advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পেঁয়াজবাজারে অস্থিরতা : দায়টা কার

আহমদ রফিক
৬ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৬ নভেম্বর ২০১৯ ০২:৫৪
advertisement

পেঁয়াজ রান্নাঘরের অত্যাবশ্যকীয় উপাদানÑ সব শ্রেণির মানুষের। এমনকি দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ বা দিনমজুরের জন্যও বহুকথিত ‘মরিচ-পেঁয়াজ-পান্তাভাত’। এবার এমন একটি খাদ্যপণ্য বেছে নিয়েছে বৃহৎ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তাদের মুনাফা লালসা মেটানোর উদ্দেশ্যে।

ঘটনা অতি ছোট। ভারত হঠাৎ করেই বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর একটি অবাঞ্ছিত ঘোষণা দেওয়ার পর পরই পেঁয়াজের দামে উল্লম্ফন। ৪৫ টাকা কেজির পেঁয়াজ (কারও মতে ৫০ টাকা কেজি) হঠাৎ করেই ৮০ টাকা কেজিতে পৌঁছে গেল কেন? এরপর আরও বাড়তি ১০০ টাকা কেজি।

সেই মুহূর্তে কি হঠাৎ করে পেঁয়াজের ঘাটতি? গুদাম খালি হয়ে গেল? সংবাদপত্রগুলোতে বড় বড় শিরোনাম মোটা হরফে। এই যে যুক্তিহীন দাম বাড়ানোর মতো জনস্বার্থবিরোধী অপতৎপরতা, এর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল। প্রথমত, পেঁয়াজের বড় বড় মোকামে গুদামগুলোতে হানা, পেঁয়াজ বাজারে ছাড়া এবং মূল্য পূর্বাবস্থার স্থিতিশীল রাখার নির্দেশÑ অন্যথায় কঠোর ব্যবস্থা, যে ‘কঠোর ব্যবস্থার’ কথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় হরহামেশা বলে থাকে।

দ্বিতীয়ত, যদি ঘাটতি থাকে, তা হলে উল্লিখিত ব্যবস্থার পাশাপাশি করুণীয় দ্রুত অন্য উৎস থেকে পেঁয়াজ আমদানির ব্যবস্থা করা এবং তা হয় সরকারি তদারকিতে কিংবা টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্য দামে বিক্রির ব্যবস্থা করা। এসবের কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। শুধু বাণিজ্য সচিবের বিবৃতিতে জানা গেল, ‘পেঁয়াজের মজুদ দুমাসের মতো ভালোই আছে। বাজার অস্থির করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কিন্তু পেঁয়াজের বাজার তো ইতোমধ্যে অস্থির করে ফেলা হয়েছে, সে পাগলা ঘোড়ার মতো লাফাচ্ছে। প্রতিদিন খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। নেপথ্যে সবার চোখের আড়ালে চাবিকাঠি নাড়ছে বৃহৎ ব্যবসায়ী আমদানিকারকদের সিন্ডিকেট। তারই প্রতিক্রিয়া ও প্রতিফলন খুচরা বাজারে। অবশ্য দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে খুচরা বাজারের দোকানিরাও কম যায় না। আমাদের প্রশ্ন, ঘাটতি হলেই কি সঙ্গে সঙ্গে দাম বাড়াতে হবে? এটা তো কোনো নিয়ম হতে পারে না।

দুই

স্বভাবতই মানুষও অস্থির। মধ্যবিত্ত থেকে সর্বনিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষ যারা ‘দিন আনে দিন খায়’ শ্রেণির মানুষ। সর্বত্র আলোচনার বিষয় মাত্র একটাই পেঁয়াজ, অর্থাৎ পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। দাম বাড়ছে, তো খাওয়া কমাওÑ এই আপ্তবাক্য মনে রেখেও ভাবনা, কত আর কমানো যায়?

আচ্ছা, প্রতিবাদে একটা কাজ কি মানুষ করতে পারে? আপাতত কিছুদিন রান্নাঘরে পেঁয়াজ সরবরাহ একেবারে বন্ধ করা। বিত্তবানদের কথা আলাদা। অন্যরাই তো সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা যদি সত্যি কয়েক সপ্তাহ একেবারে পেঁয়াজ খাওয়া বন্ধ করে দেন তা হলে অবস্থা কেমন দাঁড়াবেÑ পাইকারি ও খুচরা বাজারে? পেঁয়াজ তো অতিমাত্রায় পচনশীল পণ্য। পাইকারি গুদামে পেঁয়াজে পচন ধরলে মুনাফাবাজ সিন্ডিকেটের প্রতিক্রিয়া কী হবে? তারা কি গুদাম খালি করে পেঁয়াজ বাজারে ছাড়বে, নাকি ওগুলোকে পচতে দেবে? তাদের আচরণ-প্রবণতা আমার জানা নেই। তবে পেঁয়াজ খাওয়া মানুষ প্রতিবাদে একবার ঐক্যবদ্ধভাবে এ চেষ্টা করে দেখতে পারতেন। আমার বিশ্বাস সুফল মিলতেও পারত।

অন্যদিকে পেঁয়াজ নিয়ে মুনাফাবাজির ষড়যন্ত্রে শুধু ভোক্তাসাধারণ সমাজই নয়, অস্থির সাংবাদিকতার মহলওÑ সাংবাদিক ও দৈনিক সংবাদপত্র। তাদের কাগজের পাতায় দৃশ্যমান বিচিত্র সংবাদ শিরোনাম, তিক্ত কিংবা সরস ভাষ্যে।

একটি দৈনিকে সংবাদ শিরোনামটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ : ‘পেঁয়াজ সিন্ডিকেটে জিম্মি পুরো দেশ’। বাস্তবিক ঘটনা এমনই। শুধু রাজধানী ঢাকাই নয়, পেঁয়াজের অস্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য দাম গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে, কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দাম খুচরা বাজারে ১২০ থেকে ১২৫ টাকা।

স্বভাবতই বিশেষ কোনো কাগজের সাংবাদিকের বাজার ঘুরে এসে এমন কথা মনে হতেই পারে, ‘পাগলা পেঁয়াজ খেপেছে’ এবং সেই ভাবনারই প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ সংবাদপত্রের শিরোনামে এবং পেঁয়াজের দাম বাড়া নিয়ে বিশদ বিবরণ প্রকাশে। সত্যি, পেঁয়াজ নিয়ে পিয়াজির কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। কবে যে এই মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক স্তরে নেমে আসবে তা কেউ বলতে পারে না।

বাংলাদেশের পণ্যবাজার, বিশেষ করে খাদ্যপণ্য বাজারের একটা অদ্ভুত, অস্বাভাবিক প্রবণতা লক্ষ করা যায়Ñ যে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের দাম একবার উচ্চশিখরে পৌঁছায়, তা এক সময় কমে এলেও কখনো স্বাভাবিক সীমারেখায় পৌঁছায় না। একবার যদি দশ টাকা বাড়ল তো বড়জোর ৫ টাকা কমল, কিন্তু কখনই তা দশ টাকা কমে স্বাভাবিক অবস্থায় আসে না।

যেমন উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বছর কয়েক আগে হঠাৎ করে অকারণে চালের দাম কেজিপ্রতি আট টাকা বেড়ে গিয়েছিল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কল্যাণে। অনেক দেনদরবার শেষে তার দাম কমল মাত্র কেজিপ্রতি দুই টাকা। এর পর থেকে আমি লক্ষ করে দেখেছি, বাজারে চালের দাম হঠাৎ বৃদ্ধির পূর্বমাত্রায় আর কখনই পৌঁছায়নি, এখনো নয়।

ভেবে দেখার মতো ঘটনা যে, ওই মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে কী পরিমাণ মুনাফা লুটেছে বৃহৎ ব্যবসায়ী, আমদানিকারকরা। কত অন্যায্য অর্থসম্পদ সঞ্চিত হয়েছে তাদের জমা খরচের তথা হিসাবের খাতায়। আমি আরও লক্ষ করেছি, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে এ খেলচাতুরীর বিষয়ে কেউ একটি কথাও লেখেনি কিংবা প্রতিবাদ করেনি। সংবাদ সম্মেলন করে ওই ‘চালবাজি’ নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে অভিযোগপত্র তৈরি করেনি বৃহৎ ব্যবসায়ী শ্রেণির বিরুদ্ধে।

প্রকৃতপক্ষে বাজার পরিস্থিতি, দৈনন্দিন ব্যবহার্য খাদ্যপণ্যের অস্থিরতা লক্ষ করে বলতে হয়, কী বিচিত্র বাংলাদেশের বাজার। গ্রিক পর্যটক বা বাংলা নাটকের ভাষ্যকার বাংলাদেশের বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে হয়তো এমন কথাই বলতেন বা লিখতেন।

তিন

তবে পেঁয়াজ একটি অতি সাধারণ পণ্য। এর ওপর বড় সড় বাজি ধরা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, বিশেষ করে এর পচনশীল প্রবণতার কারণে। এটা তো আর চাল নয় যে সহজে পচবে না। তাই দাম হয়তো এক সময় এর অস্বাভাবিক শিখর চূড়া থেকে নেমে আসবে, তবে কতটা নামবে তা আমরা জানি না।

তবে এ প্রসঙ্গে আমাদের কথা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জনসাধারণের ভোগান্তি কমানোর জন্য, দয়া করে বাজার, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের বাজার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন। পণ্যবাজার নিয়ে ওদের দৌরাত্ম্য ও নৈরাজ্য বন্ধ করুন।

তা না হলে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টই বাড়বে না, বাড়বে ক্ষোভ, প্রতিক্রিয়াÑ এটা কোনো শাসনযন্ত্রেরই কাম্য হওয়ার কথা নয় এবং তা সমাজের জন্য মঙ্গলজনকও নয়। আর তা শুভবুদ্ধির পরিচায়কও হবে না। শাসনযন্ত্রের স্বীকৃত কর্তব্য জনসাধারণের দুঃখ-কষ্ট ও সমস্যাদির নজরদারি করা এবং যথোচিত ব্যবস্থা নেওয়া।

কথাটা শুরু হয়েছিল খাদ্যপণ্য পেঁয়াজের হঠাৎ অতিমাত্রায় মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে এবং তা স্বাভাবিক মাত্রায় নামিয়ে আনা সম্পর্কে। আমরা ভাবছিলাম পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির বিনিময়ে অনেক মুনাফা তো অর্জিত হয়েছে, এবার পাগলা ঘোড়ার লাফানি বন্ধ হোক, কিন্তু সংবাদবাজার তো তেমন ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

ভোরে উঠে একটি দৈনিকের পাতায় চোখ রাখতেই দেখা গেল হতাশাব্যঞ্জক শিরোনামÑ ‘পেঁয়াজের বাজারে সুখবর নেই’। তিন কলামব্যাপী মোটা সংবাদ। একটা হিসাবও এখানে আছে, ‘দেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি ১৩০ টাকা ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ ১২০-২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’ আমাদের প্রশ্ন, ‘আমদানির সুফল কোথায়? প্রভাব কোথায় বাজরে?’ বাণিজ্যমন্ত্রী এ সম্বন্ধে কিছু বলবেন কি? খুচরা ব্যবসায়ীদের মতে, ‘পেঁয়াজ বিক্রি করে এবার পাইকারি ব্যবসায়ীরাই বেশি লাভবান।’ যত ক্ষতি সবই সাধারণ মানুষের। শোনা যাচ্ছে, দাম কমতে আরও সময় লাগবে। জনদুর্ভোগের এ দায়টা কার? কে জবাবদিহি করবে?

আহমদ রফিক : ভাষাসংগ্রামী, কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

advertisement