advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংরক্ষণ

ড. এমাজউদ্দীন আহমদ
১৯ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০১৯ ০১:২৭
ছবি : সংগৃহীত
advertisement

কোনো জনসমাজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা যেমন কঠিন কাজ, তার চেয়ে বেশি কঠিন কাজ হলো গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করা। এজন্য কীভাবে গণতন্ত্র পর্যুদস্ত হয় তা জানা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। দুদিকে মনোযোগ দিয়েই গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করা সম্ভব। একটি থেকে সাবধান থাকতে হবে। অন্যটি অত্যন্ত সাবধানে অনুশীলন করতে হবে। সাবধান হলে গণতান্ত্রিক ভুবন সংরক্ষিত হবে। সাবধানে গণতান্ত্রিক নর্মের অনুশীলন অব্যাহত রাখলে গণতন্ত্র প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরে উঠবে। অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে সমাজ।

বিশ্বে গণতন্ত্রের বয়সও তেমন বেশি নয়। গণতান্ত্রিক বিশ্বের আয়তন কিন্তু বৃহত্তম। বিশ্বের চার-পঞ্চমাংশ জনসমষ্টির বসবাস গণতান্ত্রিক বিশ্বেই। ইতিহাসের এইক্ষণে গণতন্ত্রের বিজয় সর্বগ্রাসী। গণতন্ত্রের তরঙ্গ আজ উত্তাল, বিশ্বের সর্বত্রই। অতীতে এমনটি আর কখনো দেখা যায়নি। বাংলাদেশেও অনেক ত্যাগের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে বিধ্বস্ত হয় স্বৈরাচারের দুর্গ, উন্মুক্ত হয় গণতন্ত্রের সিংহদ্বার। একানব্বইয়ে যা অর্জিত হয়েছে তা অকিঞ্চিৎকর নয়, সংগঠিত হয় জনপ্রতিনিধিত্বমূলক পঞ্চম সংসদ। পঞ্চম সংসদে গৃহীত হয়েছে দ্বাদশ সংশোধন আইন। পুনঃপ্রবর্তিত হয় বাংলাদেশের জন্য সংসদীয় ব্যবস্থা। সাংবিধানিক গণভোটে তা অনুমোদিত হয়। দীর্ঘ যোলো বছর পর বাংলাদেশে এসেছে আবারও সংসদীয় গণতন্ত্র।

গণতন্ত্রের পথ বড় বন্ধুর। বাংলাদেশে প্রায় দুর্গম। এ জনপদের জনসমষ্টি কিন্তু গণতান্ত্রিক আদর্শে বরাবর সচকিত। গণতন্ত্রের আন্দোলনে তারাই অগ্রপথিক। মিছিলের সর্বাগ্রে তারাই। গণতন্ত্রের জন্য তারা লড়েছেন। রক্ত দিয়েছেন। কোনো কোনো সময় গণতন্ত্রের খুব কাছাকাছি এসেও গেছে এই জাতি, কিন্তু ধরে রাখতে পারেনি। এ জনপদের দুর্ভাগ্য, গণতন্ত্র বিনষ্ট হয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বরং নেতৃত্বের ব্যর্থতায়। নেতৃত্বের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং অনিয়মের দেয়ালে বারবার ধাক্কা খেয়েছে গণতন্ত্রের প্রবাহ।

বাংলাদেশের ৪৮ বছর পূর্ণ হলো। সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ হলো অগণতন্ত্রেরও তেরো বছর। আজকে যা অর্জিত হয়েছে তাকে সংরক্ষণের জন্য তাই প্রয়োজন সবদিকে দৃষ্টি দেওয়া। চোখ খুলে রেখে এ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করা। এজন্য আগেই বলেছি, প্রথমে দেখতে হবে কীভাবে গণতন্ত্র পর্যুদস্ত হয়।

এদিকে দৃষ্টি দিলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, গত শতকের চতুর্থ দশক থেকে সপ্তম দশক পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিধ্বস্ত হয়েছে চারটি সুনির্দিষ্ট পন্থায় : অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে, গৃহযুদ্ধের ফলে, নির্বাহী কর্তৃপক্ষের অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপে এবং সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলে।

অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে বিধ্বস্ত হয়েছে জার্মান গণতন্ত্র। ১৯১৯-১৯৩২ পর্যন্ত সংসদীয় ব্যবস্থা চালু ছিল ওয়েমার জার্মানিতে। চালু ছিল দায়িত্বশীল গণতন্ত্র। নির্বাচন হয়েছে নিয়মিত। প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে ছিল রাজনৈতিক সমাজ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর হাজারো সমস্যায় ক্লিষ্ট, বিশেষ করে দারিদ্র্য এবং বেকারত্বের প্রচ- চাপে সরকার হারায় জনপ্রিয়তা, হারায় চলৎশক্তি। জার্মানিতে গড়ে ওঠে সুস্পষ্টভাবে গণতন্ত্রবিরোধী রাজনৈতিক দল, নাৎসি পার্টি। ১৯৩৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে নাৎসি পার্টির কটি সেøাগান ছিল : ‘ব্যর্থ গণতন্ত্র নিপাত যাক’, ‘গণতন্ত্রের মূলোৎপাটন চাই।’ নির্বাচন হলো। নির্বাচনে বিজয়ী হলো নাৎসি পার্টি, বিপুল ভোটাধিক্যে। তার পর যা হওয়ার তাই হয়েছিল। পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নাৎসি পার্টি জার্মানি থেকে গণতন্ত্রকে বিদায় করে, এডলফ হিটলারের নেতৃত্বে। ১৯৪৯ সালের আগে জার্মানিতে গণতন্ত্রের প্রবেশ আর ঘটেনি।

গৃহযুদ্ধের ফলে গণতন্ত্র নিঃশেষ হয়েছে লেবাননে। খ্রিস্টান ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপকভিত্তিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে লেবাননে কার্যকর হয় ঐকমত্যভিত্তিক গণতন্ত্র (ঈড়হংড়পরধঃরড়হধষ ফবসড়পৎধপু)। ইসরায়েলি হামলা, ফলে সিরিয়ার হস্তক্ষেপ, দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ব্যাপক সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে গৃহযুদ্ধের কালোছায়া বিস্তৃত হয় সমাজব্যাপী। নিঃশেষ হয় প্রাণবন্ত লেবাননি গণতন্ত্র ১৯৭৫ সালে। শ্রীলংকায় সব সময় গণতন্ত্রের বাতি প্রজ্বলিত। কিন্তু তামিল এবং সিংহলিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, প্রতিবেশী ভারতের অসহযোগিতা আরও বৃদ্ধি পেতে থাকলে কে জানে শ্রীলংকার গণতন্ত্র আজ যেমন প্রাণবন্ত তা নাও থাকতে পারে।

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করতে পারেন। তারা তার ধ্বংস সাধনেও সক্ষম। নির্বাহী কর্তৃত্বের হঠকারিতায়, তাদের অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপে, বিভিন্ন স্থানে গণতন্ত্র ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। রাষ্ট্রপতিক এবং সংসদীয় উভয় সরকারই এ দোষে দুষ্ট। কালের পরিপ্রেক্ষিতে অবশ্য সংসদীয় সরকারপ্রধানদের ভূমিকাই অধিক হতাশাব্যঞ্জক। নির্বাহী কর্তৃত্বের ‘জবরদখলের’ মাধ্যমে বহু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিধ্বস্ত হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক শক্তিকে শায়েস্তা করার লক্ষ্যে অস্ট্রিয়ার প্রথম প্রজাতন্ত্রে নির্বাচিত হয় খ্রিস্টান সামাজিক সরকার (ঈযৎরংঃরধহ উবসড়পৎধঃরপ এড়াঃ.)। ১৯৩৪ সালে গণতন্ত্রের পথ পরিহার করে অস্ট্রিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত ওই দেশে গণতন্ত্র আর ফেরেনি।

এস্তোনিয়ার দৃষ্টান্ত প্রায় একইরকম। ভার্সাই চুক্তির পর এস্তোনিয়া লাভ করে জাতিরাষ্ট্রের মর্যাদা। প্রতিষ্ঠিত হয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। দেশের একটি অগণতান্ত্রিক সংগঠন, প্রবীণদের সংগঠনকে, নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য এস্তোনিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান ১৯৩৪ সালে নিজেই গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেন। জারি করেন দেশে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। দেশ থেকে নির্বাসন দেওয়া হয় গণতন্ত্রকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এস্তোনিয়াকে অবশ্য গ্রাস করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত বিপর্যয়ের পর এস্তোনিয়া আবার লাভ করেছে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। গণতন্ত্র অবশ্য এখনো পুরোপুরি সেখানে পুনর্বাসিত হয়নি।

নির্বাহী কর্তৃত্বের হঠকারিতায় শ্রীলংকা এবং ভারতেও গণতন্ত্র হয় পর্যুদস্ত। ১৯৭১ সালে গেরিলাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে সন্ত্রস্ত হয়ে শ্রীলংকার সংসদীয় সরকারের প্রধান শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে দেশে জারি করেন জরুরি অবস্থা। বিরোধীদলীয় নেতারা হন বন্দি। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হয় সংকুচিত। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হয় ক্ষুণœ। শ্রীলংকায় এ অবস্থা অব্যাহত থাকে ১৯৭৬ পর্যন্ত। এদিকে প্রতিপক্ষের হাতে পরাজয় এড়ানোর জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালে দেশে জারি করেন জরুরি অবস্থা। বিরোধী দলের নেতারা নির্যাতনের শিকার হন। গণতন্ত্র হয় ব্যাহত। সংবাদপত্রের ওপর আরোপিত হয় কঠোর নিয়ন্ত্রণ। বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে যেসব প্রাদেশিক সরকার ছিল তার অধিকাংশ আসে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে। নির্বাচন হয় স্থগিত। খর্ব করা হয় জনগণের মৌলিক অধিকার। এ অবস্থা চালু থাকে ২০ মাসব্যাপী। জরুরি অবস্থার যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানো হয় বিদেশি ‘চক্রান্তের’ অভিযোগ। জ্যামাইকার সংসদীয় সরকারপ্রধান, পিএনপি নেতা, একই প্রক্রিয়ায় দেশে জরুরি আইন জারির মাধ্যমে, দেশে গণতন্ত্রের প্রবাহকে স্তব্ধ করেন ১৯৭৬ সালে। নির্বাচিত সরকারপ্রধান হয়েও বিরোধী দলকে কোণঠাসা করার লক্ষ্যে তিনি এ প্রক্রিয়া অবলম্বন করেন।

শুধু সংসদীয় সরকারপ্রধান কেন, প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকারেও ঘটেছে এমনি ঘটনা। ১৯৭২ সালে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ফার্ডিন্যান্ড মার্কোস দেশে বিপ্লবী কর্মতৎপরতা বন্ধের নামে সমগ্র ফিলিপিনসে জারি করেন সামরিক শাসন। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি জাতীয় কংগ্রেস এবং মন্ত্রিপরিষদ বাতিল করেন। জনগণের মাধ্যমে তিনি জাতীয় কংগ্রেস এবং মন্ত্রিপরিষদ বাতিল করেন। জনগণের মৌলিক অধিকার খর্ব করেন। গণতন্ত্রের অবাধ চর্চা হয় নিষিদ্ধ। দীর্ঘদিন পর কোরাজন অ্যাকুইনোর হাতে ফিলিপিনসে গণতন্ত্র নতুনভাবে প্রাণ পায়।

এই অঞ্চলের দিকে তাকালেও চোখে পড়ে একই ছবি। ১৯৫৬ সালের পাকিস্তান সংবিধান ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের। সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ইস্কান্দার মির্জা। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর তিনি জারি করেন দেশে সামরিক আইন। লক্ষ্য, ১৯৫৯ সালে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সম্ভাব্য বিজয়কে প্রতিহত করা। স্বাধীন বাংলাদেশেও রাজনৈতিক অভিযাত্রা শুরু হয় সংসদীয় ব্যবস্থা নিয়ে। ১৯৭২ সালে রচিত হয় সংসদীয় গণতন্ত্রের সংবিধান। সংবিধান প্রণয়নের ছয় মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচিত সরকার অধিষ্ঠিত হওয়ার বছরখানেকের মধ্যে প্রণীত হয় সর্বমহলে ধিকৃত জরুরি বিধান। মাত্র দুবছরের মাথায় শুধু আধা ঘণ্টার সংসদ অধিবেশনে সংসদীয় ব্যবস্থা পরিবর্তন করে বাংলাদেশে চালু করা হয় একদলীয় ব্যবস্থার। জাতীয় দল ছাড়া অন্য দল বাতিল ঘোষিত হয়। বিচার বিভাগ হয় নিয়ন্ত্রিত। সংবাদপত্রের কণ্ঠ হয় রুদ্ধ। জনগণের মৌলিক অধিকার হয় খর্ব। অজুহাত ছিল- ‘বিদেশি চক্রান্ত রোধ’ এবং দেশের বামশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ। সবকিছু ঢাকা পড়ে ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’ গাঢ় ছায়ায়।

দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান অথবা সরকারপ্রধান সংবিধানবিরোধী পন্থায় গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেদের পরাজয় এড়ানোর জন্য, কোথাও বা বিরোধী দলকে পর্যুদস্ত করার জন্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য তারা এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। সর্বক্ষেত্রে গণতন্ত্রই হয়েছে পরাজিত।

সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের মাধ্যমেও বিধ্বস্ত হয়েছে বহুসংখ্যক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে বিশ্বের প্রায় সর্বত্র। তবে চারটি অঞ্চলে এর প্রকোপ হয়েছে ভয়ঙ্কর। ১৯৪৫ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত সংঘটিত সফল অভ্যুত্থানের সংখ্যা ৩১৬। ব্যর্থ অভ্যুত্থান এবং অভ্যুত্থান-প্রচেষ্টার সংখ্যা যোগ করলে মোট সংখ্যা হয় ৬১৫। এসব অভ্যুত্থানের ২০৩টি ঘটেছে আফ্রিকায়, ২০৭টি লাতিন আমেরিকায়, ১১৩টি এশিয়ায় এবং ৭৩টি ঘটেছে মধ্যপ্রাচ্যে। ইউরোপও এর হাত থেকে রেহাই পায়নি।

কেউ কেউ বলেছেন, সামরিক অভ্যুত্থান সব সময় গণতন্ত্রের পরিপন্থী নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামরিক অভ্যুত্থান গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করতে পারে। ১৯৫২ সালে ইজিপ্টে, ১৯৬০ সালে ইথিওপিয়ায়, ১৯৬৯ সালে লিবিয়ায়, ১৯৭৩ সালে আফগানিস্তানে সংঘটিত অভ্যুত্থান সনাতন রাজতন্ত্র উচ্ছেদে সহায়তা করেছে। ১৯৬২-৬৪ সালের মধ্যে আফ্রিকার মালি, সেনেগাল, আইভরিকোস্ট, কঙ্গো, ব্রাজাভিল, ডাহোমি, নাইজার এবং গ্যাবনের মতো দেশে একদলীয় ব্যবস্থা উচ্ছেদ করেও সামরিক বাহিনী ক্ষেত্র তৈরি করেছে গণতন্ত্রের। তেমনি ১৯৫৩ সালে ডোমিনিকায়, ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায়, ১৯৫৫-তে আর্জেন্টিনায়, ১৯৫৬-তে উরুগুয়েতে যে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে তার ফলে দেশে বিপ্লবীদের কার্যক্রম স্তিমিত হয়। অনেকের মতে, এসব অভ্যুত্থান গণতন্ত্রের পথ সুগম করেছে। দীর্ঘকালীন পরিসরে কিন্তু সামরিক অভ্যুত্থান কোনো সময় শুভ ফল আনয়ন করে না। সামরিক শাসন কোনো সমাজের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বিকৃত করে। দলীয় ব্যবস্থা বিধ্বস্ত করে। দলীয় সংহতি বিনষ্ট করে। সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত হলে জাতীয় সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ অনুৎপাদনশীলতার পরিবর্তে দেশে শৃঙ্খলার প্রতি কৃত্রিম শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়। এসব কিছুই জাতীয় জীবনে অভিশাপ ডেকে আনে। এখনো পর্যন্ত ইজিপ্ট, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ইথিওপিয়ায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ শক্তিশালী হয়নি। আফ্রিকায় গণতন্ত্রের শেকড় এখনো সমাজজীবনের গভীরে প্রবেশ করেনি।

সামরিক অভ্যুত্থান, তা ছাড়া কয়েকটি দেশে গণতন্ত্রের উজ্জ্বল সম্ভাবনাও বিনষ্ট করেছে। ১৯৫৮ এবং ১৯৭৭ সালে পাকিস্তানে, ১৯৬২-তে বার্মায়, ১৯৬৫ সালে উরুগুয়েতে, ১৯৭৩ সালে চিলিতে, ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলে, ১৯৬৬ সালে ভেনিজুয়েলায়, ১৯৬০ সালে তুরস্কে, ১৯৭১ সালে গ্রিসে, ১৯৮২ সালে বাংলাদেশে, ১৯৭২ সালে ফিলিপিনসে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল তা সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে ক্ষতবিক্ষত হয়। পর্যুদস্ত হয়। আগেই বলা হয়েছে, অগণতান্ত্রিক কোনো দল অথবা যেসব দল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত নয়, গণতান্ত্রিক নীতি যে দলের প্রাণশক্তি নয় সেই দল বা দলগুলোর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংরক্ষিত হতে পারে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংরক্ষিত হতে পারে না একদলীয় লেভায়খান কর্তৃকও। উদারনৈতিক গণতন্ত্র বহু মতের, বহু দলের সম্পদ। কোনো সাম্প্রদায়িক দলও (যে দলের সদস্যরা সবাই একটি সম্প্রদায়ের) গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারে না। তা ছাড়া যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ এবং ভারসাম্য (ঈযবপশ ধহফ ইধষধহপব) ছাড়া রাষ্ট্রের নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রয়োগের নীতি গৃহীত হয়েছে, সেখানেও গণতন্ত্র সংরক্ষিত নাও হতে পারে। সামরিক বাহিনীর কথা বলছেন? শাসন বা তোষণের মাধ্যমে নয়, বরং প্রশিক্ষণের মতো পরিপোষণের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে পেশাদারিত্বে সমৃদ্ধ করাই উত্তম পন্থা। এই পেশাদারিত্বের মূলমন্ত্র হতে হবেÑ সামরিক বাহিনীর শক্তিমত্তার চেয়ে জনগণের ম্যান্ডেটই সেরা [“ঞযব পড়ৎব ড়ভ সরষরঃধৎু ঢ়ৎড়ভবংংরড়হধষরংস ংযড়ঁষফ নব ঃযব নবষরবভ ঃযধঃ ঃযব সধহফধঃব ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব রং ংঁঢ়বৎরড়ৎ ঃড় ভরৎব ঢ়ড়বিৎ ধহফ ঃযব সরষরঃধৎু ৎঁষব রং ধহ ধনবৎৎধঃরড়হ, হড়ঃ ধহ ধষঃবৎহধঃরাব ঃড় ফবসড়পৎধঃরপ ড়ৎফবৎ.’]

কীভাবে গণতন্ত্র বিধ্বস্ত হয়েছে তা অনুধাবন করলে গণতন্ত্রের শত্রু সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা সম্ভব। কিন্তু গণতন্ত্রের শ্রীবৃদ্ধির জন্য তাই যথেষ্ট নয়। এজন্য প্রয়োজন ইতিবাচক পদক্ষেপ। প্রয়োজন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করেই গণতন্ত্রের সৌধ সমুন্নত থাকে। ব্যক্তি পর্যায়ে, সামাজিক পর্যায়ে, রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্রের ব্যাপক চর্চা অব্যাহত থাকলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রাণবন্ত হয়। রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করতে হলে সমাজে গণতন্ত্রের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক ধরনের সাম্যের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যেন সীমাহীন বৈষম্যের মরুভূমিতে সমাজের সহনশীল পরিবেশ বিঘিœত না হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংরক্ষণের জন্য সমাজে গড়ে তুলতে হবে গণতান্ত্রিক মন। এজন্য গণতান্ত্রিক কাঠামো যথেষ্ট নয়। কাঠামোর অভ্যন্তরে স্পন্দিত হতে হবে গণতান্ত্রিক অন্তঃকরণ। এ সম্পর্কে রাজনীতিকদের সম্পূর্ণরূপে সচেতন থাকতে হবে।

 

ড. এমাজউদ্দীন আহমদ : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement