advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শ্রমিক নেতা নুরুল হত্যা মামলার এজাহার বদলে দেয় পুলিশ

কবির হোসেন
১২ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০১৯ ০৯:৪৮
নুরুল ইসলাম
advertisement

রাজশাহী জেলার পুঠিয়ার শ্রমিকনেতা নুরুল ইসলাম হত্যামামলার এজাহার বদলে ফেলার অভিযোগের সঙ্গে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়িত বলে দাবি করা হয়েছে এ সংক্রান্ত বিচারিক তদন্ত প্রতিবেদনে। জেলা পুলিশের তিনজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পুঠিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও থানার ইন্সপেক্টরকে (তদন্ত) দায়ী করা হয়। প্রতিবেদনটি আজ মঙ্গলবার হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে উত্থাপিত হতে পারে বলে জানা গেছে।

রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের পাঠানো ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এজাহার দায়েরের কারসাজির বিষয়ে পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা রয়েছে বলে স্বাভাবিকভাবে প্রতীয়মান হয়। তার জবানবন্দি গ্রহণের সময় জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মো. মাহমুদুল হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মু. মতিউর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পুঠিয়া সার্কেল) মো. আবুল কালাম সাহিদ ও ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মহিনুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। ফলে এজাহার কারসাজির বিষয়ে তারাও দায় এড়াতে পারেন না। তা ছাড়া সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ গ্রহণ করেছেন মর্মে জবানবন্দি দিয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এর সঙ্গে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও জড়িত আছেন বলে প্রতীয়মান হয়।’ প্রতিবেদনে তিন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পুঠিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাকিল উদ্দিন আহমেদ ও ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে আদেশ প্রদানের সুপারিশ করা হয়েছে।

আইনজীবীরা জানান, গত ২৪ এপ্রিল পুঠিয়া সড়ক পরিবহন মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে নুরুল ইসলাম ও আবদুর রহমান পটল সাধরণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে পটলকে সাধরণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এ ফল বাতিল চেয়ে নুরুল ইসলামসহ তিনজন রাজশাহী আদালতে মামলা করেন। মামলায় বলা হয়, নুরুল ইসলাম ৬০২ ভোট ও পটল ৫২০ ভোট পান। কিন্তু এ ফল পাল্টে পটলকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে।

এ মামলার বিরোধের জের ধরে গত ১০ জুন নিখোঁজ হন নুরুল ইসলাম। পরদিন ১১ জুন সকালে পুঠিয়ার কাঁঠালবাড়িয়া এলাকার ‘এসএস ব্রিকফিল্ড’ নামক ইটভাটা থেকে নুরুল ইসলামের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে নিগার সুলতানা ওইদিনই থানায় এজাহার দাখিল করেন। এজাহারে পুঠিয়া সড়ক পরিবহন মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ার সঙ্গে ওসি শাকিল উদ্দিনের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়। নিগার সুলতানার এজাহার গ্রহণ না করে ওসির সম্পৃক্ততার কথা বাদ দিয়ে থানা থেকে এজাহার সংশোধন করতে বলা হয়।

থানার কথামতো নিগার সুলতানা ওসির নাম বাদ দিয়ে মূল হত্যাকারী হিসেবে আবদুর রহমান পটলসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে এজাহার দাখিল করেন। থানা সেই এজাহার রেখে দেয়। পরে ওই রাতে নিগার সুলতানাকে থানায় ডেকে নিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে দেয়। এর পর থানা থেকে কোনো তৎপরতা না দেখে নিহতের স্ত্রী সাজেদা বেগম গত ১৩ জুন পুঠিয়া উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করেন। এ মামলায় আবদুুর রহমান পটলসহ ৬ জনকে আসামি করা হয়। এ মামলাকে এজাহার হিসেবে গণ্য করার নির্দেশনা চাওয়া হয়। এ সময় পুঠিয়া থানা থেকে নিগার সুলতানার স্বাক্ষর করা একটি এজাহার নিয়ে আসে থানাপুলিশ। তাতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি দেখানো হয়। ওই এজাহারে সন্দেহজনক হিসেবে ৫ জনের নাম বলা হয়। এ এজাহারের বিষয়ে তখনই নিগার সুলতানা ও তার মা সাজেদা বেগম আপত্তি জানিয়ে বলেন, এ এজাহার তাদের নয়। পরবর্তী সময়ে নিহত নুরুল ইসলামের পরিবারের পক্ষ থেকে ১৮ জুলাই আইজি, রাজশাহী রেঞ্জের পুলিশের ডিআইজি ও রাজশাহীর এসপির কাছে এজাহার বদলে ফেলার অভিযোগ দাখিল করা হয়। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রাজশাহীর পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাকিল উদ্দিন আহমেদ বাপ্পির বিরুদ্ধে শ্রমিকনেতা নুরুল হত্যামামলার এজাহার বদলে ফেলার অভিযোগের বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে রুল জারি করে রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে ওই অভিযোগ তদন্ত করে ৪৫ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

সূত্র জানিয়েছে, রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের করা তদন্ত প্রতিবেদনটি গত সপ্তাহে হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার অফিসে পৌঁছায়। এ হত্যাকা-ে ছয়জন আসামি জড়িত থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এজাহারে কেন অজ্ঞাতনামার কথা বলা হয়েছে, তা বোধগম্য নয় উল্লেখ করে বিচারিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়Ñ যেহেতু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হত্যার ঘটনা, সে ক্ষেত্রে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও স্বার্থসংশ্লিষ্টরা জড়িত থাকতে পারে মর্মে এজাহারকারী সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সে ক্ষেত্রে অজ্ঞাতনামা উল্লেখ করে মামলা দায়েরের কোনো কারণ থাকতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অতিউৎসাহী ভূমিকা রয়েছে মর্মে দেখা যায়। ভিকটিম নুরুল ইসলামের পরিবার তার হত্যার বিচারের জন্য নিগার সুলতানার অভিযোগমতে যদি এজাহার গ্রহণ করত, তবে দুদিন পর পুনরায় একই অভিযোগে তার মায়ের মামলা করার আবশ্যকতা থাকত না। ভিকটিম নুরুল ইসলামের লাশ ১১ জুন সকাল ১০টায় পুলিশ উদ্ধার করার দীর্ঘ সময় পর রাত সাড়ে ১১টায় এজাহার নেওয়া হয়। এ বিলম্বের কোনো কারণ পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে হাইকোর্টের কাছে তিন দফা সুপারিশ তুলে ধরেছেন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। নিগার সুলতানার দায়ের করা এজাহারের কপিকে এজাহার হিসেবে রেকর্ড করতে নির্দেশনা প্রদান, তিন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ইন্সপেক্টর মমিনুল ইসলাম (তদন্ত) ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাকিল উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং থানায় এজাহারপ্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে রেকর্ডিং অফিসার এজাহারকারীকে সময় ও তারিখ উল্লেখ করে প্রাপ্তি স্বীকারের সুপারিশ করা হয়েছে।

advertisement