advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কেন কোনো উদ্যোগ সহায়ক হয়নি

গোলাম রহমান
১৭ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ০১:০৭
advertisement

বছরের প্রথম দিকে জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসে পেঁয়াজের দাম ছিল প্রতিকেজি ২০ থেকে ২৫ টাকা। এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে খুচরা বাজারে ২২০ টাকা বা তার চেয়েও বেশি। সরকারের নানা উদ্যোগের পরও মূল্য নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এমনটি আরও একবার হয়েছিল ২০১৭ সালে।
সে সময় প্রতিকেজি পেঁয়াজ ১৪০ টাকায় বিক্রি হয়। দাম লাগামহীন হয়ে পড়লে ভোক্তারা বিপাকে পড়ে। ক্ষুব্ধ হয়। তাদের জীবনমানে বিরূপ প্রভাব পড়ে। সরকারের জন্য সৃষ্টি হয় বিব্রতকর পরিস্থিতির।

পেঁয়াজ রান্নার একটি অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের ভোগের পরিমাণ বাড়ছে। পেঁয়াজের ব্যবহারও বাড়ছে। বর্তমানে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩০ লাখ টন বা কাছাকাছি। বিগত এক দশকে উৎপাদন দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজে ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ পেঁয়াজ বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য। দূরবর্তী চীন, মিসর, তুরস্ক বা পাকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আমদানি ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল।

আমদানি করা পেঁয়াজের প্রায় সবটাই আসে প্রতিবেশী ভারত থেকে। ভারতে পেঁয়াজ উৎপাদন ব্যাহত হলে অথবা মূল্য বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের বাজারে পড়ে। ২০১৭ সালে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারত সরকার পেঁয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। ফলে বাংলাদেশের বাজারে সরবরাহ সংকট হয় ও মূল্য বৃদ্ধি পায়। এ বছর ভারত থেকে প্রতিটন পেঁয়াজ ২৫০ ডলার বা কাছাকাছি মূল্যে আমদানি হচ্ছিল।

অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ভারত সরকার বিগত ১৩ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজ রপ্তানিতে টনপ্রতি ন্যূনতম মূল্য ৮৫০ মার্কিন ডলার বেঁধে দেয়। তখনই বাংলাদেশের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। ২৯ সেপ্টেম্বর দেশটি পেঁয়াজ রপ্তানি পুরো বন্ধ করে দেয়। ভারত থেকে প্রতিদিন গড়ে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টন পেঁয়াজ আমদানি হতো। ভারত রপ্তানি বন্ধ করায় বাংলাদেশে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেয় ও দাম বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই সরবরাহ সংকট মোকাবিলার উদ্দেশ্যে মিায়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ব্যাংকের সুদের হার এবং এলসি মার্জিন হ্রাসসহ আমদানিকারকদের প্রণোদনা দিতে উদ্যোগ নেয়। মিয়ানমার থেকে প্রতিদিন হাজার টনের অধিক পেঁয়াজ আসা শুরু হয়।

মিয়ানমারের পেঁয়াজ অধিক পচনশীন হওয়ায় এবং রপ্তানি মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রমান্বয়ে তা হ্রাস পেতে থাকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ভোগ্যপণ্যের কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপকে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুরোধ করে। এসব ব্যবসায়ী গ্রুপ পেঁয়াজ ব্যবসার সঙ্গে ইতিপূর্বে সম্পৃক্ত ছিল না। সম্ভবত সে কারণে আমদানি বিলম্বিত হচ্ছে এবং তাদের উদ্যোগে আমদানির কোনো বড় চালান দেশে এখনো পৌঁছেনি। অন্যদিকে সরকার মূল্য নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে পেঁয়াজ কিনে টিসিবির ডিলারদের মাধ্যমে সুলভ মূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা করে।

তা ছাড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে বাজার অভিযানের মাধ্যমে মূল্য নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও নেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের অধিক মূল্যে পেঁয়াজ বিক্রির অপরাধে মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয়। এসব ব্যবস্থা সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়নে সহায়ক হয়নি। ব্যবসা সরকারের কাজ নয় নীতিতে অটল থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা প্রদান এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নয়নের প্রচেষ্টা নেয়। কিন্তু ব্যবসায়ীদের থেকে প্রত্যাশিত উদ্যোগ ও সহযোগিতা না থাকায় বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং কিছু ব্যবসায়ী মূল্য বৃদ্ধি করে লাভবান হন। বাজারব্যবস্থার ব্যর্থতার ফলে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে আশার কথা, বাজারব্যবস্থার ওপর আর নির্ভর না করে সরকার এখন মালবাহী বিমানে সরাসরি পেঁয়াজ আমদানি করে টিসিবির ডিলারদের মাধ্যমে বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উদ্যোগটি ব্যয়বহুল।

তবে পর্যাপ্ত আমদানি হলে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং মূল্য স্থিতিশীল হয়ে আসবে আশা করা যায়। তা ছাড়া ইতোমধ্যে ‘গাছ পেঁয়াজ’ বাজারে আসা শুরু করেছে এবং কিছু দিনের মধ্যে নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসবে। ফলে এ মাসের শেষ অথবা ডিসেম্বরের প্রথম দিকে পেঁয়াজের মূল্য ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেমে আসবে। যদি ভারত ইতোমধ্যে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, তবে দ্রুতই বাজার স্বাভাবিক হয়ে আসবে। এ বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা গ্রহণের বিষয়ে সরকার বিবেচনা করতে পারেন।

প্রসঙ্গত, ভারতের কোনো কোনো রাজ্যে পেঁয়াজের মৌসুম এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে দেশে উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, সুলভে ঋণ ও সারের ব্যবস্থা, পেঁয়াজ সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষককে মৌসুমে যুক্তিসঙ্গত মূল্য প্রদান করা গেলে দ্রুতই পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্জন সম্ভব বলে মনে করি।

 

advertisement