advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চাটার দল, শুদ্ধি অভিযান ও সমাজ বিপ্লব

২১ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০১৯ ০৮:৫০
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। ছবি : সংগৃহীত
advertisement

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু বলতেন-‘যেদিকে তাকাই, সেদিকেই দেখি শুধু চাটার দল’। অনেক দুঃখ, অভিমান ও ক্ষোভে তিনি এ কথা বলতেন। তার এ কথা বহুলাংশে সত্য হলেও এতে যে কিছুটা ‘ভাবাবেগ প্রসূত অতিরঞ্জন’ মিশ্রিত ছিল, তা অসত্য নয়। বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর এ অর্ধসত্য কথাটিই যেন বাস্তবে পূর্ণসত্য হতে চলেছে।

দেশবাসী অসহায়ের মতো দেখে চলেছে যে, ঘুষ-দুর্নীতি-অনাচার এখন সমাজ-দেহের সর্বত্র ক্যানসারের কোষের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। শরীরের সব রক্তপ্রবাহে এখন এক ভয়াবহ দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে। এ থেকে পরিত্রাণের কোনো দিশা মানুষ দেখতে পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন, ঘুষ-দুর্নীতি-অনাচারের বিস্তার এখন তেজস্ক্রিয় (জধফরড়ধপঃরাব) পদার্থের মধ্যে ‘অনিবারণীয় অব্যাহত প্রক্রিয়া’ (ঝহংঃড়ঢ়ঢ়ধনষব পযধরহ ৎবধপঃরড়হ) শুরু হওয়ার মতো মাত্রায় পৌঁছে গেছে।

সরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরু করেছে। ক্ষমতাধর কয়েক হোমরা-চোমরাকে গ্রেফতার করেছে। কিছু রুই-কাতলা পাকড়াও হওয়ায় ‘কার গায়ে কখন হাত পড়ে’ আশঙ্কায় ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজ-দুষ্কৃতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু দুর্নীতিবাজ-দুষ্কৃতকারীদের মধ্যে যারা রুই-কাতলা বলে সমাজে পরিচিত ও চিহ্নিত, তাদের সিংহভাগের গায়ে এখনো টোকাটি পর্যন্ত পড়েনি।

তা ছাড়া ‘রুই-কাতলা’র চেয়েও বড় যেসব চিহ্নিত ‘হাঙর-কুমির’ রয়েছে এবং যাদের নাম সবার জানা আছে, তারা শুধু বহালতবিয়তে বিচরণই করছে না, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ঘুষ-দুর্নীতি-দুরাচারের বিরুদ্ধে গলা ফাটিয়ে বক্তব্যও রেখে চলেছেন।

ঘুষ-দুর্নীতি এখন প্রায় সর্বজনীন হয়ে উঠেছে বলে দেখা গেলেও এর দুটি পৃথক প্রকার এবং দুটি ভিন্ন উৎস ও কারণ কাজ করে থাকে। একটি অংশের মানুষ ঘুষ-দুর্নীতিতে লিপ্ত হয় প্রধানত আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক দানবীয় লালসা থেকে। তারা ‘নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদ’-এর ফর্মুলা অনুসারে ‘সম্পদের কেন্দ্রীভবন’-এর মহান দায়িত্বে নিয়োজিত বলে নিজেদের জাহির করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি-দুরাচারের মাধ্যমে লুটপাটের ‘ফ্রি লাইসেন্স’ ভোগ করতে সক্ষম হচ্ছে। বৈষম্যের মাত্রা লজ্জাজনক ও বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি করে চললেও তারা ‘ঘুষ-দুর্নীতি-দুরাচার’কে নিছক ‘উন্নয়নের প্রসববেদনা’ হিসেবে মেনে নেয়ার তত্ত্বটি সমাজের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।

‘ওপর মহল’-এর এই ঘুষ-দুর্নীতি-দুরাচারের একটি ‘প্রদর্শনগত প্রভাব’ (Demonstrative effect) পুরো সমাজের ওপর যে এসে পড়বে, তা স্বাভাবিক। ওই হিসেবে সাধারণ মানুষও এর দ্বারা প্রভাবিত হয়। তা ছাড়া বৈষম্যজনিত আপেক্ষিক অভাব থেকে বাঁচার জন্য সহজ সমাধান হিসেবে সাধারণ মানুষও খুদে পরিমাণে (petty) ঘুষ-দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছে। জনসাধারণের এসব petty ঘুষ-দুর্নীতি তাদের পরস্পরের মধ্যে লেনদেনের বিষয় হয়ে থাকায় তা সম্পদের বণ্টন ও বিন্যাসের ক্ষেত্রে কোনো হেরফের ঘটায় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তা এ কারণে যে, এর ফলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রে সেটি জনগণের নৈতিক মনোবলকে দুর্বল করে দেয়। এসব কারণে ঘুষ-দুর্নীতি আজ যেভাবে সব রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে গ্রাস করে ফেলছে-তা যে শুধু বর্তমান ‘শুদ্ধি অভিযান’-এর দ্বারাই উপড়ে ফেলা কতটা সম্ভব হবে, এ প্রশ্ন মানুষের মনে রয়েছে।

দুর্নীতিবাজদের, বিশেষ করে তাদের মধ্যকার ‘রুই-কাতলা’দের সাজা দেওয়া একান্তভাবে প্রয়োজন। কিন্তু সেটিই দুর্নীতি উৎপাটনের জন্য যথেষ্ট নয়। ফুটো কলসিতে যতই পানি ঢালা হোক না কেন, কলসি এতে কখনই ভরবে না। বর্তমান অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থাই যদি বহাল থাকে-যেখানে প্রতিনিয়ত দুর্নীতিবাজ পুনরুৎপাদিত হচ্ছে, তা হলে মাঝে মধ্যে কয়েক ডজন অথবা কয়েকশ দুর্নীতিবাজকে আটক করেও সমাজ দুর্নীতিমুক্ত করা যাবে না।

আমাদের দেশে বর্তমানে ঘুষ-দুর্নীতি-দুরাচার যে ভয়াবহ প্রসারতা ও মাত্রা অর্জন করেছে, তা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে এর পেছনে আসল সামাজিক-অর্থনৈতিক উৎসটি কী-এ কথা বুঝতে পারাটা একান্ত আবশ্যক। ঘুষ-দুর্নীতি-দুরাচারের বর্তমান ভয়াবহতা বহুলাংশে এবং প্রধানত দেশের প্রচলিত আর্থসামাজিক ব্যবস্থার একটি অভিপ্রকাশ মাত্র। যদি তা-ই হয়, তা হলে এ অবস্থা থেকে মুক্ত হতে হলে শুধু অভিপ্রকাশটিকে (অর্থাৎ শুধু ঘুষ-দুর্নীতির বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলি) আঘাত করলেই চলবে না কিংবা শুধু অভিপ্রকাশের উৎস (শুধু প্রচলিত আর্থসামাজিক ব্যবস্থা) আক্রমণ করার কাজে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আসলে একক ও আলাদাভাবে-এ দুটির কোনো একটি কাজের মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে সফল হওয়া যাবে না। সফলতা আনতে হলে দুটি কাজকে একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। রোগের বিভিন্ন অভিপ্রকাশ দৃঢ়ভাবে দমন করার পাশাপাশি রোগের মূল আর্থসামাজিক উৎসকেও আঘাত করতে হবে এবং ওই উৎস উৎপাটন করে এমন একটি বিকল্প আর্থসামাজিক ভিত্তি সৃষ্টি করতে হবে-যেটি সহজাতভাবে ঘুষ-দুর্নীতি-দুরাচারের লালনকারী হবে না।

ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ে বহু যুগ ধরে এ দেশে বহু কথাবার্তা হচ্ছে। এই ইস্যু নিয়ে তীব্র প্রচারণা হচ্ছে। কার আমলে ঘুষ-দুর্নীতি বেশি ছিল না বা কম ছিল, তা নিয়ে তুমুল বিতর্কের ঝড় ওঠানো হচ্ছে। দুর্নীতির অভিযোগকে ক্ষমতা পরিবর্তনের ইস্যু বানানো হচ্ছে। পূর্বতন ‘দুর্নীতিবাজ’ সরকারের পতন ঘটানো হচ্ছে। নতুন ‘দুর্নীতিবাজ’ সরকার উচ্ছেদের আহ্বান জানানো হচ্ছে। এসব দ্বারা দুর্নীতির ভয়াবহতা বিন্দুমাত্র দূর হচ্ছে না। সরকার যায় আসে। কিন্তু ঘুষ-দুর্নীতি দূর হয় না, বরং তা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। এর কারণ কী? এর কারণ অতি স্পষ্ট। সব সরকারই প্রচলিত আর্থসামাজিক ব্যবস্থার ওপর তাদের ক্ষমতার ভিত্তি রচনা করে দেশ শাসন করেছে ও করছে।

ঘুষ-দুর্নীতির উৎস শেষ বিচারে কেবল কয়েক ‘দুষ্ট ব্যক্তি’ অথবা কোনো একটি নির্দিষ্ট দল বা এর নিয়ন্ত্রিত সরকার নয়। যে আর্থসামাজিক ভিত্তির ওপর দল ও সরকার প্রতিষ্ঠিত, সেটিই ঘুষ-দুর্নীতি-দুরাচারের মূল উৎস। সব সরকারই প্রচলিত আর্থসামাজিক ব্যবস্থার হাতে জিম্মি। কারণ তারা এর কাছে আত্মসমর্পণ করে ক্ষমতায় থেকেছে ও থাকছে। তাই সব সরকারের আমলেই রুগ্ণ সমাজব্যবস্থার অভিপ্রকাশ হিসেবে ঘুষ-দুর্নীতি-অনাচারের দাপট চলেছে এবং চলছে।

আমাদের দেশ সা¤্রাজ্যবাদ ও বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তারা অর্থনৈতিক-সামাজিক যে দর্শন এবং চলার পথ নির্দেশ করে চলেছে, সেটিই জন্ম দিয়েছে লুটেরা ও পরগাছাপরায়ণ লুটপাটের অর্থনীতি। এই নীতি-দর্শন অনুযায়ী দেশের অগ্রগতির (!) জন্য ব্যক্তিমালিকানায় বিপুল সম্পদ ‘সঞ্চয়’ করা জরুরি কাজ। ব্যক্তিমালিকানায় বিপুল সম্পদ হাত করা সম্ভব হতে পারে কীভাবে? স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য দিয়ে (মুনাফার হার যদি ২৫ শতাংশ ধরি) একজন কোটিপতিকে শতকোটি টাকার মালিক হতে হলে ২৫-৩০ বছর লাগবে। অথচ সে চায় যে, তাকে তা হতে হবে ২-১ বছরেই। এ জন্য পথ রয়েছে একটিই। তাকে অস্বাভাবিক পরিমাণ ও মাত্রায় এবং আইনের পথের বাইরে গিয়ে সম্পদ হাত করতে হবে। এ জন্য তাকে অবাধ লুটপাটের আয়োজন নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে রাতারাতি হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়া যাবে না। এভাবেই এ দেশে গড়ে উঠেছে একশ্রেণির লুটেরা বিত্তবান। তারাই এখন হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক। তাদের লুটপাট নিরাপদ রাখার জন্যই তারা আমলাতন্ত্র, রাজনীতিবিদ, মাস্তান বাহিনী প্রভৃতিকে লুটপাটের ভাগিদার বানিয়ে দেশকে (সরকার, বিরোধী দল, রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি-সব কিছু) নিয়ন্ত্রণ করছে।

দেশ আজ এক অশুভ ‘মাফিয়া সিন্ডিকেট’-এর হাতে বন্দি। সমাজ দর্শন ও সমাজ কাঠামোয় ওই লুটপাটের ব্যবস্থা ও ধারা অব্যাহত থাকার কারণেই ‘সরকার আসে যায়। কিন্তু ঘুষ-দুর্নীতি চলছে তো চলছেই’। ব্যক্তিমালিকানায় বিপুল পরিমাণ সম্পদের কেন্দ্রীভবন যে পরিমাণে ঘটছে, এর খুব অল্প অংশই উৎপাদনমুখী উদ্যোগে রূপান্তরিত হচ্ছে। সম্পদের বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে অথবা বিলাসবহুল ভোগে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। ফ্রি স্টাইল লুটপাটের কারণে ন্যূনতম অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাও এ দেশে সম্ভব হচ্ছে না। ফটকাবাজি-চোরাচালান-মজুদদারি-এগুলোয় টাকা ‘আসে’ রাতারাতি। শিল্প বিনিয়োগে খাটুনি বেশি, মুনাফা জমা হওয়ার প্রক্রিয়াও দীর্ঘমেয়াদি। তা ছাড়া ‘অবাধ বাণিজ্য’নীতি দেশকে বিদেশি পণ্যের নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে পরিণত করেছে। ফলে অর্থনীতির নিয়ম অনুসারেই দেশের নবীন শিল্প উদ্যোগ ‘অবাধ প্রতিযোগিতা’র গলাকাটা প্রক্রিয়ায় উন্নত বিদেশি কোম্পানির কাছে পরাজিত হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে। শিল্প পুঁজির তুলনায় ব্যবসায়ী পুঁজির (যা মূলত বিদেশি কোম্পানির স্থানীয় এজেন্টের কাজ করে চলেছে) আধিপত্যের কারণে অর্থনীতিতে উৎপাদনবিমুখ, পরগাছাপরায়ণ ও লুটেরাপ্রবণতা বজায় থাকছে। এগুলোই হলো এ দেশের ঘুষ-দুর্নীতির ভয়াবহতার উৎস সূত্র।

এসব থেকে এ কথা স্পষ্টই বোঝা যায়, ‘ঘুষ-দুর্নীতি হলো উন্নয়নবিরোধীধারার জন্মদাতা।’ এই বক্তব্য যেমন সত্য, এর চেয়ে বড় সত্য হলো-‘উন্নয়নবিরোধী প্রচলিত আর্থসামাজিক ব্যবস্থা হলো ঘুষ-দুর্নীতির উৎস ও জন্মদাতা’। অর্থাৎ দেশের উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা হলো ঘুষ-দুর্নীতি-অনাচারের পাশাপাশি প্রচলিত ‘সাম্রাজ্যবাদ-বিশ্বব্যাংকনির্ভর লুটেরা ধনবাদী’ আর্থসামাজিক ব্যবস্থা। গণমুখী প্রকৃত উন্নয়ন সাধন করতে হলে অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিকল্প পথ গ্রহণ করতে হবে। গ্রহণ করতে হবে সমাজতন্ত্র অভিমুখীন সেই পথ-যে পথ আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রচনা করেছিলাম।

তা হলে এখন মূল কথায় এসে বলা যায়-বর্তমানে যে সমাজ দর্শন ও অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিকধারায় দেশ চলছে, ঘুষ-দুর্নীতির ভয়াবহতার অবসানের জন্য ওই ব্যবস্থার আমূল উচ্ছেদ একান্ত অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত আইন-কানুন প্রণয়ন, আরও কঠোরভাবে ঘুষ-দুর্নীতি মোকাবিলা করা ইত্যাদি যেমন প্রয়োজন, তেমনি এর পাশাপাশি বেশি করে যা প্রয়োজন-তা হলো ঘুষ-দুর্নীতির লালনকারী বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন। এ ক্ষেত্রে ঘুষ-দুর্নীতির জন্য কে বেশি দায়ী, রাজনীতিবিদ, না আমলাতন্ত্র; বিএনপির শাসন আমল, না আওয়ামী লীগ শাসন আমল, না জাতীয় পার্টির শাসন আমল-এসব বিতর্ক অপ্রধান।

আমার মতে, কে দুর্নীতি বেশি করেছে আর কে কিছু কম করেছে-এ নিয়ে বিতর্ককে প্রধান করে তোলাটা ঘুষ-দুর্নীতির আসল উৎস অপসারণ করার জন্য মৌলিক সংগ্রামটিকে পথভ্রান্ত করার একটি কৌশলী প্রয়াস মাত্র। ঘুষ-দুর্নীতি-দুরাচার থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে আসল জায়গায় আঘাত করতে হবে। যে ‘মাফিয়া সিন্ডিকেট’ সর্বগ্রাসী, সর্বব্যাপী এক মহাশক্তিরূপে সব সরকারের আমলেই ক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক হয়ে বসে আছে, এর বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রামের নবধারা বেগবান করতে হবে। এই অপশক্তিকে নির্মূল করতে হবে। তা হলেই পরিত্রাণ সম্ভব।

এ এক খুব কঠিন লড়াই। দেশের মেহনতি শ্রমজীবী জনগণকেই এ লড়াইয়ের অগ্রভাগে এসে দাঁড়াতে হবে। সমাজের অন্যান্য বিবেকবান সৎ মানুষকে ওই ধারার সংগ্রামে সমবেত করতে হবে। এই সুস্পষ্ট লক্ষ্যে গড়ে তুলতে হবে জাতীয় জাগরণ। এটিই জন্ম দিতে সক্ষম হবে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারের ভিত্তিতে নতুন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে জাতীয় নবউত্থান। এই মূল কাজের কথা মনে রেখে অগ্রসর হতে পারলেই জনগণ তার নিজের ও দেশ-জাতির অস্তিত্ব রক্ষার্থে উৎসাহের সঙ্গে ‘জীবন বাজি রাখা’ সংগ্রামে এগিয়ে আসবে, এ জন্য সংঘবদ্ধ হবে, সৃষ্টি করবে নবজাগরণ।

জনগণের সংগঠিত গণঅভ্যুত্থানের আঘাতে উপড়ে ফেলতে সক্ষম হবে ঘুষ-দুর্নীতি-দুরাচারের বর্তমান ভয়াবহতার উৎসকে। জনগণের অজেয় শক্তিকে ঘরে আবদ্ধ করে রেখে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ দিয়ে পরম শক্তিধর ‘মাফিয়া সিন্ডিকেট’-এর রাহুগ্রাস ও এর অর্থনৈতিক-সামাজিক ভিত্তি উপড়ে ফেলা যাবে না। তাই ঘুষ-দুর্নীতি-অনাচারের বিরুদ্ধে বর্তমান ‘শুদ্ধি অভিযান’-এর সফল পরিণতি ঘটতে পারে কেবল একটি প্রগতিমুখীন সমাজ বিপ্লব সংগঠিত করতে পারার মাধ্যমে। কিন্তু ওই কাজটি লুটেরা ধনিকশ্রেণির স্বার্থে পরিচালিত কোনো সরকারের পক্ষে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এ কাজটি করতে হবে দেশের বামপন্থি, প্রগতিশীল, প্রকৃত গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তিকে।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

advertisement