advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ভেজাল জ্বালানি তেল বিক্রি বাড়ছে

লুৎফর রহমান কাকন
৯ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৯ নভেম্বর ২০১৯ ০১:৫২
ছবি : সংগৃহীত
advertisement

দেশে মানহীন ভেজাল জ্বালানি তেল বিক্রির পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রতিনিয়ত গ্রাহকরা ঠকছেন পেট্রল পাম্পগুলো থেকে তেল নিয়ে। ফিলিং স্টেশনগুলোয় ওজনে কম ও ভেজাল তেল দেওয়া যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। এসব বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্ট সংস্থার। হঠাৎ হঠাৎ দুয়েকটি অভিযান পরিচালনা করলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় তেল বিক্রিতে প্রতারণা বন্ধ হচ্ছে না।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) গত অক্টোবরে আটটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ১৪টি মামলা দেয় বিভিন্ন পেট্রল পাম্পের মালিকদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া বিএসটিআইয়ের নিজস্ব টিম সাতটি অভিযান চালিয়ে ১৮টি মামলা করে। ভেজাল তেল এবং ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ পেট্রল পাম্পগুলোর বিরুদ্ধে। তবে সূত্র বলছে, নানা অনিয়মের কারণে এসব পেট্রল পাম্প সাময়িক বন্ধ করে দিলেও কিছুদিন পর আবারও চালু করে দিয়েছে বিএসটিআই।
অনিয়মের অভিযোগে সম্প্রতি মিরপুর ২-এর শাহআলীবাগ এলাকার পেট্রল পাম্প মেসার্স স্যাম অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের
বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। স্যাম অ্যাসোসিয়েটসের চারটি ডিজেল ডিসপেন্সিং ইউনিটে প্রতি ১০ লিটারে ৫০০ থেকে ৫৪০ মিলিলিটার তেল কম দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। এ ছাড়া উত্তরার আজমপুর এলাকার মেসার্স কসমো ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টার, উত্তরা তুরাগ এলাকার মেসার্স লতিফ অ্যান্ড কোং ফিলিং স্টেশন, গাজীপুরের চন্দ্রার মেসার্স মুন স্টার ফিলিং স্টেশন, মিরপুর এলাকার মেসার্স পূর্বাচল গ্যাস ফিলিং স্টেশন, মেসার্স রহমান সার্ভিস স্টেশন, মেসার্স আল মোসাফির ফিলিং স্টেশন, আবদুল্লাপুরের মেসার্স তাসিন সিএনজি ফিলিং স্টেশন, গাজীপুরের মেসার্স স্টার ফিলিং স্টেশন, মেসার্স রাজ ফিলিং স্টেশন, মেসার্স আহম্মেদ ফিলিং অ্যান্ড সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন এবং তেজগাঁও, আমিনবাজার ও গাবতলী এলাকার তিনটি পেট্রল পাম্পের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে বিএসটিআই।
বিএসটিআই সূত্রে জানা যায়, মূলত ফ্লো কন্ট্রোলিং ডিভাইসের মাধ্যমে ওজনে তেল কম দেওয়া হয় গ্রাহকদের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডিসপেন্সিং মেশিনের বিএসটিআইয়ের সিল ভেঙে এটা করা হয়। অন্যদিকে তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর সূত্রে জানা যায়, নানা অবৈধ উপায়ে কনডেনসেট, পামওয়েল তেল ডিজেলের সঙ্গে মিশিয়ে ভেজাল করে বিক্রি করা হয়। এমন প্রমাণ মেলায় অনেক ফিলিং স্টেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বিরুদ্ধেও মানসম্পন্ন তেল বিপণন না করার অভিযোগ। বিএসটিআই বলছে, বিপিসির বাধ্যবাধকতা থাকলেও পেট্রল, অকটেন এবং ডিজেলের মান সনদ গ্রহণ করছে না সংস্থাটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভেজাল ও নিম্নমানের তেল নিয়ে ভোক্তাদের ভোগান্তি ও অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। উৎপাদন, পরিশোধন থেকে শুরু করে পেট্রল পাম্পে বিক্রি পর্যন্ত নানা পর্যায়ে ভেজাল মেশানোর ঘটনাও পুরনো। বিপিসি এবং সরকারি বিপণন কোম্পানি, তেল পরিশোধনকারী কোম্পানি এবং পেট্রল পাম্পের মালিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ নানা পর্যায়ে এর সঙ্গে জড়িত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও উত্তরণে বিভিন্ন সময় মানহীন ও ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে সরকার। কিন্তু এ খাতের নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থাও যদি মান পরীক্ষা ছাড়া তেল বাজারজাত করে তবে দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে না।
দেশে ব্যবহৃত প্রধান তিনটি জ্বালানিÑ অকটেন, পেট্রল ও ডিজেল। এর মধ্যে চাহিদার চেয়েও বেশি পেট্রল দেশেই উৎপাদিত হয়। অকটেনও চাহিদার পুরোটুকু মেটানো হয় দেশীয় উৎস থেকে। কিন্তু গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া গ্যাসের উপজাত (কনডেনসেট) পরিশোধন করে উৎপাদিত এ দুই জ্বালানির একটিও আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় মানদ-ে উত্তীর্ণ নয়। এর ওপর নিম্নমানের অকটেন ও পেট্রলের পাশাপাশি আমদানিনির্ভর ডিজেলেও খুচরা পর্যায়ে ভেজাল মেশানো হয়। আর এর খেসারত দিচ্ছে গাড়ি ও সেচ পাম্পের মালিকরা। ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশেরও। বিএসটিআই সূত্র জানায়, মানসম্পন্ন জ্বালানি তেল সরবরাহ করা বাধ্যতামূলক। তাই বাজারজাত করার আগেই মান পরীক্ষা করে সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধ্যকতা রয়েছে। কিন্তু বিপিসি কখনই এ মান পরীক্ষা করায়নি এবং সনদ নেয়নি।
বিপিসি সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রায় ২ হাজার ১০০টি তেলের পাম্প রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে ১৩২টিতে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে সংস্থার তদন্ত দল। এর মধ্যে ১২৯টি পাম্প মানসম্মত অকটেন সরবরাহর করলেও তিনটিতে ভেজাল মিলেছে। আর ১৫-২০টি মানসম্মত পেট্রল বিক্রি করছে না। পরে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।
এদিকে রাষ্ট্রীয় একটি তেল বিপণন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমাদের সময়কে বলেন, ‘সরকারি খাতের তিনটি ও বেসরকারি ১৩টি রিফাইনারি (কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট) পেট্রোবাংলার কাছ থেকে কনডেনসেট নেয়। পরে তা প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে উৎপাদন করে পেট্রল, অকটেন, ডিজেল, সলভেন্ট, মোটর স্প্রিট, কেরোসিন সুপিরিয়র অয়েল, মিনারেল তার পেনটাইনসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য। বেসরকারি পেট্রল রিফাইনারিগুলোর কয়েকটির বিরুদ্ধে নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন, ভেজাল মেশানো এবং অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটির কার্যক্রম স্থগিতও করেছিল সরকার। কিন্তু পরে তা উঠিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে কঠোর না হতে পারার কারণে ভেজাল তেল বিক্রি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি প্ল্যান্টগুলো শুধু ফ্র্যাকশনেশন (উপজাত থেকে জ¦ালানি পণ্য) করছে। কিন্তু নির্দিষ্ট মানদ- রক্ষা করে পরিশোধনের ক্ষমতা তাদের নেই। এ জন্য যে আধুনিক প্রযুক্তির মেশিনারিজ ব্যবহার করা দরকার সেগুলো কোনোটিতেই নেই। ফলে নিম্নমানের তেল আসছে বাজারে। সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়, দেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদিত উপজাত কনডেনসেট ও অজ্বালানি সলভেন্ট পেট্রল ও অকটেন হিসেবে বিক্রি করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারির এ অপ্রক্রিয়াজাত ও ক্ষতিকারক জ্বালানি বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন এবং দোকানে বিক্রি করছে। কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারির মালিক, ট্যাংকলরি মালিক ও শ্রমিক সমিতি, ফিলিং স্টেশন ও খুচরা ব্যবসায়ীদের একটি জোট পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং যানবাহনের জন্য ক্ষতিকর এ তেল বছরের পর বছর ধরে বিক্রি করে যাচ্ছে।
জানা যায়, বেসরকারি রিফাইনারিগুলো পেট্রোবাংলার কাছ থেকে কনডেনসেট নিয়ে তা পরিশোধনের পর বিপিসির কাছে বিক্রি করে। প্রতি লিটার কনডেনসেট ৪৪ টাকায় বিক্রি করে পেট্রোবাংলা। তা প্রক্রিয়া করে প্রাপ্ত পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রিতে রিফাইনারিগুলোর মুনাফা (প্রফিট মার্জিন) ৭ টাকা। কিন্তু এ কনেডেনসেট চোরাইপথে তেল ভেজালকারীদের কাছে বিক্রি করলে তাদের লাভ হয় ২৫ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে ফিলিং স্টেশনগুলো প্রতি লিটার তেল বিক্রি করে ৩ টাকা ৭০ পয়সা পর্যন্ত মুনাফা করে। কিন্তু কনডেনসেট মিশিয়ে ভেজাল জ্বালানি তেল বিক্রিতে লিটারে লাভ হয় ১৯ টাকা পর্যন্ত। সবচেয়ে বেশি ভেজাল হয় অকটেন ও পেট্রোলে।

 

advertisement