advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মোবাইল ফোনের পেছনের গল্প

শামস্ বিশ্বাস
৯ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৯ নভেম্বর ২০১৯ ০০:১৫
advertisement

দুই দশক আগেও

মোবাইল ফোন সম্পর্কে আমাদের ধারণা ছিল খুবই সীমিত। পত্রপত্রিকায় এই বিস্ময়কর যন্ত্রের খবর মাঝে মধ্যে থাকত। আমাদের দেশেও ফোনটা আসছেÑ এটুকুই সাধারণ লোকে জানত। আজকে সে চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। হাতে হাতে এখন মোবাইল ফোন। মোবাইল ফোনের শুরুর ইতিহাস জানাচ্ছেনÑ শামস্ বিশ্বাস

মোবাইল ফোনের শুরুর কথা

মোবাইল ফোন নিয়ে কিছু বলার আগে প্রথমেই টেলিফোন আর রেডিওর কথা বলে নেওয়া দরকার। ১৮৭৬ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে টেলিফোন উদ্ভাবন করেন অ্যালেকজান্ডার গ্রাহাম বেল। তার এক বছর বাদে বেল টেলিফোন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে টেলিফোন পরিষেবা দেওয়া শুরু করেন।

রেডিও আসে টেলিফোনের অনেক পর। প্রথম রেডিও স্টেশন চালু হয় ১৯২২ সালে। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি অসাধারণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। রেডিওর যেটা মস্ত বড় সুবিধা, সেটা হলো এটি তারবিহীন চলে। ঘরে-বাইরে যে কোনো জায়গা থেকেই রেডিও শোনা যায়।

রেডিওর উদ্ভাবন হতে না হতেই বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা উঠেপড়ে লাগলেন রেডিওর প্রযুক্তি ব্যবহার করে চলমান টেলিফোন ব্যবস্থা তৈরির প্রচেষ্টায়। কারণ টেলিফোন তারবিহীন হলে যে কোনো জায়গা থেকে টেলিফোন ব্যবহার সম্ভব হবে। অনেক গুণ বাড়বে টেলিফোনের উপযোগিতা!

১৯০৮ সালে প্রফেসর আলবার্ট ঝাঙ্কে এবং দ্য ওকল্যান্ড ট্রান্সকন্টিনেটাল এরিয়াল টেলিফোন অ্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি তারহীন টেলিফোন উদ্ভাবনের দাবি করে। কিন্তু একশ্রেণির মানুষ আছে, যারা সব সময় নতুনকে ভয় পায়। তাদেরই একজন মামলা ঠুকে দিল এদের বিরুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত তাদের অব্যাহতি দেওয়া হলেও তারহীন টেলিফোন উৎপাদনের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

বছর দশেক পর ১৯১৮ সালে জার্মান রেইল রোড সিস্টেম বার্লিন ও জোসেনের মধ্যে চলাচলকারী মিলিটারি ট্রেনে ওয়্যারলেস টেলিফোনি সিস্টেমের ওপর পরীক্ষা করে। ১৯২৫ সালে টেলিফোনি উপকরণ সরবরাহের জন্য জুগটেলিফোনি এজি নামক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯২৬ সালে হামবুর্গ ও বার্লিনের মধ্যকার চলাচলকারী ডয়েশে রিশবান ও জার্মান মেইল সার্ভিসের প্রথম শ্রেণির যাত্রীদের মধ্যে টেলিফোন সুবিধা প্রদান করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রেডিও টেলিফোনি সিস্টেমের ব্যবহার বেড়ে যায়। ১৯৪০ সাল থেকে বহনযোগ্য রেডিও ট্রান্সিভার্সের ব্যবহার শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোয় এ ধরনের ডিভাইসের ব্যবহার দেখা যায়। এই সময়ে অটোমোবাইলে মোবাইল টেলিফোন সুবিধা চালু হয়। কিন্তু এর আকার অনেক বড় ছিল এবং প্রচুর পাওয়ার কনজিউম করত।

এর পর মোবাইল ফোন আবিষ্কারের পথে হাজারো ব্যক্তির হাজারো প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। ১৯৬০ সালে মার্কিন টেলিকম সেবাদাতা এটিঅ্যান্ডটি (আমেরিকান টেলিকম অ্যান্ড টেলিগ্রাফ ইনকরপোরেশন) ‘কার টেলিফোন’ উদ্ভাবন করার পর মার্কিন বহুজাতিক টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি মটোরোলার ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী মার্টিন কুপার মোবাইল ফোনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তিনি এমন কিছু তৈরি করতে চাইলেন, যা একটি নাম্বারকে কোনো স্থান, ডেস্ক বা বাড়ির প্রতি নির্ধারিত না করে একজন ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট করতে পারবে।

১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল মার্টিন কুপার নিউইয়র্ক সিটির সিক্সথ এভিনিউতে হাঁটতে হাঁটতে প্রথমবারের মতো সেলুলার নেটওয়ার্কে ফোনকল করেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান বেল ল্যাবসের গবেষক জোয়েল এনজেলকে ফোন করে তিনি বলেন, তিনি একটি প্রকৃত সেলুলার টেলিফোন থেকে কথা বলছেন। জোয়েলের অফিসে সরাসরি ফোনকল করার এ ঘটনাটিই বিশ্বের প্রথম সেলুলার ফোন আলাপ। কুপারের আবিষ্কৃত ফোনের ওজন ছিল সোয়া এক কেজি, ফোনটি লম্বায় ছিল ১০ ইঞ্চি। প্রোটো টাইপ এই ডিভাইসে ১০ ঘণ্টা চার্জ দিয়ে একনাগাড়ে ৩০ মিনিট কথা বলা যেত। মোবাইল ফোন তৈরির জন্য তখন আলাদাভাবে কাজ করেছিলেন মার্টিন কুপার ও জোয়েল এনজেল। তবে শেষ পর্যন্ত বিজয়ের হাসি হেসেছিলেন কুপার। ওই সময় মটোরোলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন প্রযুক্তিবিদ জন মিশেল। তিনি একদিন কুপারের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, বিশ্বের প্রথম মুঠোফোন তৈরি করবে মটোরোলা আর আবিষ্কারক হবেন কুপার। কুপার সেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে জয়ী হয়ে গর্বিত করেছিলেন জন মিশেল ও তার প্রতিষ্ঠান মটোরোলাকে। একসময় কুপারের মোবাইল ফোনের পরিচিত দাঁড়ায় ব্রিক ফোন বা ইট আদলের ফোন।

বাংলাদেশে মোবাইল ফোন

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে যোগাযোগের বিশাল বড় বিপ্লব আনে মোবাইল ফোন প্রযুক্তি। তবে এই পরিবর্তনটা খুব সহজ ছিল না।

আশির দশকের শেষে চালু ছিল ‘পেজার’। স্মার্টফোনের নোটিফিকেশনের এই যুগে অনেকেই হয়তো জানেন না পেজারের কথা। আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগেও পেজার ছিল মানুষের যোগাযোগের ভালো এক মাধ্যম। ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে চালু হয় পেজার। ১৯৮০ সাল নাগাদ জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় যন্ত্রটি। মুঠোফোনের প্রচলন শুরু হওয়ায় দ্রুতই বাজার থেকে ছিটকে পড়ে পেজার। এটি এক ধরনের বার্তা পাঠানোর ছোট যন্ত্র, যা কোমরের বেল্টে বেঁধে অনেকেই ঘুরতেন।

ওই সময়েই ওয়াকিটকি ধরনের একটি মোবাইল ফোনও চালু হয়েছিল বাংলাদেশে। তখন এশিয়ার প্রথম মোবাইল অপারেটর হাচিন্সন তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে বাংলাদেশে। কিন্তু লাইসেন্স পেলেও সে সময় ঠিক মোবাইল ফোন নিয়ে বাজারে আসতে পারেনি হাচিন্সন এবং তাদের বাংলাদেশি সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (বিটিএল)’।

১৯৮৯ সালে বেতার যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন তিন ধরনের লাইসেন্স দিয়েছিল তখনকার বাংলাদেশ সরকার। সেগুলো হলোÑ পেজার, মোবাইল ফোন এবং নদী এলাকায় বেতার যোগাযোগব্যবস্থার লাইসেন্স। সেই সময় (১৯৮৯-৯০ সাল) রাজধানী ঢাকার রাস্তায় দু-একজনের হাতে থাকা বিস্ময়কর যন্ত্র ছিল এই নতুন ধরনের ফোন, যা নিয়ে লোকে চলাফেরা করতে পারে।

বছর দুয়েকের মধ্যে ১৯৯১ সালে সে লাইসেন্সগুলো বাতিল করে তৎকালীন সরকার। তবে বিটিএল ও হাচিন্সন আদালতে গেলে আদালত তাদের পক্ষেই রায় দেন। পরে অবশ্য হাচিন্সন ও বিটিএল তাদের মোবাইল ফোনসেবা প্রদানকারী লাইসেন্স বিক্রি করে দেয়।

সে সময় বাংলাদেশে একটি মোবাইল ফোন কোম্পানি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশের প্রথম মোবাইল ফোন কোম্পানি সিটিসেল। ১৯৮৯ সালে বিটিআরসি থেকে মোবাইল ফোন প্রবর্তনার জন্য তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বরাদ্দ লাভ করে। তখন থেকে সিটিসেল বাংলাদেশের একমাত্র সিডিএমএর মোবাইল সেবা প্রদানকারী অপারেটর হিসেবে ২০১৬ পর্যন্ত সেবা দেয়।

শুরুর দিকে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক শুধু ঢাকা শহর এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছিল। এর কিছুদিন পর মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত হয় বন্দরনগরী চট্টগ্রামে।

১৯৯৬ সালে তিনটি প্রতিষ্ঠান ‘গ্রামীণফোন, ‘একটেল (বর্তমানে রবি)’ ও ‘সেবা (বর্তমানে বাংলালিংক)’, জিএসএম প্রযুক্তির মোবাইল ফোন সেবা দেওয়ার জন্য লাইসেন্স পায়। দ্রুত এই সেবা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে। ১৯৮৯ সালে যে কয়েকশ ব্যবহারকারী নিয়ে মোবাইল ফোন চালু হয়েছিল বাংলাদেশে, দুই দশক পর ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে এসে তা দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটির বেশিতে।

এক নজরে মোবাইল ফোনের ইতিহাস

১৯৩০Ñ তৎকালীন আমেরিকার টেলিফোন গ্রাহকরা রেডিও কানেক্টিভিটির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারত। খরচ ছিল প্রতি মিনিট ৭ মার্কিন ডলার, যার বর্তমান মূল্য দাঁড়ায় মিনিটপ্রতি ৯২ মার্কিন ডলার।

১৯৪৬Ñ প্রথম মোবাইল টেলিফোন কল করা হয়।

১৯৪৭Ñ এটিঅ্যান্ডটি কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে মোবাইল টেলিফোন সার্ভিস চালু করে।

১৯৬৫Ñ এটিঅ্যান্ডটি মোবাইল টেলিফোন সার্ভিসে বড় একটা অগ্রগতি আনে। তখন নাম দেওয়া হয় আইএমটিএস (ইম্প্রুভড মোবাইল টেলিফোন সার্ভিস)। একটি কল সম্পন্ন হওয়ার জন্য ওয়েট করতে হতো মাত্র ৩০ মিনিট।

১৯৬৯Ñ পেন সেন্ট্রাল রেইল রোডের ২২৫ মাইল লম্বা নিউইয়র্ক-ওয়াশিংটন রুটে স্পেশাল পে ফোন চালু হয়, যা দিয়ে ট্রেনে চলাচলকারী যাত্রীরা ফোনকল করতে পারত।

১৯৭৩Ñ মটোরোলা ও বেল ল্যাবরেটরি যৌথ উদ্যোগে হ্যান্ডহেল্ড ফোন চালু করে। প্রথম মোবাইলটি ছিল আড়াই পাউন্ড ওজনের, ৯ ইঞ্চি লম্বা, ৫ ইঞ্চি উচ্চতা এবং ১ দশমিক ৭৫ ইঞ্চি প্রশস্ত। ১০ ঘণ্টা চার্জ দিয়ে ৩০ মিনিট কথা বলা যেত।

১৯৭৮Ñ ১জি নেটওয়ার্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিকভাবে চালু হয়। পরবর্তী সময়ে ইসরাইলে ১৯৮৬ সালে এবং অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৮৭ সালে চালু হয়।

১৯৯১Ñ প্রথম জিএসএম (গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশন) নেটওয়ার্ক চালু হয় ফিনল্যান্ডে।

১৯৯২-১৯৯৩Ñ এসএমএস (শর্ট মেসেজ সার্ভিস) সিস্টেম চালু হয় পারসন টু পারসন।

১৯৯৮Ñ ডাউনলোডেবল রিংটোন বিক্রি শুরু হয়।

১৯৯৯Ñ ইন্টারনেট সার্ভিস চালু হয়। জাপানে শুরু করে এনটিটি ডোকোমো।

২০০০- ফিনল্যান্ডে প্রথম এসএমএসের মাধ্যমে ডেইলি নিউজ হেডলাইন ফ্রিতে চালু হয়।

২০০২Ñ বাণিজ্যিকভাবে থ্রিজি (থার্ড জেনারেশন বা তৃতীয় প্রজন্ম) চালু হয়।

২০০৮Ñ ফোরজি (ফোর্থ জেনারেশন বা চতুর্থ প্রজন্ম) বা ওয়াইম্যাক্স নেটওয়ার্ক মোবাইলের জন্য প্রাথমিকভাবে চালু হয়।

কল্পনায় মোবাইল ফোন

পাঞ্চ ম্যাগাজিনে ১৯০৭ সালে ইংরেজ ক্যারিকাচারিস্ট লুইস বামারের একটি কার্টুন প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা যায় লন্ডনের হাইড পার্কে আলাদাভাবে একজন পুরুষ ও নারী তারহীন টেলিফোনসামগ্রী ব্যবহার করে জুয়া ও ডেটিংয়ে অংশ নিচ্ছে। এর প্রায় ১৯ বছর পর ১৯২৬ সালে স্যাটারিক্যাল জার্মান ম্যাগাজিন সিমপিলিসিসসিমাসে প্রকাশিত হয় চিত্রশিল্পী কার্ল আর্নল্ডের আঁকা রাস্তায় তারহীন টেলিফোন ব্যবহারের কল্পিত ছবি। এ ছবির শিরোনাম ছিল ‘তারহীন টেলিফোন’। মোবাইল ফোন সম্পর্কে প্রথম সার্থক ধারণা পাওয়া যায় ১৯৩১ সালে প্রকাশিত জার্মান ভাষায় লেখা এরিখ কাস্টনারের শিশুতোষ গ্রন্থ ‘দ্য থার্টিফিফথ মে, অর কনর্জাডস রাইড টু দ্য সাউথ সি’তে।

প্রথম বাণিজ্যিক মোবাইল

১৯৮৩ সালে মটোরোলা প্রথম তাদের বাণিজ্যিকভাবে মটোরোলার ডায়নাট্যাক ৮০০০এক্স মডেলের মোবাইল ফোন বাজারজাত করে। ফোনের স্পেসিফিকেশন ছিল ৩০ মিনিট কথা বলার ক্ষমতা, ৬ ঘণ্টা স্ট্যান্ড বাই এবং ৩০টি ফোন নম্বর সংরক্ষণের ব্যবস্থা। দাম ছিল ২ হাজার ৬৩৯ ব্রিটিশ পাউন্ড (৩ হাজার ৯৯৫ মার্কিন ডলার)।

advertisement