advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মাংসও উঠছে না পাতে

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ০০:২২
advertisement

‘পেঁয়াজের কেজি ২৫০ টাকা। তবে এতে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না। এমন না যে, আমি অনেক বড়লোক কিংবা পেঁয়াজ কেনার সাধ্য নেই। প্রথম যখন ২৮ টাকার পেঁয়াজ ১০০ টাকা দিয়ে নিয়ে আসা হলো, আমি রীতিমতো বিমর্ষ। বললাম, মগের মুল্লুক নাকি! রাগে গা জ্বলছিল। ভাবলাম, খাবই না পেঁয়াজ। কথাটা রাগের মাথায় বললেও পরে মনে হলো অসম্ভব কিছু না। এই যে ব্রাহ্মণেরা যুগ যুগ ধরে পেঁয়াজ না খেয়ে আছেন, তারা কি মরে গেছেন? তা হলে আমার কি সমস্যা! সত্যিই আমি এখন পেঁয়াজ ছাড়াই রান্না করছি। শাক, সবজি, মাংস, ডাল সবই।’- এটি এক নারীর ফেসবুক স্টেটাসের প্রথম অংশ। সরকারি কর্মকর্তা এই নারী এর পর বেশকিছু রেসিপি তুলে ধরেছেন, বর্ণনা করেছেন পেঁয়াজ ছাড়া নানা খাবার রান্নার উপায়। আরও দশটি পরিবার যেন এ কৌশল অবলম্বন করতে পারে, তাই তিনি তা তুলে ধরেছেন সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ফেসবুকে।

এ দেশের মানুষের প্রাত্যহিক খাদ্যের যে তালিকা, সেসব খাবার রান্নায় একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান পেঁয়াজ। কিন্তু এ নিত্যপণ্যটির দাম হু-হু করে বাড়ছে, কিছুতেই কমানো যাচ্ছে না। অনন্যোপায় হয়ে তাই কেউ পেঁয়াজ কম প্রয়োজন হয়, এমন মেনু বেছে নিচ্ছেন। কেউবা রান্নার সময় পেঁয়াজের বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো উপাদান ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ রান্নায় পেঁয়াজ ব্যবহারই করছেন না। মোদ্দাকথা, পেঁয়াজের অপ্রত্যাশিত ঊর্ধ্বমূল্যের কারণে পাল্টে যাচ্ছে দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস, পাল্টে যাচ্ছে খাদ্যতালিকা।

মাসাধিককাল ধরে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। সরকারের তরফে বিভিন্ন সময় বলা হয়েছে, শিগগিরই বাজার স্থিতিশীল হবে; পেঁয়াজের দাম কমবে; প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কোনো উদ্যোগ আর আশ্বাসই এর লাগাম টেনে ধরতে পারেনি। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২৫০ থেকে ২৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নিম্নবিত্ত তো বটেই, সাধারণ আয়ের মানুষের মাঝেও এর

মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। রান্নাঘর থেকে শুরু করে সব শ্রেণির হোটেল-রেস্তোরাঁসহ সর্বত্রই খাদ্যসূচিতে ব্যাপক পরিবর্তন চলে এসেছে পেঁয়াজের এই ঊর্ধ্বমূল্যের কারণে। ঘরে ঘরে খাদ্য প্রস্তুতপ্রণালিতে এখন চলছে বিকল্প অবলম্বন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের ক্যান্টিনে আগে রান্না করা মাছ পরিবেশন করা হতো, এখন ভাজা মাছ। ক্যান্টিন পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পেঁয়াজ ছাড়া মাছ-তরকারি কি মুখে তোলা যায়? এর চেয়ে ভাজা মাছই উত্তম। শুধু পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিকল্প এ কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। বলেন, ক্যান্টিনে ছাত্রদের স্বল্পমূল্যে খাবার পরিবেশন করতে হয়। এত দাম দিয়ে পেঁয়াজ কিনে তা করা সম্ভব নয় বলেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পেঁয়াজ বেশি লাগে- এমন খাদ্যপণ্যের বিকিকিনিও এখন অনেক কমে গেছে। রাজধানীর বাজারগুলোয় মাংস বিক্রি চারভাগের একভাগে নেমে এসেছে। আর চাহিদা কমে যাওয়ায় সঙ্গত কারণেই কমে গেছে মাংসের দামও।

মাসখানেক আগে বাজারে বয়লার মুরগি প্রতি কেজি ছিল ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা। অথচ গতকাল ১২০ থেকে ১২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রুহুল আমিন বলেন, সাধারণত নভেম্বরের শুরু থেকেই বেড়ে যায় বিভিন্ন পারিবারিক উৎসব, অনুষ্ঠান। এ সময় তাই মাংসের চাহিদা বেশি থাকে বলে দাম কিছুটা বেড়ে যায়।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। দেড় মাস ধরে পেঁয়াজের মাত্রাতিরিক্ত দাম বৃদ্ধির কারণে পুরো চিত্রটিই এবার পাল্টে গেছে। তিনি জানান, বাজারে বর্তমানে মাংস বিক্রি প্রায় ৭৫ শতাংশই কমে গেছে। আগে রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার পশু জবাই করা হতো। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে রোজ মাত্র এক হাজার করে পশু জবাই হচ্ছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের গৃহিণী রূপা আলম আমাদের সময়কে বলেন, পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণে মাছ-মাংস রান্না কমিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন মুরগির দাম কম থাকায় পেঁয়াজ ছাড়াই বিকল্প উপায়ে রান্না করছি।

যদিও আজন্ম যে খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত, তা পরিবর্তন করা খুবই কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা সাপেক্ষে মেনে নিতে হচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, হোটেলগুলোয় প্রায় প্রতিটি খাবারের সঙ্গেই সালাদ দেওয়া হয়ে থাকে। এখন অন্যতম উপাদান পেঁয়াজই উধাও হয়ে গেছে সালাদ থেকে। পুরান ঢাকার খাবার হোটেল ক্যাফে দরবারের মালিক আসলাম মাহমুদ বলেন, সালাদের জন্য কাস্টমারদের কাছ থেকে বাড়তি কোনো দাম নেওয়া হয় না। কিন্তু এখন পেঁয়াজের যে দাম, তাতে সালাদে পেঁয়াজ মেশানো অসম্ভব। তাই সালাদে পেঁপে, গাজর, লেবু, মরিচ ইত্যাদি থাকলেও পেঁয়াজ দিচ্ছি না।

advertisement