advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সুন্দরবনের জন্য ‘ঝুঁঁকিপূর্ণ’ ১৯০ শিল্প প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে

কবির হোসেন
১৭ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ০৮:৪৪
advertisement

বিপর্যয়ের মুখে বারবারই বুক পেতে দেশকে আগলে রাখছে সুন্দরবন। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’কে দুর্বল করে আবারও তার প্রমাণ রেখেছে। অথচ আইন উপেক্ষা করে এ বনের চারপাশে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক শিল্পকারখানা। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, এ ধরনের শিল্প কারখানার সংখ্যা ১৯০টি। কিন্তু বেসরকারি সংস্থার হিসাব মতে, এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি। প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় আগে এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে উচ্চ আদালত থেকে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

রিটকারী পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন এ জন্য দূষছেন রাষ্ট্রপক্ষকে। জানতে চাইলে তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তালিকা দাখিলের পর আদালত তা গ্রহণ করে শুনানির জন্য তালিকায় রেখেছে।

কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের অসহযোগিতায় মামলাটি নিষ্পত্তি করা যাচ্ছেন না। এটি বর্তমানে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চের তালিকায় শুনানির জন্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’

পরিবেশবিদরা বলছেন, যেভাবে শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে তা সুন্দরবনের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর। এ ক্ষতি হঠাৎ করেই দেখা যাবে না। একটি সময় পর এর ক্ষতিকর প্রভাব বোঝা যাবে। জানতে চাইলে সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের সভাপতি শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনকে রক্ষার জন্য নতুন করে গাছ লাগানোর প্রয়োজন নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সামর্থ্য প্রকৃতিগতভাবেই সুন্দরবনের রয়েছে। কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট যেসব দুর্যোগ

যেমন : বনের ভেতরে বিষ দিয়ে মাছ শিকার, তেলবাহী জাহাজ চলাচল, লাল শ্রেণির শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনসহ বিভিন্ন মনুষ্যসৃষ্ট কারণে যেসব ক্ষতি হচ্ছে তা এ বন কাটিয়ে উঠতে পারে না। তিনি আরও বলেন, মনুষ্য সৃষ্ট এসব দুর্যোগের কারণে বনের যে ক্ষতি হচ্ছে তা হঠাৎ করেই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অনেক বড় প্রভাব পড়ে। তাই সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখতে এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাব।

সরকার ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ৫ ধারার (১) ও (৪) উপধারার ক্ষমতাবলে সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্টের চারপাশে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এ প্রজ্ঞাপন অনুসারে, সুন্দরবনের পার্শ¦বর্তী ওই ১০ কিলোমিটার এলাকার প্রাকৃতিক বন ও গাছপালা কাটা যাবে না, সব ধরনের শিকার ও বন্যপ্রাণী হত্যা করা যাবে না, ভূমি ও পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট বা পরিবর্তন করে এমন কাজ করা যাবে না এবং মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দদূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু সরকারের এ প্রজ্ঞাপনকে উপেক্ষা করে বনের জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে স্বার্থান্বেষী মহল। এমনকি অদৃশ্য কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে বহু শিল্প প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশগত ছাড়পত্রও দেওয়া হয়েছে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষিত এলাকার মধ্যে।

সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় অর্থাৎ ১০ কিলোমিটারের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে কমবেশি ১৫০টি ছোট বড় শিল্প কারখানা বা প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্প করার অবস্থানগত ছাড়পত্র দিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবর যুক্ত করে ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল হাইকোর্টে রিট করেন সেইভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের সভাপতি শেখ ফরিদুল ইসলাম। রিটে এসব শিল্পকারখানা সরিয়ে নিতে আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হয়।

এ রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১৭ সালের আগস্ট ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন শিল্প-কারখানা অনুমোদনে নিষেধাজ্ঞা দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে রুল জারি করে ওই ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কতগুলো শিল্প-কারখানা রয়েছে তার তালিকা ছয় মাসের মধ্যে জমা দিতে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী গত বছরের ৫ এপ্রিল পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

হাইকোর্টে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় সুন্দরবন সংলগ্ন ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) এলাকায় সর্বমোট ১৯০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে বাগেরহাটে ৭৮, খুলনায় ৯২, সাতক্ষীরায় ২০টি। এগুলোর মধ্যে ৩৬টি শিল্প প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বন্ধ। এর মধ্যে লাল শ্রেণির (অধিক ক্ষতিকর) ২৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। লাল শ্রেণির ২৪টি ব্যবসায় বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, সিমেন্ট কারখানা, গ্যাস সিলিন্ডারের কারখানা, তেল পরিশোধন শিল্প, ইটভাটা, সুপারি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, সিগারেট কারখানা, কৃত্রিম চুল তৈরির কারখানা, গাড়ির সিট হিটার কারখানা, ব্রাশ কারখানা, লবণ পানি শোধনাগার, রেস্তোরাঁ, রাইস মিল, বরফকল, ওয়েল্ডিং কারখানা, করাতকল, মৎস্য খামার, কাঁকড়া চাষ ও হ্যাচারি। এ ২৪টি কারখানা, শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে।

তার মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানের নবায়ন স্থগিত রয়েছে, দুটির নবায়ন নেই। বাকি ১০টি প্রতিষ্ঠানের অবস্থানগত ছাড়পত্র রয়েছে, যার মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠানের নবায়ন নেই। ১৯০টি কারখানা, শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮১টির পরিবেশগত এবং ৯টির অবস্থানগত ছাড়পত্র রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।প্রতিবেদন দাখিলের পর সে সময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু সাংবাদিকদের বলেন, ‘রেড জোনগুলো সার্বিকভাবে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

এ জন্য রেড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে রুল শুনানির সময় বিশেষজ্ঞ মতামতের দরকার। তা হলে বেরিয়ে আসবে এসব প্রতিষ্ঠান কতটুকু ক্ষতিকর। এ ছাড়া সুন্দরবন এলাকায় ৩০০ অটো গ্যাস স্টেশন স্থাপনে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিবের অনুমোদন দেওয়ার যে খবর গণমাধ্যমে এসেছে, তাও আদালতের নজরে আনেন রিটকারীর আইনজীবী। আদালত এ প্রতিবেদনটি দেখার পর তা হলফনামা (এফিডেভিট) আকারে আদালতে দাখিল করতে বলেছে। প্রতিবেদন দেখে আদালত থেকে গত বছরের ৯ মে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় আদেশ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজও কোনো শুনানি হয়নি।

advertisement