advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পেঁয়াজের দোষ : পশুত্বে বাম্পার

মোস্তফা কামাল
৩০ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০১৯ ০৮:৪৭
advertisement

দেশে পেঁয়াজের উৎপাদনে কমতি হলেও তা বিশাল নয়। আবার আমদানি কিছুটা কমলেও বন্ধ হয়নি। আড়ত-গুদামেও ঘাটতি নেই। খুচরা-পাইকারি সব বাজারেই পেঁয়াজের স্তূপ। দাম কমবে বলে আশ্বাস দিয়েই যাচ্ছেন মন্ত্রীরা। এর পরও দাম কেবল বাড়ছে। হুলুস্থূলও ডালপালা ছড়াচ্ছে। নানা কাণ্ডকীর্তিতে পেঁয়াজ নিয়ে প্যানিকও ছড়ানো হচ্ছে। সেই সঙ্গে তামাশা-মশকারা, রসঘন কথাবার্তার ছড়াছড়ির ধুম।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডজনখানেক কর্মকর্তা মহাব্যস্ত পেঁয়াজের বাজার সামলানো নিয়ে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাজশাহী, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, যশোর, দিনাজপুর, পাবনা, সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ ও শরীয়তপুরে পেঁয়াজের বাজার তদারকিতে কাহিল তারা। এর বাইরে প্রতিটি জেলা প্রশাসনকেও পেয়েছে পেঁয়াজের ঝামেলায়। তাদের বলা হয়েছে, বাজার সামলানোর কাজে অবদান রাখতে। ভোমরা, সোনামসজিদ, হিলি ও বেনাপোল বন্দরসহ বিভিন্ন মোকামে ছোটাছুটি পরিবহনসংশ্লিষ্টদের। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর, কাস্টমস, বন্দর, টিসিবি, ব্যাংক কর্তৃপক্ষও বসে নেই।

সবার পেছনে আবার র‌্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা কত কিছু। মোট কথা কারোরই অবসর নেই। মন্ত্রীর বরাতে জানানো হয়েছে, সরকার ব্যবসায়ীদের চটাতে চায় না। তাই পেঁয়াজ আমদানি বৃদ্ধি এবং নৈতিকতার সঙ্গে ব্যবসা করার মিনতি জানানো হয়েছে। এর মধ্যেও সরকার বাধ্য হয়েছে পেঁয়াজ মজুদ, কৃত্রিম উপায়ে মূল্যবৃদ্ধির চেষ্টা এবং স্বাভাবিক সরবরাহে ব্যাঘাত সৃষ্টিতে জড়িত কিছু মলা-ঢেলা-চুনোপুঁটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। বাজার তদারকি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেছেন, এ অবস্থায় হঠাৎ চাপ দিলে ব্যবসায়ীরা বিগড়ে যাবেন। বুঝেশুনে এবং দায়িত্ব নিয়েই তিনি বলেছেন কথাটি।

কে না বোঝে পশুচরিত্রের কিছু অংশের কালো থাবা পড়েছে দেশের পেঁয়াজরাজ্যে। ধান-কুঁড়া, চাল-চালতা, চামড়া-আমড়া এমনকি কয়লাও বাদ দেয় না এরা। ক্যাসিনোসহ চাঁদাবাজ, বখরাবাজ দমনের মাঝপথে এখন ভর করেছে পেঁয়াজবাজারে। বিদ্যুতের গতিকে হার মানিয়ে আড়ত-গুদামগুলো করে ফেলেছে পেঁয়াজশূন্য। পেঁয়াজের জন্য আমরা বরাবরই প্রতিবেশী দেশ ভারতের ওপর কিছুটা নির্ভরশীল। এবার বৈরী আবহাওয়ার কারণে ভারতে পেঁয়াজের ফলন কম হয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় চাহিদার তুলনায় কমেছে সরবরাহ। ভারতের এ সিদ্ধান্তের অসদ্ব্যবহারে একটুও দেরি করেনি বাংলাদেশের সিন্ডিকেটবাজরা। বাংলাদেশে পেঁয়াজের কেজি সেঞ্চুরি পার করে নিয়ে গেছে তারা। ছড়িয়েছে নাই-নাই হাহাকার। গোটা ব্যাপারটাতেই পাকা হাতের কারসাজি।

সচরাচর ঈদ মৌসুমে পেঁয়াজের ঝাঁজে তেতে ওঠে একটি চক্র। সরকারের আগাম পদক্ষেপের কারণে গেল দুই ঈদের কোনোটাতেই পেরে ওঠেনি ওরা। তখন দম ধরেছে। হাল ছাড়েনি। সুযোগের অপেক্ষা করেছে। এখন কোনো উৎসব বা মৌসুম ছাড়াই নেমেছে কোমর বেঁধে। গত কদিনে জনগণের পকেট কেটে তারা শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। নিচ্ছেই। দমছে না কিছুতেই। বাজার ব্যবস্থাপনায় হরিলুট নতুন নয়। এই সমস্যা কেবল পেঁয়াজের বাজারেই নয়। এটা ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। প্রতিটি ব্যবসার স্তরে স্তরে। হিসাব করলে তা জীবনরক্ষাকারী ওষুধের বাজারেও কম হবে না। কিন্তু এখন পর্যন্ত পলিটিক্যাল না হওয়ায় এবং প্রচুর উৎপাদন, সরবরাহ থাকায় সেটা ইস্যু হয়নি।

পেঁয়াজ কেবলই একটি মসলা। নিরামিষাসীদের জন্য জরুরিও নয়। কিন্তু মসলার বদলে পেঁয়াজকে সবজির আসনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কেউ কেউ পেঁয়াজ যেন রাঁধেন। মাছ দিয়ে, মাংস দিয়ে, এমনকি ডাল দিয়েও পেঁয়াজ রান্নার এ সংস্কৃতি নিয়ে কিছু বলাও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রয়াত সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রী থাকার সময় একবার স্বভাবসুলভে বলে ফেলেছিলেন, পেঁয়াজ না খেলে কী হয়? এ কথা বলে আচ্ছা রকমের ফ্যাসাদে পড়েছিলেন তিনি। সমালোচনা হয়েছিল তার দল থেকেও।

বর্তমান বাজারে এক পিস পেঁয়াজের চেয়ে এক পিস ডিম বা আপেলের দাম কম পড়ছে-হিসাব কষে এমন তথ্যও দেওয়া হয়েছে গণমাধ্যমে। তত্ত্ব এবং তথ্য হিসাবে এর সঙ্গে দ্বিমতের কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশ-ভারত দেশ দুটিতেই পেঁয়াজ যত না মসলা, তার চেয়ে বেশি পলিটিক্যাল আইটেম। দাম বেশি বেড়ে যাওয়ায় পেঁয়াজ কিনতে গেলেও এখন চোখে পানি আসছে। আবার দাম বেশিকম যাই হোক, পেঁয়াজ ছুলতে গেলেও চোখে পানি। তার পরও পেঁয়াজ চাই। এটা যৌথদোষ। পেঁয়াজেরও। ভোক্তারও। এর পরও পেঁয়াজকে দোষী করে যথেচ্ছ হালকা কথাবার্তাও জম্পেশ। বাংলাদেশ ইলিশ দেওয়ার পরও ভারত কেন পেঁয়াজ রপ্তানি কমিয়ে দিল, এ নিয়ে বাংলাদেশে মনোকষ্ট পাওয়া মানুষ অনেক। আবার ভারতেও মাতামাতি কম নয়।

পেঁয়াজ ছাড়াও রান্না সুস্বাদু হয়-এমন কথা বলামাত্র চটে যাওয়া, পেঁয়াজের রোগে পেয়ে বসা মানুষের সংখ্যা প্রচুর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড়। এতে ভেসে বেড়াচ্ছে পেঁয়াজ নিয়ে কূটনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতির নানা তত্ত্ব। এগুলোর ভাইরালের বাজারও জমজমাট। পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়াগুলোও এ পেঁয়াজ দৌড়ে পেছনে থাকতে চাচ্ছে না। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে নিজের স্বার্থেই। সে তার অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বাজার ঠিক রেখেই অন্য দেশে রপ্তানি করবে। ইউরোপের দেশগুলোতে জায়ফল, জয়ত্রি, লবঙ্গসহ মসলার দোষের ইতিহাস রয়েছে ষোলোশ খ্রিস্টাব্দে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলো এসব মসলার জন্য সমুদ্রপথে যেত প্রাচ্যের দেশগুলোতে। এই আসা-যাওয়া এবং মসলা জোগাড়ের পথে বহু নৌকা-জাহাজডুবি, পানিতে অপমৃত্যুর ঘটনা রয়েছে। মসলার সেই দোষ বর্তমান ইউরোপীয়দের নেই। তবে পেঁয়াজ নিয়ে সেটার ভাইরাস রয়ে গেছে ভারত-বাংলাদেশে।

অপ্রিয় সত্য হচ্ছে, উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বা বিকল্প আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত পেঁয়াজের জন্য বাংলাদেশকে ভারতসহ বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হবে। এটাই সার কথা। নানা বিতর্ক-গরমিলের পরও পশুসম্পদ নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের সম্প্রতি দেওয়া তথ্য আশাজাগানিয়া। মাছ উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। মাথপিছু ডিম গ্রহণের হারও আন্তর্জাতিক মানদ-ের কাছাকাছি। গোসম্পদ বা মৎস্য নিয়ে বাংলাদেশে বিদেশনির্ভরতা বা প্যানিক কমেছে উৎপাদনের সক্ষমতার সুবাদে। দেশে গত কয়েক বছরে পশুসম্পদের উৎপাদন গর্ব করার মতো। দেশে কৃষিখানার কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য, শস্য, মৎস্য, প্রাণিসম্পদসহ পোলট্রি উপখাতের অবস্থা, ভূমি ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ের সঠিক ধারণা পেতে প্রতি দশ বছর পরপর এ ধরনের শুমারি করা হয়। এর মাধ্যমে দেশে গবাদিপশু গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগির তথ্য উঠে আসে। তাদের হিসাবে দেশে গরুর সংখ্যা ২ কোটি ৮৪ লাখ ৮৭ হাজার ৪১৫। ছাগলের সংখ্যা ১ কোটি ৯২ লাখ ৮৭ হাজার ৪১৩, মহিষ ৭ লাখ ১৮ হাজার ৪১১টি, ভেড়া ৮ লাখ ৯২ হাজার ৬২৮টি। হাঁসের সংখ্যা ৬ কোটি ৭৫ লাখ ২৯ হাজার ২১০ এবং মুরগি রয়েছে ১৮ কোটি ৯২ লাখ ৬২ হাজার ৯১০টি।

বলতেই হয়, পশুরা পশুত্ব নিয়েই জন্মায়। পশুত্ব তাদের অর্জন করতে হয় না। কিন্তু মানুষের জন্ম মনুষ্যত্বসহ হয় না। তাদের মনুষ্যত্ব অর্জন করতে হয়। সেটা অর্জন করতে গিয়ে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় মানুষকে। এমন কাঠিন্য জয়ের বদলে কারও কারও কাছে পশুত্বই লাভজনক। তাদের আয়-উন্নতিও আসে দ্রুত। তারা এগিয়ে যায় সব সূচকেই। উন্নতি-অগ্রগতির এ জোয়ারে বিরোধী দলের ভোট ছাড়া দেশে বাদবাকি প্রায় সবই বাড়ছে। আয়-আয়ুর সঙ্গে খুন-ধর্ষণ, লুটোপুটি, দুর্নীতিসহ অনেক কিছুতেই বাড়তি সূচক। এ কারণে মানুষের আয়-উন্নতির সঙ্গে গরু-ছাগলও এখন সাবজেক্ট হয়ে উঠেছে। পশুর পজিশন ওপরের দিকে যাচ্ছে। সংকট থেকে তা সম্ভাবনার আসনে চলে গেছে। দেশ গরু-ছাগলে এখন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। চার-পাঁচ বছর আগেও গরু-ছাগলের চাহিদার বড় অংশ মিটত প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করে। ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধ করে দেয়। এতে বাজারের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশে গবাদিপশুর লালনপালন ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। ফল মেলে দ্রুত।

এক সময় কেবল কোরবানি ঈদের আগে দেশে ২০ থেকে ২২ লাখ গরু-ছাগল বৈধ-অবৈধ পথে বাংলাদেশে আসত। সারা বছরে এই সংখ্যা ৩০ লাখে ছুঁয়ে যেত। ভারত থেকে গবাদিপশু আসা বন্ধ হওয়ার পর দেশে প্রতিবছর ২৫ শতাংশ হারে গবাদিপশুর খামার বাড়ছে। ছোট-বড় মিলিয়ে এখন খামারের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। গত তিন বছরে দেশে গরু-ছাগলের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২০ লাখ। বাড়ছে ভেড়া-মহিষ উৎপাদনও। গরু-ছাগলের উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে স্বাভাবিকভাবে এ খাতে এসেছে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থানের উন্নতিও। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদনেও এর স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। শুধু উৎপাদনের দিক থেকেই নয়, গবাদিপশুর জাতগত বৈচিত্র্যের দিক থেকেও বাংলাদেশকে বেশ সমৃদ্ধিশালী দেশ বলছে এফএওসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক-কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

advertisement