advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অনেকে হাসিঠাট্টা করতো, কেউ কেউ ঢিলও মারত

কুমার বিশ্বজিৎ,সংগীতশিল্পী
১৮ অক্টোবর ২০১৯ ০৮:২০ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০১৯ ১৩:৫৩
ছবি : সংগৃহীত
advertisement

আইয়ুব বাচ্চু, এই মানুষটির সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের পরিচয়। বয়সে বড় হলেও মিউজিকের কারণে আমরা একে-অপরের বন্ধু হয়ে যাই। ১৯৭৭ সাল, তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি। আমরা চট্টগ্রামের জুবিলি রোডে পাশাপাশি বাড়িতে থাকতাম। ৪০ বছর সম্পর্কের জীবনে আমাদের অনেক স্মৃতি জমা আছে। ওকে নিয়ে কথা বলা শুরু করলে শেষ করা যাবে না, আরও ৪০টি বছর কেটে যাবে। চট্টগ্রামের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমাদের স্মৃতি নেই। হাটে, মাঠে, ঘাটে, বিয়েবাড়ি এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমরা বাজাইনি।

ক্লাস টেনে পড়ার সময় বন্ধুরা মিলে ‘রিদম ৭৭’ নামে একটি ব্যান্ড গঠন করি। বাচ্চুও আমাদের ব্যান্ডে বাজাতো। এরপর কলেজে উঠে ‘ফিলিংস’ব্যান্ডেও ওকে আমরা নিয়ে আসি। তখন আমরা ইংরেজি গান বেশি করতাম। ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডের প্রথম শো হয় আগ্রাবাদ হোটেলে। দীর্ঘদিন আমরা এই হোটেলেই বাজিয়েছি। বাচ্চু তখন ওয়েস্টার্ন ঘরানার গিটার বাজাতো। গান আর আড্ডার পার্ট চুটিয়ে আমরা রাত করে ঘরে ফিরতাম। মা রান্না করে আমাদের খাওয়াতেন। মা প্রায়ই বলতেন, আমার দুই ছেলে।

আমাদের আরেক বন্ধু উত্তম। এলাকায় ওর মিষ্টির দোকান আছে। প্রতিদিন আমরা সেখানে আড্ডা দিতাম। উত্তম ‘রিদম ৭৭’ ব্যান্ডের সদস্যও ছিল। ওর মিষ্টির দোকানটি ছিল আমাদের আরেক আড্ডাখানা। সারা দিন যেখানেই থাকি, সন্ধ্যার পর বা রাতে বাসায় ফেরার আগে ওর দোকানে আমাদের যাওয়া হতোই।

আমাদের ওই সময় ব্যান্ডের গান গাওয়া কিংবা ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকা অনেকেই ভালোভাবে নিতো না। তাই চুরি করে আমাদের প্র্যাকটিস করতে হতো। আড্ডায় গান গাইলে অনেকে হাসিঠাট্টা করতো। পাশের বাড়ি থেকে কেউ কেউ তো ঢিলও মারত।

আমরা প্রায়ই ঢাকায় এসে গান গাইতাম। ঢাকায় এলে আমরা একসঙ্গে থাকতাম। শো শেষ করে আবার চট্টগ্রামে ফিরে যেতাম। এভাবে আমরা বহু সময় কাটিয়েছি। ঢাকায় চলে আসার পরও আমরা একসঙ্গে থাকতাম। এক বাসাতেই আমরা তিন-চার বছর কাটিয়েছি। ঘরের মধ্যে দু’জনেই সারাক্ষণ গান-বাজনা নিয়ে পড়ে থাকতাম। এরপর সন্ধ্যায় ঘুরতে বের হতাম। বাচ্চু নতুন ব্যান্ড করার পর একদিন বলল, আলাদা বাসা নেবে। আমি ওকে বললাম, ‘কেন তুই দূরে যাবি। এখানে থাকতে তোর কি অসুবিধা?’

উত্তরে বাচ্চু বলল, ‘নতুন ব্যান্ড করেছি, অনেক লোকজন আসবে। তোর অসুবিধা হবে। তাছাড়া একটু প্রাইভেসি দরকার আছে।’ আমি ওর কথা মেনে নিয়ে বললাম, ‘তাহলে আমার পাশের বাসাটা নে।’ বাচ্চু তাই করলো। আমার বাসার একদম পাশের বাসাটা ও ভাড়া নিলো। ওর ঘরের জানালা আর আমার ঘরের জানালার পাশাপাশি। ওর বিয়ের বাজার-সদাই থেকে শুরু করে বিয়ের আয়োজনের সব কাজ আমিই করেছি।

কখনও ভাবিনি এভাবে কাঁদিয়ে বাচ্চু চলে যাবে। ওর মৃত্যুর কিছুদিন আগেও একটি অনুষ্ঠানে আমাদের দেখা হয়েছিল। তখন আমরা অনেক হাসিঠাট্টা করেছি। হাস্যোজ্জ্বল এই মানুষটি এত অল্প সময়ে চলে যাবে, তা মেনে নিতে এখনও আমার খুব কষ্ট হয়।

advertisement