advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পেঁয়াজ যখন কোরবানির গরু -স্বদেশ রায়

১৭ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০৫
advertisement

পেঁয়াজ নিয়ে শেখ হাসিনার দিল্লিতে দেওয়া বক্তব্য দিল্লির সাধারণ মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্টকে বেশ ছুঁয়েছিল। সে সময় দিল্লিতে বেশ কয়েকটি বাসায় ও ক্লাবে আড্ডায় অনেকেই যা বলেন তার অর্থ এমন, তোমাদের প্রধানমন্ত্রী পেঁয়াজ নিয়ে জব্বর বলেছেন। কিন্তু একজন সিনিয়র সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে দেখি, তিনি মোটেই উচ্ছ্বসিত নন। বরং তিনি বললেন, তোমাদের প্রধানমন্ত্রী কি একা দেশ চালান? তার বাণিজ্যমন্ত্রী বা বাণিজ্য সচিব তারা কী করেন। আমি হাসতে হাসতে বলি, দেখুন, শেখ হাসিনার মতো অ্যাকটিভ প্রধানমন্ত্রী থাকলে তার অন্য কারও লাগে না। নামমাত্র হলেই চলে। তিনি আমার কথায় হাসেননি। বরং বললেন, দেখো তোমরা যাই মনে করো না কেন, ভারত হয়তো তোমাদের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে কিছু পেঁয়াজ জোর করে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে, তবে বাস্তবে ভারতেও পেঁয়াজের যা অবস্থা তাতে ভারত খুব বেশি পেঁয়াজ দিতে পারবে না। কারণ এবার ভারতেও পেঁয়াজের ফলন ভালো নয়। তবে তোমরা যেটা ভুল করেছ তা হলো তোমাদের পেঁঁয়াজের সংকট হওয়ার পরই তোমরা পেঁয়াজ খুঁজতে শুরু করেছ। অথচ যখনই অসময়ে বেশি বর্ষায় তোমাদের পেঁয়াজ নষ্ট হলো বা তোমাদের তো বুঝতেই পারা উচিত ছিল পেঁয়াজের এই ফলনটি এবার আশানুরূপ পাচ্ছি না- সে সময়টা কেন নষ্ট করলে। কেন ওই সময়ে ভারত থেকে বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করলে না। বলে তিনি হেসে বললেন, অবশ্য এসব পলিসি লেভেলের বিষয়, তুমি আমি দু’জনই সাংবাদিক। আমরা কেউ এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না।

তার সঙ্গে অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়ে হোটেলে ফেরার পথে মনে হলো, আসলে অতিরিক্ত বর্ষার কারণে যে পেঁয়াজ ভালো হচ্ছে না, এই বিষয়টি নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রীকে কেউ জানাননি। তিনি জানলে এই শেষ সময়ে এভাবে এক কালে গ্রামে হারিয়ে যাওয়া গরু খোঁজার মতো এখন পেঁয়াজ খুঁজতে হতো না। ধীরে-সুস্থে পেঁয়াজ উৎপাদনকারী নানা দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা যেত। হঠাৎ করে একটা টেলিফোন আসায় চিন্তার ছেদ কেটে যায়। তার পর চোখ পড়ে রাতের দিল্লির রাস্তায়। যানজট কম। পাশে বড় বড় গাছ। আসলে দিল্লির পলুশান যেখানে গিয়েই ঠেকুক না কেন, হয়তো সেটা তারা কাটিয়ে ফেলবে। তবে তারা যে দিল্লিকে গ্রিন করতে পেরেছে এটা সত্যি ভালো লাগে। আর রাতের বেলায় আলো-ছায়ায় রাস্তার পাশের গাছগুলো আরও বেশি ভালো লাগে। ওই গাছের দিকে তাকিয়ে মনে করেছিলাম চিন্তা ভিন্ন দিকে নিয়ে যাব, কিন্তু যায়নি। আবারও মনে আসে পেঁয়াজের কথা। মনে পড়ে সাংবাদিক বন্ধুর কথা। ‘তোমরা যাই বলো না কেন, ভারত থেকে খুব বেশি পেঁয়াজ পাবে না, কারণ ভারতে এবার পেঁয়াজের ফলন খারাপ।’ তাই অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে রাতে দিল্লির রাস্তায় বসে মনে হতে থাকে, আসলে ভারত থেকে যদি বেশি পেঁয়াজ না পাওয়া যায়, তা হলে পেঁয়াজ জনগণকেও ভোগাবে, সরকারকেও ভোগাবে। এই দিল্লির রাস্তায় তো পেঁয়াজ নিয়ে কম হয়নি। এখানে এই পেঁয়াজ ভুগিয়েছে লৌহমানবী ইন্দিরা গান্ধীকে, তার ছেলে রাজীব গান্ধীর আমলেও পেঁয়াজ তাকে ভুগিয়েছে। এমনকি অটল বিহারি বাজপেয়ির আমলে যখনই ইন্ডিয়া সাইনিং স্লোগানে ভারত ভাসছে সে সময় হঠাৎ পেঁয়াজ ওই সরকারকে ভোগাল। শেষ অবিধ পেঁয়াজ নিয়ে দিল্লির রাস্তায় গান গাইলেন দালের মেহেদি। ইন্ডিয়া টু ডে তার লোগোতে টু বানানে ‘ও’-এর স্থানে একটি পেঁয়াজের ছবি দিয়ে লোগো তৈরি করে।

অক্টোবরের সেই প্রথম সপ্তাহ থেকে পেঁয়াজের দাম বেড়েই চলেছে। এর পর আশি টাকা দাম হতেই বাণিজ্যমন্ত্রী বললেন, এটা একশ টাকা হবে। পরদিন থেকে দাম লাফাতে লাগল। কারণ এমনিতে ব্যবসায়ীরা সুযোগ খুঁজতে থাকে। তার ওপর যদি মন্ত্রী বলেন, একশ টাকা হবে তা হলে আর কি তারা বসে থাকেন। দুই দিনের ভেতর মন্ত্রীর আশা তারা পূরণ করে দেন। পেঁয়াজের দাম একশ টাকা হয়। এর পর রেসের ঘোড়া দৌড়াতে থাকে। ঘোড়া থামাতে দেড় মাসেও বাজারে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ আসেনি। দেড় মাসের ভেতর কেন বাজারে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ আনা গেল না সেটা এখন যেমন সরকারকে খুঁজে দেখতে হবে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীকে খুঁজে বের করতে হবেÑ পাশাপাশি মিডিয়াকে এটা অনুসন্ধান করতে হবে। কারণ এই দেড় মাসে অনেক কিছু ঘটেছে। আড়তে পেঁয়াজ থাকলেও বাজারে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ আসেনি। আবার বাজারে পর্যাপ্ত থাকতেও দাম বেড়েছে প্রতিদিন। আবার ৫০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির কথা শোনা গেলেও সেটা এখনো পৌঁছায়নি।

আর এরই ভেতর আসে ১৫ নভেম্বরের শুক্রবার। ১৫ নভেম্বর মোটামুটি সারাদিন ঘোরাঘুরির ভেতর থাকতে হয়েছিল। তাই নানান জায়গায় পেঁয়াজ নিয়ে আলোচনা শুধু শোনেনি। ১৫ নভেম্বর পেঁয়াজকে কোরবানির গরু মনে হয়। যেখানে যে পেঁয়াজ কিনে আনছে, দেখতে পেলেই লোকে বলছে, ভাই আপনার পেঁয়াজ কত পড়ল? আর যিনি পেঁয়াজ কিনে আনছেন, তিনিও কোরবানির গরু কেনার মতো দাম বলছেন, দু’শ চল্লিশ, কেউ বা বলছেন দু’শ পঞ্চাশ আবার কেউ তা শুনে বলছেন, আমি অনলাইনে কিনে লাভ করেছি। অনলাইনে দু’শ দশ টাকায় কিনেছি। কোরবানির গরুর বাজারের সঙ্গে পেঁয়াজের বাজারের কোনো পার্থক্য নেই।

যা হোক, ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর সরকার, রাজীব গান্ধীর সরকার এমনকি ইন্ডিয়া সাইনিংয়ের অটল বিহারির সরকারকে পেঁয়াজ যেমন ভুগিয়েছিল শেখ হাসিনার সরকারকেও পেঁয়াজ তেমনি ভোগাল। পেঁয়াজ নিজে মসলা না থেকে কোরবানির গরু হয়ে গেল। যাহোক শেখ হাসিনা অনেক দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেন না। শুক্রবারের আগেই অর্থাৎ বৃহস্পতিবারে তিনি সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন, কার্গো বিমানে দ্রুত পেঁয়াজ আমদানির। যে কোনো ক্রাইসিস শেখ হাসিনা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ম্যানেজ করেন। এবারও করবেন। তবে এর ফাঁকেই অনেক ব্যবসায়ী পেঁয়াজের রসকে রক্ত বানিয়ে রাস্তা থেকে পয়সা তুলে নিয়েছেন। কারণ তারা জানেন যখন রাস্তায় রক্ত থাকে তখন পয়সা খুঁজতে হয়। তারা সে কাজ ঠিকমতোই করেছেন।

ব্যবসায়ীরা ব্যবসায়ীদের কাজ করেছেন ঠিকই, এখন শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই এই পেঁয়াজ আমদানি করে বাজার শান্ত করেই তার পেঁয়াজ নিয়ে চিন্তা শেষ করবেন না। তাকে এখন খুঁজে বের করতে হবে, বর্ষায় যে পেঁয়াজের ফলন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এটা কেন তাকে জানানো হলো না? খুঁজে বের করতে হবে কোন কারণে তিন মাস আগেই হিসাব-নিকাশ করা হয়নি, পেঁয়াজের চাহিদা ও জোগান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এবং কেন সে সময়ে হিসাব করে পেঁয়াজ আমদানি করা হলো না? এর পাশাপাশি ৫০ হাজার টন পেঁয়াজ দেড় মাসেও কেন বাজারে ঢুকল না? এ প্রশ্নগুলোর যথার্থ জবাব যেমন খুঁজে বের করতে হবে, তেমনি আগামী বছরে পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ বাড়বে অর্থাৎ পেঁয়াজের বীজের দাম বেড়ে যাবে তাই তা নিয়ে এখনই করণীয় কী সেটা ভাবতে হবে। ইতোমধ্যে অবশ্য বাংলাদেশের গবেষকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বারো মাস যাতে পেঁয়াজ উৎপাদন করা যায় সে ধরনের পেঁয়াজ উদ্ভাবন করতে। আশাকরি আমাদের কৃষিবিদরা এ কাজে সফল হবেন। কারণ আজ যে বাংলাদেশে সতেরো কোটি মানুষ পেটভরে খাচ্ছে এর জন্য বড় কৃতিত্ব কৃষিবিদদের দিতে হবে। এক সময় চালের সংকট ছিল, চালের দামের জন্য সরকার মুশকিলে পড়ত। সেই চালে এখন উদ্বৃত্ত বাংলাদেশ। আশাকরি, কৃষিবিদরা পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও তেমনি সফল হবেন। আর এ দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন শেখ হাসিনা।

স্বদেশ রায় : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

advertisement