advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মধ্যরাতের টকশোতে ক্ষমা চাইলেন রাঙ্গা

নিজস্ব প্রতিবেদক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
১২ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০১৯ ০২:০৯
advertisement

শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার জেরে শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা। গতকাল মধ্যরাতে বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলের টকশোতে সকলের কাছে ক্ষমা চান তিনি। বলেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মারা যাওয়ার পরও তাকে যেভাবে অপমান করা হয়, সে ক্ষোভ থেকেই বিতর্কিত কিছু শব্দ ব্যবহার করে ফেলেছিলাম আমি। এ সময় তিনি প্রশ্ন তোলেন, এক সঙ্গে জোট করে এরশাদকে স্বৈরাচার বলা কতটা যৌক্তিক। এ বিষয়ে বিহিত করতে শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ

চাইবেন বলেও জানান রাঙ্গা।
গতকাল সন্ধ্যায়ও তিনি শহীদ নূর হোসেনের পরিবারের সবার কাছে ক্ষমা চান এবং দুঃখ প্রকাশ করেন ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। তিনি বলেন, নূর হোসেন ইয়াবা বা ফেনসিডিল আসক্ত নয়, মানসিক ভারসাম্যহীন ছিল। আমি ওই শব্দ দুটি প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। তার পরিবারের কাছে দুঃখ ও ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
ইতিপূর্বের খবরে বলা হয়, স্পর্ধিত বুকে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ আর পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ সেøাগান উৎকীর্ণ নূর হোসেনের স্মরণে গত রবিবার দেশব্যাপী পালিত হয় ‘শহীদ নূর হোসেন দিবস’। এ দিন রাজধানীর বনানীতে জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনাসভায় নূর হোসেন সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছেন দলটির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। নূর হোসেনের পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জাপা মহাসচিব যেন প্রকাশ্যে জাতির কাছে ক্ষমা চান। একই সঙ্গে তাকে জাতীয় সংসদ থেকেও বহিষ্কারের
দাবি জানানো হয়। আর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নিজ প্রাণ বিসর্জনকারী এ যুবকের মা বলেছেন, তিনি রাঙ্গার বিচারের দাবিতে মামলা করবেন। এর বাইরে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ঘোষণা দিয়েছে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দল থেকে রাঙ্গাকে বহিষ্কার না করলে জাপা কার্যালয় ঘেরাও করা হবে। রাঙ্গার এমন মন্তব্যের নিন্দা জানিয়ে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না গতকাল জাপা মহাসচিব রাঙ্গাকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে জাপা মহাসচিবের সমালোচনা এবং তাকে নিয়ে নানা বক্রোক্তি।
গত রবিবার বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনাসভায় মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কাকে হত্যা করলেন? নূর হোসেনকে? নূর হোসেন কে? একটা অ্যাডিকটেড ছেলে। একটা ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর।’
মশিউর রহমান রাঙ্গার কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের প্রতিবাদে গতকাল বেলা ৩টা থেকে নূর হোসেনের মা, তিন ভাই, এক বোন, দুই ভাতিজা, মামা অবস্থান নেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে। নূর হোসেনের বড়ভাই মো. আলী হোসেন আমাদের সময়কে জানান, সন্ধ্যায় তাদের কর্মসূচিতে সংহতি জানায় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। তিনি বলেন, সে (নূর হোসেন) গণতন্ত্রের জন্য মারা গেল। এখন তার সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ কথা বললেন মসিউর রহমান (রাঙ্গা)। আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে রাঙ্গার বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ায় তাকে (রাঙ্গা) প্রকাশ্যে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। একই সঙ্গে তাকে জাতীয় সংসদ থেকেও বহিষ্কারের দাবি জানাচ্ছি।
মো. আলী হোসেন আরও বলেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যে মারা গেল, তাকেই অবমাননা করায় রাঙ্গার বিচার চাই। নূর হোসেন হত্যাকা-ের জন্য স্বৈরাচার এরশাদ নিজেই সংসদে বসে মাফ চেয়েছিলেন, আমার বাবার কাছে মাফ চেয়েছিলেন।
বড় ছেলের পাশেই বসা শহীদ নূর হোসেনের মা মরিয়ম বিবি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। রাঙ্গার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমার ছেলে দেশের জন্য শহীদ হয়েছে। আজ তাকে কী সব খারাপ খারাপ কথা বলা হচ্ছে। যে লোক আমার ছেলেকে ইয়াবাখোর বলেছেন, তার বিচার জনগণের কাছে ছেড়ে দিলাম। মসিউর রহমান রাঙ্গার বিরুদ্ধে আমি মামলা করতে রাজি আছি। তাকে জাতীয় সংসদ থেকে বহিষ্কারের দাবি করছি। তার বিচার না হলে এখান থেকে যাব না।
এদিকে রাঙ্গার বক্তব্যের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। কর্মসূচি শেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে নূর হোসেনের পরিবারের সঙ্গে অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।
মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনেট মাহমুদ বলেন, আমরা নূর হোসেনের পরিবারের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছি। পাশাপাশি মশিউর রহমান রাঙ্গাকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দল থেকে বহিষ্কার না করলে এবং তিনি নিজে জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা না চাইলে জাতীয় পার্টির কার্যালয় ঘেরাও করা হবে। এ ছাড়া তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল ও দেশের রাজনৈতিক কার্যক্রমে রাঙ্গাকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করার দাবিও জানিয়েছি।
শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে রাঙ্গার মন্তব্যর জেরে সমালোচনার ঝড় বইছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। অনেকেই রাঙ্গাকে নিয়ে বক্রোক্তিও করছেন।
ডাকসুর নিন্দা : ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান
গণতন্ত্রের জন্য শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্যের জন্য জাপা মহাসচিবকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। গতকাল সোমবার ডাকসুর স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
ডাকসুর বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের উপস্থিতিতে জাতীয় পার্টির মহাসচিব রাঙ্গা শহীদ নূর হোসেনকে ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর বলে যে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের একজন শহীদকে যেভাবে অপমান ও অশ্রদ্ধা করেছেন, ডাকসু তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়।
একই সঙ্গে মসিউর রহমান রাঙ্গাকে তার এ বক্তব্য প্রত্যাহার ও জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানায়। তার এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করা গণতন্ত্রকামী প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।

advertisement