advertisement
advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

নারীর অগ্রযাত্রার বাধাগুলো দূর করতে হবে

আশফাকুজ্জামান
১৩ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০১৯ ০০:৫৩
advertisement

প্রায় পাঁচ দশক ধরে দেশে নারীর অগ্রগতি হচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকেই এ দেশের নারী সংগঠনগুলো নারীর উন্নয়ন সমৃদ্ধির জন্য কাজ করছে। সরকারও নারীর উন্নয়নে কাজ করছে। উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ প্রকল্প নিয়েছে। সামাজিক সংগঠন নারী উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। প্রায় দুই দশক ধরে গণমাধ্যম বিভিন্নভাবে নারীকে সামনে আনছে। দেশে এখন একটি নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এখানে ইচ্ছা করলে একজন নারী তার মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে নিজের জায়গা করে নিতে পারেন। আজ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে প্রায় সব জায়গায় রয়েছেন নারী।

বাংলাদেশে আজ পোশাকশিল্পের যে বিপ্লব ঘটেছে। এটা সম্ভব হয়েছে নারীর অবদানের জন্যই। পোশাকশিল্পে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নারীরা ক্লান্তিহীন কাজ করেন। আমাদের রপ্তানি খাতের ৮০ শতাংশের বেশি হলো পোশাক খাত। বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে আমরা দ্বিতীয়। পোশাকশিল্পে এই বিস্ময়কর অবদানের ভূমিকা কাদের? এরা হলেন আমাদের দেশের নারী। কেউ তাকে পোশাকশিল্পে পাঠাইনি। জীবনের প্রয়োজনে বেঁচে থাকার জন্য ছুটে এসেছেন। নারীর এই অগ্রযাত্রা নিরন্তর চলতেই থাকবে। কোনো বাধা তাকে আর অবদমিত করতে পারবে না।

এমন একসময় ছিল, যখন মেয়েরা গাড়ি চালালে অন্যরা তাকিয়ে থাকত। এখন নারীদের গাড়ি, মোটরসাইকেল চালানো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। শহরে এখন প্রায় হরহামেশাই নারীরা গাড়ি চালান। মোটরসাইকেল চালান। এটা নিয়ে এখন আর কারও কৌতূহল নেই। মনে হয় এটাই যেন আরও আগে হওয়ার কথা ছিল।

আজ সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিমানচালনা, পুলিশ, বিডিআর, সাংবাদিকতা, প্যারাস্যুট জাম্পিং, হিমালয়ের চূড়া কোথায় নেই বাংলাদেশের নারী! গত কয়েক দশকে অহঙ্কার করার মতো অর্জন আছে তাদের। এ জন্য কে কী করেছে, সেটা বড় কথা না। বড় কথা হলো, নারী নিজে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। নারী তার উন্নয়ন ক্ষমতায়নের জন্যই ঘর ছেড়েছেন।

একসময় নারীর কাজ বলতে রান্না, সেলাই, বিউটি পার্লার, কুটির শিল্প, মৃৎশিল্প ইত্যাদি বোঝত। এসব ছিল সনাতনী ধারণা। এটা নারীর মর্যাদা ও যোগ্যতাকে ছোট করে। তবে এখনো অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রয়ে গেছে। তবে সেই দিন এখন আর নেই। নারীরা এখন সবকিছুকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন।

প্রায় ২৫ বছর আগে ‘নারীর চোখে বিশ্ব দেখি’ এই শিরোনামে বেইজিংয়ে নারী সম্মেলন হয়েছিল। নিঃসন্দেহে বলা যায়, এত বছরে নারীর অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। বেইজিং সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ছিল অন্যতম। এর ওপর ভিত্তি করে দেশে মাতৃমৃত্যু কমেছে। প্রাথমিক শিক্ষায় কন্যাশিশুর অন্তর্ভুক্তি বেড়েছে। এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে।

বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী। আমাদের সংসদের স্পিকার নারী। স্পিকার আবার বিশ্ব আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। বাংলাদেশের নারীর জন্য এটি একটি বড় অর্জন।

ব্রিটেনে প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো গণতন্ত্র। এত বছরে সম্ভবত মার্গারেট থ্যাচার ও তেরেসা মে এ দুজন মাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী। আমেরিকায় আজও কোনো নারী রাষ্ট্রপতি হননি। সেখানে বাংলাদেশে প্রায় তিন দশক ধরে নারী প্রধানমন্ত্রী। ভবিষ্যতে দেশের প্রধান বিচারপতিও হয়তো নারী হবেন। আমরা সেটা দেখতে চাই।

এখন দেশের যে কোনো অঞ্চলে গেলে নারীর উন্নয়ন চোখে পড়ে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের নারীর সামাজিক উন্নয়নের ব্যাপক প্রশংসা করেন। ১৯৯৩ সালে মানবাধিকার নিয়ে ভিয়েনায় সম্মেলন হয়। এ সম্মেলনে নারীর অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

নারী সম্মেলনের পর পেরিয়ে গেছে প্রায় আড়াই দশক। বাংলাদেশের নারীরা এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। দেশের স্কুল, কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ক্ষেত্রে মেয়েরা সমানতালে ছেলেদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। পরীক্ষার ফলাফলে প্রায় এক দশক ধরে ছেলেদের থেকে মেয়েরা ভালো করছে। নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। নারীরা কাজের প্রতি অনেক নিষ্ঠাবান, দায়িত্ববোধসম্পন্ন ও ধৈর্যশীল। অনেকে মনে করেন, দেশে প্রচুর সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। নারীরা যদি ড্রাইভিং পেশায় আসেন তা হলে এ দুর্ঘটনা অনেক কমে যাবে।

নারী পুরুষের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছেন। নারীর জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। আগে নারী ঘরমুখী ছিলেন। কেবল টেবিলে বসে কাজ করতেন। এখন ঘর ছেড়ে বাইরে আসছেন। অনেক চ্যালেঞ্জিং কাজ করছেন। চ্যালেঞ্জিং কাজে নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে। নারীর উন্নয়নে আগে কথা হতো বেশি। এখন কার্যকর আলোচনা হয়। এখন মানুষের ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। কারণ দেশে মেয়েদের প্রায় সব জায়গায় কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

কৃষির প্রায় অধিকাংশ কাজ নারীরা করেন। কিন্তু কৃষক হিসেবে তার স্বীকৃতি নেই। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ প্রায় সব সম্প্রদায়ের নারীর সম্পদের অধিকারে বৈষম্য রয়েছে। এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

দেশের রাজনীতিতে নারীবান্ধব সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করা জরুরি। জরুরি এ জন্য যে, ক্ষমতার বদল হলে যেন নারীর উন্নয়ন থেমে না যায়। ক্ষমতায়ন ও ক্ষমতার মূল শিকড় রাজনীতি। দেশে প্রায় আট কোটির বেশি নারী। এসব নারীর কতজন রাজনীতির সুযোগ পাচ্ছেন? এসব বিষয় গুরুত্বে সঙ্গে ভাবতে হবে।

বাংলাদেশ যেটা করতে চায় সেটা অত্যন্ত দ্রুত করতে পারে। ইউরোপের প্রজনন হার কমাতে লেগেছিল ২০০ বছর। বাংলাদেশের লেগেছে মাত্র ৩০ বছর। টিকাদানে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এই নারীই তার সন্তানকে টিকা দিতে নিয়েছেন। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে মানসিকভাবে নারীর আরও উন্নয়ন ও বদল দেখতে চাই, তা হলে আমরা যেটা পারব পাঁচ বছরে অন্যরা সেটা করবে ২৫ বছরে।

দু-তিন দশক আগেও নারীর ওপর অত্যাচার হলে অনেক নারী বুঝতেই পারতেন না যে, তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। এখন সে অবস্থা নেই। তিনি বুঝতে পারেন, তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। এটাই অগ্রগতি। এটাই নারীর বদল। গত তিন দশকে নারীর বহুমাত্রিক উন্নয়ন হয়েছে। এই উন্নয়নকে ক্ষমতায়নে রূপান্তর করতে হবে। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এদের মধ্যে প্রায়ই আমরা কয়েকজন ক্ষমতাধর নারীর উদাহরণ দিই। এর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে সব ক্ষেত্রে, সেটি বলার সময় এখনো আসেনি। প্রতিবছর প্রায় ২২ লাখ তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা কতজন?

নারীর সত্যিকার স্বাধীনতা হলো মতামত দেওয়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। নারীর যত সফলতা, তা তার নিজেকে অর্জন করতে হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রধান নারী বিচারপতি দেখতে চাই। নারীর আরও উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি কামনা করি। ভবিষ্যতের দিনগুলোয় নারী আরও এগিয়ে যাবেন। এটাই আশাবাদ।

আশফাকুজ্জামান : সাংবাদিক ও সাধারণ সম্পাদক মুক্ত আসর

advertisement