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে ‘প্রভোস্ট কমিটি’র বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়Ñ প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের হলে সিট দেওয়া হবে না। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটেও এর অনুমোদন মেলে। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা হলে অনাবাসিক কার্ড পান, আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় দ্বৈতাবাসিক কার্ড। যদিও নতুন হল নির্মাণ হওয়ায় এবং ছাত্রী হলগুলোতে বিশেষ বিবেচনায় প্রথম বর্ষেও আবাসিক কার্ড পাওয়ার নজির রয়েছে।
‘গণরুম’ প্রথার উচ্ছেদ এবং আবাসিক হলগুলোতে সব ধরনের দখলদারিত্বের অবসান ঘটিয়ে বৈধ সিট নিশ্চিত করার দাবিতে অনেক দিন ধরে আন্দোলন করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ গতকাল অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ‘বৈধ সিট আমার অধিকার’ ব্যানারে মানববন্ধন করেন একদল শিক্ষার্থী। মানববন্ধনে তারা ৬ দফা দাবি তুলে ধরেন। এগুলো হলোÑ প্রথম বর্ষ থেকেই একজন শিক্ষার্থীকে প্রশাসন কর্তৃক বৈধ সিট দেওয়া; ‘গেস্টরুম’ পোশাকি নামের আড়ালে সব ধরনের ‘টর্চার সেল’ বন্ধ করা; অবৈধভাবে হল দখলকারীদের অনতিবিলম্বে হল থেকে বের করে দেওয়া; ‘রাজনৈতিক’ গণরুম বাতিল করা; হলগুলোতে সিট বরাদ্দে রাজনৈতিক দলের মদদপুষ্ট ছাত্র সংগঠনের হস্তক্ষেপ না থাকা এবং পলিটিক্যাল রুমের নামে রুম দখল বন্ধ করা।
এ ছাড়া গণরুম সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন রকম কর্মসূচি পালন করে আসছেন ডাকসু সদস্য তানভীর হাসান সৈকত। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে নিজের বৈধ সিট ছেড়ে দিয়ে তানভীর গণরুমে থাকছেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর সাময়িকভাবে গণরুম সমস্যা সমাধানে কয়েকটি প্রস্তাবসংবলিত একটি স্মারকলিপিও দিয়েছেন তিনি ঢাবি উপাচার্যের কাছে। গত ১ অক্টোবর গণরুমের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সমাবেশও করেন তিনি। সমাবেশে তিনি হুশিয়ার করেনÑ শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট সমাধান না হলে তিনি সিটবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে উপাচার্যের বাসায় উঠবেন।
প্রথম বর্ষেই হলে আবাসন-সুবিধা পেয়েছেন, ঢাবির প্রতিটি হলের এমন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। প্রত্যেকেই বলেছেন, নাম প্রকাশ করা হলে আবাসনপ্রাপ্তি সম্পর্কে মুখ খোলা যাবে না। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, বৈধভাবে সিট না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে ক্ষমতাসীন দলের ভাতৃপ্রতীম ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে হলে উঠতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হল কর্তৃপক্ষের কোনো সম্পৃক্ততাই ছিল না, তাদের সঙ্গে কোনো কথাই হয়নি। শুধু তা-ই নয়, কে কখন, কীভাবে হলে উঠছেনÑ সে সম্পর্কেও অবগত না কর্তৃপক্ষ। দ্বিতীয় বর্ষে পড়ুয়া জিয়াউর রহমান হলের এক শিক্ষার্থী জানান, হলে উঠতে প্রশাসনের সাহায্য নিয়েছেন; এমন কোনো শিক্ষার্থী আছে বলে তার জানা নেই। বিষয়টি নিয়ে আবাসিক শিক্ষকদেরও মাথাব্যথা নেই। কারণ শিক্ষার্থীদের দেখভালের যে দায়িত্ব তাদের পালন করার কথা; তার কর্তৃত্ব প্রায় পুরোটাই সরকারদলীয় প্রভাবপুষ্ট ছাত্রনেতাদের হাতে।
এ সংকট থেকে উত্তরণে গত ৯ অক্টোবর ঢাবি প্রভোস্ট কমিটি বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হলত্যাগ করতে হবে। এ ছাড়া প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের মেধার ভিত্তিতে শূন্য আসনে সিট বরাদ্দ করা হবে। কোনো শিক্ষার্থী হল প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া হলে উঠতে ও অবস্থান করতে পারবে না। কেউ এর ব্যত্যয় ঘটালে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। হলের যেসব কক্ষে অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী অবস্থান করেন, সেখানে বাংক বেড স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ঢাবি ছাড়াও বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
হলের সিট সংকটের বিষয়ে স্যার এফ রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক কেএম সাইফুল ইসলাম খান বলেন, সিট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ছেলেদের হলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে। এখন এগুলো গুছিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এগুলো কার্যকর হলে সিট সংকট সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

 

 

advertisement