advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ঝড় লাগে সুন্দরবনে মানুষ মরে লোকালয়ে

গওহার নঈম ওয়ারা
১৩ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০১৯ ০৪:২৮
advertisement

দুর্বল বুলবুল হঠাৎ চাকরি হারানো মনখারাপ আটপৌরে প্রবীণের মতো ধীরে-সুস্থে আছড়ে পড়লেও ক্ষয়ক্ষতি একদম কম নয়। কোথাও কোথাও বুলবুল শাব্দিক অর্থেই পাকা ধানে মই দিতে পেরেছে। এখনো মাছ ধরার ট্রলারের সব জেলের ও পণবন্দি শ্রমিকের নিরাপদে উপকূলে বা ঘাটে ফেরার খবরের অপেক্ষায় আছে স্বজনরা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও উড়িষ্যা রাজ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২-তে দাঁড়িয়েছে (পশ্চিমবাংলা ১০, উড়িষ্যা ২)।

বাংলাদেশে ডুবে যাওয়া ট্রলারের ১০ জেলের লাশ মিলেছে। গাছ ও ঘর ভেঙে চাপা পড়ে মারা গেছে আরও ১৬ জন। বাগেরহাট, বরিশাল, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, মাদারীপুর ও বরগুনার এসব মৃত্যু যোগ করলে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬।

নৌকা বা ট্রলারডুবি ছাড়া বেশিরভাগ (৯৬.১২%) মানুষ মারা গেছে গাছচাপা আর ঘরচাপা পড়ে। শরণখোলা বন অফিসের কাছাকাছি যারা থাকেন তারা জানিয়েছেন, সুন্দরবনের গাছপালা মোটামুটি ঠিক আছে। ঠিক থাকারই কথা। সাতক্ষীরার শ্যামনগর দিয়ে বুলবুল যখন বাংলাদেশে ঢোকে তখন সে অনেকটাই শ্রান্ত-পরিশ্রান্ত ছিল, ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটারের বেশি তেজ তার ছিল না। সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পেতে সময় লাগবে।

তাদের হিসাবের পদ্ধতি আলাদা। আগে বনে কারফিউ দেবে তার পর গুনতে বসবে। মানুষ যেন না দেখে। সিডরের পর যেমন বলেছিল এবারও বন কর্তৃপক্ষ তাই বলছে। সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ আগের অবস্থায় ফিরে আনার জন্য সাময়িকভাবে সুন্দরবনে সাধারণের প্রবেশাধিকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বন কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে বনের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে নানা উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড়ে বন বিভাগের কিছু ক্যাম্প, কাঠের পন্টুন, জেটি, ওয়াকওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক গাছপালার ডাল ভেঙেছে। তবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি বা বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে সেটা এখনই বলা যাবে না। এজন্য তাদের ৬৩টি ক্যাম্প, ১৬টি স্টেশন ও ৪টি রেঞ্জের কর্মীরা ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ শুরু করেছেন। আর এদের সমন্বয় করবেন সুন্দরবন পূর্ব ও সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের কর্মকর্তারা। আমরা ফলাফলের অপেক্ষায় থাকলাম।

তবে যে বেগে শেষ পর্যন্ত ঝড় হয়েছে সে বেগের ঝড় আশ্বিন-কার্তিক মাসের জন্য স্বাভাবিক। বাগেরহাটের (বগি সাউথখালি শরণখোলা) ইব্রাহিম শেখ যেমনটি বলেছিলেন। চার নম্বর সতর্কের পর তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি হেসে উল্টা জানতে চেয়েছিলেন, ‘তুমি দেখি সাহেব হ্যে গেচো কাইত্যান ভুললে গেচো’ কার্তিক মাসের অমাবস্যা-পূর্ণিমার আগে-পরে দুই-তিন দিনের ধান শোয়ানো বৃষ্টি হাল্কা ঝড় বাতাস শীতকে টেনে আনে। সেটাকেই কাইত্যান বলে। কোনো কোনো কার্তিক মাসে দুইটা কাইত্যানের খবর হতে পারে, হয়। ইব্রাহিম শেখ খুব পষ্ট করে বলেছিলেন, তেমন কিছু হবে না। পূর্ণিমার ম্যালা দেরি তার আগেই ‘হুমড়ি খাবিনি’ (পড়ে যাবে)। বড়জোর দু-একটা ডালপালা ভাঙবে। ‘আমাগেরও খড়ি দরকার’। কিন্তু ইব্রাহিম শেখের কাইত্যানের চেয়ে ভারী ছিল বুলবুল। এতগুলো প্রাণ গেল!

ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গে খবর আসতে থাকে-ঘূর্ণিঝড়ে গাছের চাপা পড়ে নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক ইউনিয়নের দেওজুড়ি গ্রামের মৃত জমিরুদ্দিন ছৈয়ালের ছেলে আলী ছৈয়াল (৬৮) ও ডামুড্যা উপজেলার বড় শিধুলকুড়া গ্রামের আজগর ঘরামির স্ত্রী আলেয়া বেগম (৪৮) নিহত হয়েছেন।

দাকোপ উপজেলার দক্ষিণ দাকোপ গ্রামের প্রমীলা ম-ল (৫২) গত রবিবার সকালে তীব্র ঝড়ের মধ্যে সাইক্লোন শেল্টার থেকে নিজ বাড়িতে প্রয়োজনীয় জিনিস নিতে আসেন। তিনি ঘরে ঢোকার পর গাছ ঘরের ওপর ভেঙে পড়লে তিনি ঘরচাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

রবিবার দুপুরে গাছচাপা পড়ে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার খাটিয়াগড় গ্রামের মাঝু বিবি (৬৭) ও কোটালীপাড়া উপজেলার বান্ধাবাড়ী গ্রামের সেকেল হাওলাদার (৭০) নিহত হয়েছেন। যতই সময় গড়ায় ততই ভারী ভারী মৃত্যুর খবর আসতে থাকে।

এটা তো কাইত্যানের নতিজা না। ঝড়ের আগে থেকেই শরণখোলা, শ্যামনগরের পদ্মপুকুর, গাবুরায়, খুলনার কয়রা, দাকোপ এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। সোমবার সকাল থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হলে ইব্রাহিম শেখের মোবাইল আবার চালু হয়। সোদর বনের কিছু হোল না কিন্তু ঠান্ডা ঝড়ে গাছ পড়ে ক্যান মানসের ঘরে আর ঘাড়ে? সোদরবন থেকে কি শক্তি বাড়ায়ে আইছে বুলবুল। মগা (দুর্বল) মার্কা গাছ লাগাবা আর কাইত্যানকে দুশবা (দোষ) দেবা? এত বড় বড় আজদাহা (বিশাল আকৃতি) গাছ মগা হয় কেমনে। শরিল (শরীর) মোটা হলেই কি শক্তি হয়? শক্তি আসে জাতের থেকে। ইব্রাহিম শেখের কথাই ঠিক। খবরে কাগজে, টিভিতে, ফেসবুকে রাস্তায় পড়া, ঘরের ওপর পড়া যত গাছের ছবি আছে সবই চম্বল (চা বাগানের ছায়াগাছ বা শেড ট্রি হিসেবে ব্রিটিশদের আমদানি করা গাছ) আর ভিন্ন জাতের কড়ই গাছ। এসব গাছ উপকূলের গাছ নয়।

অনেকেই বলেন, নার্সারির গাছ। নার্সারির গাছ হলেই যে সেটা টেকসই হবে না এই প্রচার ঠিক নয়। নার্সারি থেকে এনে লাগানো আমগাছ, কাঠবাদামের গাছ, গাবগাছ, নারকেল-সুপারি গাছ সবই দিব্য টিকে আছে। পড়েছে শুধু চম্বল আর ভিন্ন কড়ই। একই ঘটনা ঘটেছে আগের ঝড়গুলোতে। সিডরে ও আইলায়। সাগরে যারা মাছ ধরতে গিয়ে মারা গেছে তারা ছাড়া প্রায় সবাই ভুল গাছের চাপায় মারা গেছে। ভুল জায়গায় ভুল গাছ লাগানোয় আমাদের কাল হয়েছে। তখন সিদ্ধান্ত হয়েছিল বিদেশি গাছ আর নয়। কিন্তু চটজলদি লাভের লোভ আর অন্যায় মুনাফার ঝোঁক যখন সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে তখন চম্বল তো মাথায় চড়বেই আর ঘাড়ে পড়বে সামান্য কাইত্যানে।

গওহার নঈম ওয়ারা : শিক্ষক ও কলাম লেখক

advertisement