advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ধর্ষণ রোধে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন

৯ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ৯ নভেম্বর ২০১৯ ০০:১৪
advertisement

ধর্ষণের মাত্রা বড় না হলে আলোচিত হয় না, জমে না বাগাড়ম্বর আলোচনা। কিন্তু সমাজে ধর্ষণ যে প্রতিনিয়ত হচ্ছে এবং দিনকে দিন বেড়েই চলছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

বলতে গেলে, অর্থনীতির সব সূচকেই আমরা দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু অর্থনীতির বাইরে সামাজিক ও সভ্যতার সূচকে লজ্জিত হচ্ছি। নিরাপদ ও নিশ্চিত জীবন উন্নত জীবন-মানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু আমরা দেখছি, আমাদের সমাজে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নানাভাবে আক্রান্ত। শিশু ও নারীরা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। শিশুরা ঘরে-বাইরে এমনকি কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কতিপয় শিক্ষক দ্বারাও নানা নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। নারীরা কর্মক্ষেত্রে বা গণপরিবহনে কিংবা সড়কে নিশ্চিত ও নিরাপদ নয়। এমনকি নিজের ঘরেও নিরাপদ নয়। আর এই নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে ধর্ষণ বা যৌন হয়রানি। বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের বরাতে ৮ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের (২০১৯) জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে বাংলাদেশে ৩৯৯ শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ধর্ষণের পর এক ছেলে শিশুসহ মোট ১৬ জন শিশু মারা গেছে। পরিসংখ্যানই বলছে, পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক, তা আর ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। বেসরকারি সংস্থা নারীপক্ষ বলছে, তারা এক গবেষণার অংশ হিসেবে ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ছয়টি জেলায় ধর্ষণের মামলা পর্যবেক্ষণ করেছে। এ গবেষণাটির পরিচালক এবং নারীপক্ষের প্রকল্প পরিচালক রওশন আরা বলেন, ‘এ সময়ে ৪৩৭২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে, কিন্তু সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচজনের।’ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে ৬৩০ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ সময় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ নারীকে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশকেন্দ্রের (আসক) ছয় মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। সমাজে প্রতিনিয়ত দেখছি, শিক্ষকের দ্বারা শিক্ষার্থীরা যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। রেহাই পাচ্ছে না বাবার লালসা থেকে মেয়েও। ধর্ষণ হচ্ছে, হচ্ছে ধর্ষণের পর মৃত্যুর ঘটনাও। ঘটনার পরিক্রমায় সোচ্চার হচ্ছে নাগরিকরা, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সুরাহা কিংবা পরিত্রাণ মিলছে না। এর কারণ কী? আসল গলদাটাই বা কোথায়? উত্তরে আসতে পারে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। গায়ের জোরে পার পেয়ে যাওয়া। বাংলাদেশে আইনে দুর্বলতার কারণে ধর্ষণের মামলায় অনেক অভিযুক্ত পার পেয়ে যাচ্ছে বলে মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ।

ফলে দেশব্যাপী শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় সচেতন দেশবাসী ও অভিভাবক মহল আজ রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বাসে-লঞ্চে, পথে-ঘাটে, মাঠে কোথাও আজ যেন শিশুরা নিরাপদ নয়। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের (২০১৯) এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনে সারাদেশে ৪৭টি শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশে প্রতিবছর এক হাজারেরও বেশি নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। শুধু চলতি বছরেই নয়, বিগত বছরগুলোতেও দেশে শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের চিত্র ছিল ভয়াবহ। গত বছর (২০১৮) ধর্ষণের শিকার হওয়া মোট ৩৪৫টি সংবাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৩৫৬, যার মধ্যে মারা গেছে ২২ জন এবং আহত হয়েছে ৩৩৪ জন। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালের শুরু থেকে ২০১৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত এ দেশে ৯৫০-এরও বেশি শিশু নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। প্রতিনিয়ত এই ঘৃণ্য অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, সারাদেশে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলছে শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা ও নির্যাতন। দেশব্যাপী শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় সচেতন দেশবাসী ও অভিভাবক মহল আজ রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বাসে-লঞ্চে, পথে-ঘাটে, মাঠে কোথাও আজ যেন শিশুরা নিরাপদ নয়। এ অবস্থায় শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যা বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এ অবস্থা আরও ভয়ানক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের (২০১৯) এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনে সারাদেশে ৪৭টি শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশে প্রতিবছর এক হাজারেরও বেশি নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।

ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯ ধারা মোতাবেক ধর্ষণের অপরাধে যেসব শাস্তির বিধান রয়েছে তা হচ্ছেÑ ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে ধর্ষণকারীর জন্য রয়েছে মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- এবং এর অতিরিক্ত কমপক্ষে এক লাখ টাকা অর্থদ-। একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে ধর্ষণকালে বা ধর্ষণের পর যদি তার মৃত্যু ঘটে, তবে ওই দলের সবার জন্যই এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে। ধর্ষণের চেষ্টা করলে ধর্ষণকারীর সর্বোচ্চ ১০ বছর ও সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদ- এবং এর অতিরিক্ত অর্থদ-েরও বিধান রয়েছে। কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানো বা আহত করার চেষ্টা করলে ধর্ষণকারী যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ-ে দ-িত হবে এবং এর অতিরিক্ত অর্থদ-েও দ-িত হবে। তবে শিশু ধর্ষণ বা নির্যাতন বা হত্যা বিষয়ে মামলা করে বিচার পাওয়ার চেয়ে সমাজে যেন এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই না ঘটে সে ব্যবস্থা নেওয়া অতি জরুরি। কারণ চৎবাবহঃরড়হ রং নবঃঃবৎ ঃযধহ পঁৎব ধর্ষণের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদের দর্শন ও নৈতিক মনোবৃত্তির উন্নয়ন ঘটাতে হবে, আমাদের মনের অশুভ চিন্তা বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে সম্মিলিত কণ্ঠে প্রতিবাদ হওয়াটা খুবই জরুরি। ধর্ষকরা অনেক সময় শাস্তি পায় না বলেই পরবর্তী সময়ে তারা আবারও একই কাজ করে। আর তাদের দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হয়। এভাবে চলতে থাকলে এ সমাজ, দেশ ও জাতি কলুষিত হবে। দেশ পরিণত হবে এক মগের মুল্লুকে। যাচ্ছেতাই হতে থাকবে।

রুকসানা রহমান : ব্লগার

advertisement