advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ভ্যানামির দাপটে বিশ্ববাজারে কোণঠাসা বাংলাদেশের চিংড়ি

তৈয়ব সুমন চট্টগ্রাম
৯ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৯ নভেম্বর ২০১৯ ১৪:৩০
advertisement

দেশের হিমায়িত মৎস্য রপ্তানির সিংহভাগই চিংড়ি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৪ হেক্টর ঘেরে চিংড়ি চাষ হচ্ছে। এই চিংড়ি ও মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণে সারা দেশে গড়ে উঠেছে ১১০টি কারখানা। বার্ষিক সাড়ে ৩ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতা থাকা এসব কারখানা থেকে হিমায়িত মৎস্য ৬০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশীয় জাতের বাগদা, গলদা, হরিণা ও চাগা চিংড়ির চাহিদা যেন ক্রমেই কমছে বিশ্ববাজারে। তার পরিবর্তে বাড়ছে চিংড়ির আরেক জাত ভ্যানামির চাহিদা।

বিশেষ করে দামে সস্তা আর কম খরচে অল্প জমিতে অধিক পরিমাণের উৎপাদনই ভ্যানামির এত চাহিদার কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নানা কারণে এ চিংড়ির চাষ এখনো শুরু হয়নি বাংলাদেশে। এ ছাড়াও চিংড়ি চাষে কাঁচামাল সংকটের কারণেও সংকটের মধ্যে আছেন রপ্তানিকারকরা। তারা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম ও খুলনা অঞ্চলে চিংড়ি চাষের কাঁচামাল সংকটের কারণে দেশের ১১০টি কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা কমেছে ৮০ শতাংশ।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫৫ কোটি মার্কিন ডলারের প্রায় ৪৭ হাজার ৬৩৫ টন হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৫১ কোটি মার্কিন ডলারের ৪৪ হাজার ২৭৮ টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রপ্তানি আরও কমে হয় ৪৭ কোটি ২০ লাখ ডলারের ৪০ হাজার ৭২৬ টন।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ৪৪ কোটি ৬০ লাখ ডলারের ৩৯ হাজার ৭০৬ টন চিংড়ি। ২০১৭-১৮তে রপ্তানি হয় প্রায় ৪১ কোটি ডলারের ৩৬ হাজারের ১৬৮ টন এবং সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রপ্তানি করা হয়েছে ৩৬ কোটি ১০ লাখ ডলারের ৩৩ হাজার ৩৬৩ টন হিমায়িত চিংড়ি। অর্থাৎ গত ছয় অর্থবছরে চিংড়ি রপ্তানি কমেছে ১৪ হাজার ২৭২ টন এবং রপ্তানি মূল্য কমেছে প্রায় ১৯ কোটি মার্কিন ডলার।

রপ্তানিকারকরা জানান, ২০০৮ সালে বিশ্ববাজারে অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকে বাংলাদেশের চিংড়ির বাজার দখল করে অন্যান্য দেশে চাষ হওয়া ভ্যানামি। মূলত দেশীয় চিংড়ির উৎপাদন ভ্যানামি চিংড়ির তুলনায় ১০ ভাগের এক ভাগ হওয়ার কারণে বাগদা কিংবা গলদা বাজার ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে। সাধারণত রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো চট্টগ্রাম ও খুলনায় গড়ে ওঠা হ্যাচারি এবং ঘের থেকে চিংড়ি ও সাদা মাছ সংগ্রহ করে।

কিন্তু গত কয়েক বছর এসব হ্যাচারি ও ঘেরে চিংড়ির উৎপাদন কমে গেছে। যার মূল কারণ হিসেবে বিদেশি অর্ডার কমে যাওয়াকেই দায়ী করেছেন হ্যাচারি ও ঘের মালিকরা। ২০১৭ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বের মোট চিংড়ি উৎপাদনের ৭৭ শতাংশই ছিল ভ্যানামি। সেখানে বাগদা ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, গলদা উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ।

চিংড়ি চাষিরা জানান, সাধারণত বাগদা চিংড়ি হেক্টরপ্রতি উৎপাদন হয় সাড়ে ৩০০-৪০০ কেজি। সেখানে ভ্যানামি চিংড়ির উৎপাদন ৮-১০ হাজার কেজি। অন্যদিকে বিদেশের বাজারে ভ্যানামি চিংড়ির দাম কেজিপ্রতি ৪-৫ ডলার হলেও বাগদা চিংড়ি বিক্রি হয় ১৫-২২ ডলারে। ফলে সুস্বাদু হলেও দামের কারণে বাগদাসহ অন্যান্য চিংড়ির চাহিদা কমছে বহির্বিশ্বে। সুতরাং বিশ্ববাজার ধরতে হলে দেশে ভ্যানামি চিংড়ি উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন রপ্তানিকারকরা।

খুলনা অঞ্চলের রপ্তানিকারক হুমায়ুন কবির বলেন, দেশে ভ্যানামি চিংড়ি চাষ না করা হলে এই খাতের সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হবে। গত বছর সরকার চট্টগ্রাম ও খুলনার বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্যানামি চিংড়ি চাষের সম্ভাবনা, গুণাগুণ এবং পরিবেশগত বিষয় নিয়ে কাজ করছে। তবে ভ্যানামি চিংড়ির উৎপাদন শুরু করা হবে কিনা সেটা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি তারা। যার কারণে আমাদের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চিংড়ি রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়ছি।

জানা গেছে, দেশীয় চিংড়ি রক্ষায় সরকারের কাছে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএফইএ) কিছু সুপারিশ দিয়েছে। সেগুলো হলো বর্তমানে সরকার চিংড়ি চাষে ১০ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। এই প্রণোদনা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করতে হবে। হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনায় যে ১০ শতাংশ আয়কর কর্তন দেওয়া হয়েছিল সেটা বন্ধ করতে হবে। সরকার যে সাদা জাতের চিংড়ি রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছিল প্রত্যাহার করতে হবে সেটা। খুলনা অঞ্চলে দুটি এবং চট্টগ্রামে একটি ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার স্থাপন করতে হবে। যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা চিংড়ি মাছের ভেতরে অপদ্রব্য পুশ কিংবা মাথা কাটতে না পারে।

বিএফএফইএ সভাপতি মো. কাজী বেলায়েত হোসেন বলেন, চিংড়ি শিল্প বাঁচাতে সংগঠনের পক্ষ থেকে কয়েকটা সুপারিশ সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে বহির্বিশ্বের বাজার দখল করেছে ভ্যানামি চিংড়ি। সেজন্য সরকার গত বছর ভ্যানামি উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটকে দায়িত্ব দেয়। যেটির এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ভ্যানামির উৎপাদনের জন্য এখন থেকে কাজ শুরু করলেও বাজার ধরতে আরো পাঁচ বছর লাগতে পারে। তাই যত দ্রুত কাজ করা যাবে ততই আমাদের মঙ্গল।

advertisement