advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অভিযান বাড়লেও কমছে না দাম

রেজাউল রেজা
৯ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৯ নভেম্বর ২০১৯ ০১:৪২
ছবি : সংগৃহীত
advertisement

দেশে মাসাধিক কাল হলো ক্রেতাদের নাভিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পেঁয়াজের ক্রমবর্ধমান মূল্য। প্রতিদিনের খাবারে অতি প্রয়োজনীয় এ পণ্যটির দামের লাগাম ধরা যাচ্ছে না কিছুতেই। বিভিন্ন সময় সরকারের তরফে আশ্বাস প্রদান ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও লাভ হয়নি। এখনো যে কোনো রকম পেঁয়াজের মূল্য প্রতি কেজি শতাধিক টাকা। দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের নির্দেশে বাজারে, আড়তেসহ সংশ্লিষ্ট স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান বাড়লেও কমছে না পেঁয়াজের দাম। লাগাতার শাস্তি ও জরিমানার পরও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি কিন্তু থেমে নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অভিযান আর আমদানি এর সমাধান নয়। পেঁয়াজের দামের ঊর্ধ্বগতি রুখতে পর্যাপ্ত সরবরাহ, সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজন সার্বিক তত্ত্বাবধান। পেঁয়াজের বাজারে চলমান কারসাজি রুখতে এবং ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে বাজার মনিটরিং কমিটি। ভোক্তা অধিকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠন হয়েছে মনিটরিং কমিটি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় প্রতিদিন রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত এলাকায় ৪টি দল অভিযান চালাচ্ছে। অভিযানে কারসাজিবাজদের এবং অনৈতিকভাবে দাম বাড়ানো ব্যবসায়ীদের অর্থদ-সহ সতর্কও করা হচ্ছে। তাতেও দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের।

গতকাল শুক্রবারও রাজধানীর শ্যামবাজারে অভিযান চালায় বাজার মনিটরিং কমিটি। অভিযানে পেঁয়াজের মূল্য নিয়ে কারসাজি এবং বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রির অপরাধে ৪ প্রতিষ্ঠানকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার এজিবি কলোনি ও ফকিরাপুল বাজারের বিভিন্ন দোকানে অভিযান চালিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের ২২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। গত মঙ্গলবারও যাত্রাবাড়ীর আড়ত ও বাজারে চলে অভিযান।

এর দুদিন আগেও যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৩টি প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ ১০ হাজার জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এরও একদিন আগে গত শনিবার পাইকারি বাজারের জন্য খ্যাত শ্যামবাজারে ৬ প্রতিষ্ঠানকে অর্থদ-সহ সতর্ক করে দেয় মনিটরিং কমিটি অনৈতিকভাবে বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করা, মূল্য তালিকা ও ক্রয় রসিদ দেখাতে না পারায়। অন্যদিকে গত সোমবার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের টিম অভিযান চালায়। সেখানেও কারসাজির দায়ে দুই ব্যবসায়ীর জেলসহ চার ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়। এর আগে পরও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলেছে অভিযান, চলছে এখনো। সারাদেশে প্রতিদিন অভিযানের পরও শতকের কোটা ছাড়ানো পেঁয়াজের দাম দুই অঙ্কে নামছে না। শাস্তির ভয়ে পাইকারি কিছু বাজারে দাম কমলেও এর ছাপ পড়ছে না খুচরা বাজারে অর্থাৎ ক্রেতাদের মধ্যে।

গতকাল শুক্রবারও রাজধানীর খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দাম আরও ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ানবাজার, মালিবাগ, শান্তিনগর ও খিলগাঁও বাজার ঘুরে এমনটাই দেখা গেছে। এদিন খুচরা বাজারে ভালো মানের দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ১৩০ টাকায়, মিয়ানমার ও মিসরের পেঁয়াজ ১২০ টাকায়। ৫ কেজির প্রতি পাল্লা বিক্রি হয়েছে ৫৬০ টাকায়। পাইকারি বাজারে দাম ছিল এর চেয়ে ১০ টাকা কম।

শ্যামবাজারে লাকসাম বাণিজ্যালয়ের পাইকারি ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান মনে করেন শুধু অভিযান চালালেই দাম কমবে না। তিনি বলেন, অভিযান করে কজনকে থামানো যায়? কজনকে জরিমানা করা যায়? লোভী ও ধূর্ত ব্যবসায়ীরা ঠিকই বেশিদামে বিক্রি করছে। জরিমানা ও শাস্তির চেয়ে গলাকাটা মুনাফার প্রতিই বেশি লোভ অসাধু ব্যবসায়ীদের।

পাইকারি বাজারের সব আড়তদার পেঁয়াজ পান না উল্লেখ করে এ ব্যবসায়ী আরও বলেন, যারা সিন্ডিকেটে জড়িত, তারাই মূলত বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ পাচ্ছেন। অন্যরা পেলেও কম। হাতেগোনা ১০-১২ জন আড়তদার পেঁয়াজ পাচ্ছেন। আমাদেরও তাদের কাছ থেকে পেঁয়াজ কিনতে হয়। আমদানিকারকদের নির্ধারিত দামেই বিক্রি করতে হয় পেঁয়াজ।

অভিযান প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিং কমিটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিনিধি মো. আবদুর রব আমাদের সময়কে বলেন, পেঁয়াজের বাজারে চলমান অসঙ্গতি ও অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের কারসাজি রুখতেই নিয়মিত এ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। অভিযানের ফলে ব্যবসায়ীরা কারসাজি থেকে বিরত থাকছেন। অভিযানের পর ব্যবসায়ীদের কারসাজি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সমিতি।

অভিযানের ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে দাবি করে তিনি আরও বলেন, জনস্বার্থে অভিযান চলবে। দাম ইতোমধ্যেই কমতে শুরু করেছে। আশা করছি, শিগগির বাজার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

কারওয়ানবাজারের বিক্রমপুর বাণিজ্যালয়ের পাইকারি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফয়েজ বলেন, শুধু অভিযান নয়, কারসাজির হোতা যেসব আমদানিকারক, তাদেরও মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। কি পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে, সেটা জানা থাকলেও, দেশের ভেতর কোথায় কতটুকু পেঁয়াজ সরবরাহ হচ্ছে, কোন বাজারে কতটুকু পেঁয়াজ ঢুকছে, কত দামে ঢুকছেÑ এসব বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তবেই না ধরা পড়বে প্রকৃত কারসাজিবাজরা।

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান আমাদের সময়কে বলেন, অভিযান হয়তো কিছুসংখ্যক অসাধু ব্যবসায়ীদের রুখবে। কিন্তু গোটা বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। আর দফায় দফায় বড় মাপের আমদানি করা হলে হয়তো পেঁয়াজের সরবরাহ হঠাৎ বাড়বে। কিন্তু সেটা স্থায়ী নয়। এর সমাধানে অভিযান চলমান রাখতে হবে বটে। তবে সবার আগে বাজারে নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণ পেঁয়াজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দফায় দফায় নয়। এরও আগে দেশের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

এদিকে খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সহসা পেঁয়াজের দাম ১০০ টাকার নিচে নামার সম্ভাবনা দেখছেন না। তিনি বলেছেন, মিসর থেকে ৫০ হাজার টন পেঁয়াজ এলেও দাম সামান্য কমতে পারে। এর পরও ১০০ টাকার নিচে নামার সম্ভাবনা নেই।

বাণিজ্যমন্ত্রী গতকাল বলেন, আমরা চেষ্টা করছি। তবে ক্রেতারা পেঁয়াজ ১০০ টাকার নিচে কিনতে পারবেন, আপাতত এমন সম্ভাবনা নেই। এ মাসের শেষের দিকে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ বাজারে এলে দাম কমবে। এর আগে হয়তো সম্ভব না।

advertisement