advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

হৃদরোগে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে ট্রান্স ফ্যাট নির্মূলের বিকল্প নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
৯ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৯ নভেম্বর ২০১৯ ০০:১১
advertisement

বিশে^ প্রতিবছর হৃদরোগে মারা যায় ১ কোটি ৭৯ লাখ মানুষ, যার মধ্যে সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ মারা যান শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণের কারণে। বাংলাদেশেও প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদরোগের কারণে মারা যায়। খাদ্যদ্রব্যের মাধ্যমে উচ্চমাত্রায় ট্রান্স ফ্যাটিক অ্যাসিড (টিএফএ) নামক এক ধরনের চর্বিজাতীয় পদার্থ গ্রহণই এই হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। এ বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের অবহিত করার লক্ষ্যে গত বুধবার বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনের শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলন সভাকক্ষে এক কর্মশালায় এই তথ্য জানানো হয়। ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডসের (সিটিএফকে) গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের সহায়তায় ‘ট্রান্স ফ্যাট ও হৃদরোগ ঝুঁকি এবং গণমাধ্যমের করণীয়’ শীর্ষক এ কর্মশালা যৌথভাবে আয়োজন করে প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং অ্যান্টি-টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা)।

কর্মশালায় গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা তুলে ধরেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট আবু আহমেদ শামীম ও ন্যাশনাল হার্টফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ট্রান্স ফ্যাট প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ডা. শেখ মো. মাহবুবুস সোবহান। কর্মশালায় গণমাধ্যমের করণীয় অংশে আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি তৌফিক মারুফ, অ্যান্টি-টোব্যাকো মিডিয়া

অ্যালায়েন্সের কো-কনভেনর ও দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার মিজান চৌধুরী, গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস এবং প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের।

কর্মশালায় ট্রান্স ফ্যাটের সাধারণ বৈশিষ্ট্য, উৎস এবং এর উৎপত্তি নিয়ে আবু আহমেদ শামীম বলেন, এটি এক ধরনের অসম্পৃক্ত চর্বি বা আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, যাতে মূলত আংশিক জারিত তেল বিদ্যমান থাকে। যা ডালডা কিংবা বনস্পতি ঘি নামে আমাদের দেশে পরিচিত। এতে ২৫-৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ট্রান্স ফ্যাট থাকে। খাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো খাবার সংরক্ষণের সুবিধার্থে এবং বিভিন্ন ভাজা-পোড়া ও বেকারি খাদ্যপণ্যের স্বাদ, ঘ্রাণ এবং স্থায়িত্ব বাড়াতে আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেল ব্যবহার করে থাকে। এ ছাড়া ভাজা-পোড়া খাদ্যে একই ভোজ্যতেল উচ্চ তাপমাত্রায় বারবার ব্যবহারের কারণেও খাদ্যে স্বল্পমাত্রায় ট্রান্স ফ্যাট সৃষ্টি হয়। তিনি আরও বলেন, ঢাকার স্থানীয় বাজার থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে সংগৃহীত ১২ ধরনের বেকারি বিস্কুট নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় সেগুলোতে ৫ শতাংশ থেকে ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত ট্রান্স ফ্যাটের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে (মোট ফ্যাটের ২ শতাংশের কম) অনেক বেশি।

কর্মশালায় টিএফএর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে ডা. শেখ মো. মাহবুবুস সোবহান বলেন, বিশ্বব্যাপী হৃদরোগজনিত মৃত্যু আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার রক্তে ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল হিসেবে পরিচিত এলডিএল কোলেস্টেরল বৃদ্ধি করে, অপরদিকে এইচডিএল কোলেস্টেরল (যাকে ‘ভালো’ কোলেস্টেরল বলা হয়) কমিয়ে দেয়। এইচডিএল কোলেস্টেরল রক্তনালি থেকে খারাপ কোলেস্টেরল সরিয়ে দেয়; কিন্তু ট্রান্স ফ্যাটের কারণে এইচডিএল কমে যায় এবং খারাপ কোলেস্টেরল রক্তবাহী ধমনিতে জমা হয়ে রক্তচলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। এভাবে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ ছাড়া ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবারের কারণে স্ট্রোক ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। উচ্চমাত্রায় ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণের কারণে সার্বিকভাবে মৃত্যুঝুঁকি ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ২১ শতাংশ এবং হৃদরোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি ২৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী এক ব্যক্তির দৈনিক ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণের পরিমাণ হওয়া উচিত মোট খাদ্যশক্তির ১ শতাংশের কম, অর্থাৎ দৈনিক ২০০০ ক্যালোরির ডায়েটে তা হতে হবে ২.২ গ্রামের চেয়েও কম।

কর্মশালায় আরও উল্লেখ করা হয়, বিশে^র প্রথম দেশ হিসেবে ডেনমার্ক ২০০৩ সালে আইন করে খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ নির্ধারণ করে। অস্ট্রিয়া, নরওয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা, থাইল্যান্ড, ইরান, ভারতসহ মোট ২৮ দেশে খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ কার্যকর করায় এসব দেশে ইতোমধ্যে শিল্পোৎপাদিত খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। এ ছাড়া আরও ২৪ দেশ ট্রান্স ফ্যাট নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক করেছে, যা আগামী দুই বছরের মধ্যে কার্যকর হবে। অন্যদিকে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর আমেরিকা এবং কানাডা ট্রান্স ফ্যাটের প্রধান উৎস পিএইচও-এর উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। পাশর্^বর্তী দেশ ভারতে ২০১১ সাল থেকে তেল ও বনস্পতি ঘি বা ডালডা জাতীয় পণ্যে ট্রান্স ফ্যাটের মাত্রা সর্বোচ্চ ১০% পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করা হয় এবং ২০১৫ সালে এটি ৫ শতাংশে কমিয়ে আনা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে ভারতের ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি ২০২২ সালের মধ্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ মাত্রা ২ শতাংশে কমিয়ে আনার পাশাপাশি খাবারে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট পরিহার করার ঘোষণা দেয়।

advertisement