advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক

৯ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ৯ নভেম্বর ২০১৯ ০০:১৪
advertisement

কারও অতি ভালোতেই যেমন পুরো সমাজকে ভালো বলা যায় না, তেমনি প্রতিনিয়ত নষ্টচিন্তায় আবিষ্ট থাকা কতিপয় খারাপ ব্যক্তিত্বের জন্যও গোটা সমাজ নষ্ট হয় না। মানুষ যেহেতু সমাজ-রাষ্ট্রে বসবাস করে, সেহেতেু সমাজ-রাষ্ট্রের কর্ণধার এবং ক্ষমতাচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্তদের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি মানুষকে বেশি প্রভাবিত করে। রাজনীতির ‘ক্ষমতা তত্ত্বে’ও অনেকটা সে কথা বলা হয়েছে। এ ধারণাও বিদ্যমান যে, বাংলাদেশের কিছু ক্ষমতাধর মানুষ ভালো হয়ে উঠলে গোটা সমাজও ভালো হয়ে উঠবে। রাষ্ট্রব্যবস্থাধীন সমাজ-মূল্যবোধের কারণে এই কিছু মানুষের মধ্যে শাসনক্ষমতা ও রাজনীতি-সম্পৃক্তরা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই অল্পসংখ্যক ব্যক্তিত্ব যদি ভালো হনÑ ভালো মানুষের সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ যদি সহজ ও সম্প্রসারিত হয়, তা হলে গোটা সমাজে একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সাম্প্রতিক সরকারি দলে ‘ভালো’ বা ক্লিন ইমেজ’ বৈশিষ্ট্যের ব্যক্তিত্বদের রাজনীতিতে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া বেশ আলোচিত হচ্ছে, যার প্রধান উদ্যোক্তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলেও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবলম্বন করে গোটা সমাজ-রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। বর্তমান বাংলাদেশের অগ্রগতির মূল কা-ারিও তিনি। তার উদ্ভাবনী নেতৃত্বে মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের খবর যে হারে বহির্বিশে^ প্রচারিত হচ্ছে, সে হারে অভ্যন্তরীণ নীতি-নৈতিকতার খবর প্রচারিত হচ্ছে না। অবশ্য নারী নির্যাতন, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস কমার হারও সন্তোষজনক নয়।

দুর্নীতি উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। শতাব্দী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রেও দুর্নীতি বাধাস্বরূপ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মনে করেন, যদি দুর্নীতি প্রতিরোধ করা যেত, তা হলে দেশের উন্নয়ন আরও গতিশীল হতো। নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮ ঘোষণায়ও তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলেছিলেন। ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর তখনকার বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেছেন, ‘দেশের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি নির্মূল করতে পারলে জিডিপি ২ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হবে।’ ২০১৮ সালের ৯ ডিসেম্বর দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, ‘দুর্নীতি বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ২ থেকে ৩ শতাংশ গ্রাস করেছে।’ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি অনুষ্ঠানেও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দুর্নীতিবাজ এবং অসৎ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে। ‘... সে যে-ই হোক না কেন, আমার দলের হলেও তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ অপরাধমূলক কর্মকা- থেকে বাঁচার জন্য কেউ যেন বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা পরিবারের নাম ভাঙাতে না পারে, সে জন্য কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল তার পরিবারের সদস্যদের তালিকাও প্রকাশ করেছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রায় এক যুগ আগেও দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের তালিকার অন্যতম শীর্ষস্থানে ছিল বাংলাদেশ। বর্তমানে এ অবস্থা নেই। উপরন্তু বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ করে শেখ হাসিনা সফলতার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন। ‘শেখ হাসিনা’র আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সরকারপ্রধান ‘সততার টাইটেল’ বা ‘সৎ শাসক’-এর স্বীকৃতি পাননি। বরং শেখ হাসিনার নিয়মানুবর্তিতা, জীবন-দর্শন-আদর্শ ও ব্যক্তিগত সংস্পর্শে এসে অনেক আমলা, নেতাকর্মী সৎ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘতম সময় ও বিশে^র ইতিহাসে দীর্ঘমেয়াদি নারী শাসকের অন্যতম হয়েও শেখ হাসিনা সাদাসিধা, পরিচ্ছন্ন ও সৎ বাঙালির জীবনযাপন করছেন। অসৎ ব্যক্তিদের দৌরাত্ম্যে সমাজে সৎ মানুষের কঠিন জীবনযাপন প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তিনি অবগত আছেন, কথা বলেছেন। গোটা বিশে^র বুদ্ধিভিত্তিক শাসকের অন্যতম শেখ হাসিনার কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ দেশের মেহনতি শ্রমিক, কৃষক, তরুণ ও শান্তিপ্রিয় জনগণকে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে নতুনভাবে শানিত করছে।

আশার কথা, ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসা রাজনীতি করা ছাত্রটি আজও পথেঘাটে শিক্ষকদের সালাম দেয়, নিজের আসনটি ছেড়ে দেয়। লোকাল বাস-ট্রেন, স্থানীয় বাজার, শ্রমিকের ঘাম ও কৃষকের ফলনে আজও বাঙালির সরল-সততার জীবনচিত্র পরিস্ফূট হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে খবরের শিরোনাম ও প্রচারে আনা যেতে পারে। কারণ বাংলাদেশ একটি মানবিক রাষ্ট্র। মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের আলোকেই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ হয়েছিল। তবে সে সময়ে দেশের ৮৫ শতাংশ মানুষ ছিল দরিদ্র। বর্তমানে দেশে দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ (বিবিএস জরিপ ২০১৬)। তখনকার অধিকাংশ তরুণ তিনবেলা খেয়ে বাঁচার নিশ্চয়তা খুঁজত। কথায় আছে, এখনকার তরুণরা খেয়েদেয়ে চাঁদে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখে। বাঙালির অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে নৈতিক ও মানবিক উন্নয়নের সামঞ্জস্যহীনতার বিষয়টি নিয়েও গবেষণা প্রয়োজন।

১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশেনে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় প্রদত্ত ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘... মনে রাখতে হবে, শুধু জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হতে পারি, গড়ে তুলতে পারি উন্নততর ভবিষ্যৎ।’ বাংলার মানুষের ক্ষোভ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা, অপমান, জেদ, অহং, সংযম, স্বপ্ন, প্রতিরোধ, সংকল্প সমন্বিতভাবে বেজে উঠছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আচার-আচরণ, চলন-বলন ও কর্মে। সাধারণ মানুষের বিশ^াস জন্মেছে, শেখ হাসিনা সৎ ও যোগ্য শাসক, সমাজের বৃহত্তর ঐক্যের প্রতীক। তিনিই মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশের বাতিঘর, দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলার ভরসা। তাই সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে শাসনক্ষমতার সংস্পর্শে থাকা দুর্নীতিমুক্ত ব্যক্তিত্বসহ দেশের পরিকল্পনাবিদ, চাকরিজীবী, বুদ্ধিজীবী, তাত্ত্বিক, গবেষকদের অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া প্রয়োজন। তবেই সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশ হবে সত্যিকার অর্থে সোনার বাংলা। কাম্যও তাই।

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

advertisement