advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ঢাকায় চাই জলসড়কের নেটওয়ার্ক -আসিফ

১৭ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০৫
advertisement

মহাজাগতিক পথচলা

মাঝে মাঝে অস্থির হয়ে পড়লে কাজকর্ম থেকে বের হয়ে পড়ি। কিছুটা পথ অতিক্রম করলেই হাতিরঝিলে পৌঁছে যাওয়া যায়। এ জায়গায় এলেই কেমন যেন হালকা লাগে, একটু বসে থাকা যায়, চোখ মেলে তাকিয়ে থাকা যায়, ভাবা যায়। কিন্তু ওইটুকু পথেই অনেক ধুলোবালি, চোখ-মুখ কুঁচকে যায়। সূক্ষ্ম ধুলোবালির কণায় ঢাকার বায়ুদূষণ এমন বিপর্যস্ত অবস্থা তৈরি করেছে যে, ৯ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। পরিবেশবাদী সংস্থা বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ঢাকা শহরের ছয়টি স্কুলে শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতার ওপর এক গবেষণায় এ মারাত্মক ফলাফল জানা গেছে। প্রায় ২৫ শতাংশ শিশুর ফুসফুস পূর্ণ মাত্রায় কাজ করছে না, ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ করছে। ফলাফল হিসেবে শিশুদের হাঁপানিসহ বিভিন্ন শ্বাসজনিত রোগ ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছে। বাড়ছে নিউমোনিয়ার প্রকোপ। বড়দের তুলনায় শিশুদের এ রোগ হওয়ার কারণ খুব যৌক্তিকভাবেই শিশুদের ফুসফুস খুব একটা পরিপক্ব থাকে না। দীর্ঘমেয়াদে ধুলার মধ্যে থাকার কারণে হয় অ্যাজমা, সিওপিডি, ব্রঙ্কাইটিস। এতে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে পরিবার, এমনকি রাষ্ট্র। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে ৮৫ লাখ মানুষ শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমায় ভুগছে, ৭৫ লাখ মানুষ ব্রঙ্কাইটিস এবং সিওপিডিতে আক্রান্ত বায়ুতে ধুলার দূষণের কারণে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা শহরের ১০ বছরের মধ্যে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন ঘটে যাবে। একটা সুপরিকল্পিত শহরে পরিণত হবে। ২০০৭-০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে আওয়ামী লীগ সরকার এটাকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে অনুমোদন দেয়। প্রথমে এটা ছিল ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রজেক্ট। পরে এটা জাইকার তত্ত্বাবধানে কিছু সংযোজন-বিয়োজন হয়। ফলে এখন এটাকে বলা হয় রিভাইজড স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান। এটা হলে দেখা যাবে সড়ক ত্রিতল হয়ে গেছে। একটা হলো ভূপৃষ্ঠ, এটাই মূল। তার সঙ্গে আছে ফ্লাইওভার। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আবার ভূতল বা পাতাল। পাতাল রেলপথও হবে। তিনটি লেভেলে যাতায়াত ব্যবস্থা আমাদের অনেক অসুবিধা থেকে মুক্তি দেবে। সব আধুনিক বড় শহরে এ রকমই হয়। এর মধ্যে আছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসটা বিপ্লবাত্মক। এটা হলে হাজার হাজার গাড়ি চলতে পারবে। তবে সবচেয়ে বিপ্লবাত্মক হলো মেট্রোরেল। ৩-৪ বছরের মধ্যে অবশ্য মেট্রোরেল চালু হয়ে যাবে এবং আগামী ১০ বছরের ওই যে ৬টা লাইন হওয়ার কথা তার ৬টা না হলেও কয়েকটা লাইন হয়ে যাবে।

কিন্তু যে ভয়াবহ বায়ুদূষণের মধ্যে আমরা আছি তার থেকে কি মুক্তি মেলবে? দিল্লিতে আধুনিক সব ব্যবস্থাই আছে কিন্তু বায়ুদূষণ থেকে মুক্তি মেলেনি। শুধু ইট, পাথর, লোহা আর প্লাস্টিক দিয়ে বায়ুদূষণ দূর হয়? এর প্রয়োজন হয় সজীব নদীনালা এবং সবুজ পরিবেশ। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হোক তবে বায়ুদূষণ থেকে মুক্তির জন্য উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। না হলে আগামী দশ বছরে বায়ুদূষণ ঢাকা শহরকে কী মারাত্মভাবে গ্রাস করবে তা নিয়ে ভাবার সময় এসে গেছে। এজন্য আমাদের এমন কিছু করতে হবে যা আমরা করতে সামর্থ্য।

যেমন- হাতিরঝিলে একদিকে লেক আর পাশেই অনেকগুলো লেন। বসার জন্যও প্রচুর জায়গা। অন্তত ঢাকার অন্য যে কোনো পার্ক বা উদ্যান থেকেই বেশি। বড় জায়গাজুড়ে হওয়ার কারণে হাতিরঝিল মানুষের চলাফেরা বা গাড়ির যাতায়াত খুব একটা গোলযোগ তৈরি করে না। অবশ্য সুনিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনাও আছে। গাছপালাগুলো আগের চেয়ে বড় হওয়ায় অনেক সবুজ লাগে। বায়ুকে নির্মল করে দেয় এবং সেই সঙ্গে মনকেও সজীব করে। গাছাপালা ও লেকের পানি তাপমাত্রাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করছে। এখানে আসলে অনেক ধরনের ভাবনা আমাকে ঘিরে ধরে, কখনো আমি তার মধ্যে নিজেকে ভাসাই। এ রকম দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা এবং দখল হয়ে যাওয়া একটি জায়গাকে এমন মনোমুগ্ধকর রূপ দিতে পারে যে সরকার, তার পক্ষে অনেক কিছুই সম্ভব, বর্তমানে তা করা জরুরিও।

দেখি লেকের পানি দিয়ে বোটগুলো ছুটে যাচ্ছে। এটা বর্তমান হাতিরঝিল পর্যন্ত না গিয়ে যদি সোনারগাঁও হোটেলের কাছে গিয়ে ভিড়ত। বিজিএমই ভবনটি না থাকত তা হলে এটা হওয়া কঠিন বিষয়ই ছিল না। আদালত তো অনেক আগেই বলেছেন, এটা থাকার কোনো আইনগত যৌক্তিকতাই নেই। তার পরও নানা টালবাহানায় তা বছর গড়িয়ে চলেছে। সম্প্রতি আদালত তো এটা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। তা যদি বাস্তবায়ন হয় তা হলে তো আমরা চিন্তাই করতে পারি এ রকম একটি জলসড়কের কথা।

ভাবনাটাকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে যাই। ভাবি, পান্থপথটায় একটা সরুখাল করা গেলে ধানম-ি লেকের সঙ্গে সংযুক্ত করা যেত। আর এসব খালের মধ্যে জলবাসগুলোও চলাচল করতে পারে। আর দুপাশে গাছপালা লাগানো থাকলে বাতাসটা আরও নির্মল হতো। বায়ুতে মিশে থাকা গ্যাস এবং বালুকণার চেয়ে বিশগুণ ছোট কণাগুলো থেকে কিছুটা হলেও বাঁচতে পারতাম। জানা যায়, কণা বড় হলে সেটি নাকের ভেতর আটকে যায় কিন্তু ওই ধরনের সূক্ষ্ম কণা মস্তিষ্কে ¯œায়ুর ভেতরে ঢুকে গোলমাল পাকিয়ে ফেলে। এসব কণা মস্তিষ্কের বিভিন্ন কোষের মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রম ঘটাতে পারে।

অন্তত জলপথের কারণে ১ শতাংশ সূক্ষ্মকণার দূষণ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, এতে প্রায় ১৫ শতাংশ দূষণমুক্ত করা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের ফরেস্ট সার্ভিসের শীর্ষস্থানীয় একজন বিজ্ঞানী ড. ডেভিড নোভাকের গবেষণাও তাই বলছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, শহরাঞ্চলে গাছপালা বায়ুদূষণের মাত্রা এক শতাংশ হলেও কমিয়ে আনতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মাত্র ১ শতাংশ কমানো গেলেও সামান্য এই ব্যবধানই বড় রকমের স্বাস্থ্য সুবিধা বয়ে আনতে পারে। অবশ্য দূষণকারী উপাদানগুলোর ওপর এটা নির্ভর করে কমবেশি হতে পারে। ফলে বায়ুদূষণ কমাতে প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগানোর পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ গাছপালা এসব দূষণ শুষে নেয়। এর মধ্যে কনিফার, লতাগুল্ম অধিকতর উপযোগী হতে পারে। এ ধরনের জলসড়কের দুপাশে গাছপালা লাগিয়ে পরিবেশ তৈরি করা গেলে বায়ুতে বিপজ্জনক সূক্ষ্ম কণাগুলোই শুধু কমত না। সঙ্গত কারণেই যানবাহনের সংখ্যাও কমে যেত। আমাদের বাসগুলোর মরুভূমির মতো ধুলা উড়িয়ে যাওয়ার হাত থেকে রেহাই পেতাম। আবার বৃষ্টির পানি জমে গিয়ে ভজঘট সৃষ্টির যন্ত্রণা থেকেও বাঁচতে পারতাম।

কিন্তু এ ধরনের পরিবেশ তৈরি করতে গেলে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ। দরকার গাছপালা, নদীনালা, অভ্যন্তরের লেকগুলোর সম্প্রসারণে উদ্যোগ। ঢাকার ভেতর যে খালগুলো একটু সংস্কারে জীবিত করা যায় এবং আশপাশের নদীগুলোর সঙ্গে সংযোগে তার প্রবাহ স্বাভাবিক করে দেওয়া যায় সে উদ্যোগ এখনই নেওয়া জরুরি। এভাবে আমরা ঢাকা শহরে জলসড়কের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলতে পারি। জানা গেছে, সরকারেরও এ ব্যাপারে সদিচ্ছা রয়েছে।

তাই তুরাগ, বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে ওয়াটারবাসের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আর দেরি না করা। এদিকে বেশ কিছুদিন হলো নিউজিল্যান্ডের সংসদ সে দেশের নদী হোয়াংগানুইকে জীবিত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। নদীকে বিশে^ এই প্রথমবারের মতো মানুষের সমান আইনগত অধিকার দেওয়া হচ্ছে। যেহেতু ঢাকা কোটি মানুষের ওপর নির্ভরশীল তাই ঢাকাকে সচল রাখার জন্য বুড়িগঙ্গা অপরিহার্য। ফলে বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে এ রকম একটি ঘোষণা এ সরকারও দিতে পারে। তবে তুরাগকে কেন্দ্র করে আদালতের রায়টি আসলে সব নদীর বেলায় প্রযোজ্য। রায়ে বলা হয়েছে, ‘অবৈধ দখলদারদের দ্বারা প্রতিনিয়ত কমবেশি নদী দখল হচ্ছে। অবৈধ স্থাপনা তৈরি করায় সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে নদী। এসব বিবেচনা থেকে তুরাগ নদীকে লিগ্যাল/জুরিসটিক পারসন হিসেবে ঘোষণা করা হলো।’ বিশ্বের অন্য যেসব দেশে নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে আদালত সেখানে নদীর অভিভাবক নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা করা না হলেও এর ভিত্তিতে যে কেউ নদীর ক্ষতির বিষয়টি আইনজীবীর মাধ্যমে বা আইনজীবীরা নিজ থেকেও নদীর ক্ষতি, দখল বা বাধার বিষয়টি আদালতে উপস্থাপনা করবেন নদীর অধিকার আইনের ভিত্তিতে। এটা দেশবাসীর কাছে অনেক গুরুত্ব পাবে এবং ভাবমূর্তিও ভালো হবে। কেননা ঢাকায় দূষণমুক্ত নির্মল বাতাস এখন পরিবেশ রক্ষার জন্যই জরুরি নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজš§কে টিকিয়ে রাখার জন্যই জরুরি হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের একটি শহর রাজশাহী। শহরটি দেড় বছরের মধ্যে বায়ুদূষণের মাত্রা ৬৭ শতাংশ কমিয়ে বিশ^কে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। চীনের গুয়াংজু ও সাংহাই শহরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে রাজশাহী দ্রুত বায়ুদূষণ রোধে সেরা হয়েছে। রাজশাহী প্রমাণ করেছে কীভাবে বায়ুদূষণ কমানো যায়। আমরাও সেই প্রক্রিয়া অবলম্বন করলে ভালো ফল পেতে পারি। এ ছাড়া ঢাকা শহরের ৯০ শতাংশ যানবাহন ত্রুটিপূর্ণ, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। সরকার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু নিয়মটি মানা হচ্ছে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। শাস্তি দেওয়ার জন্য আইনও প্রয়োগ হচ্ছে না। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও বায়ুদূষণ থেকে মুক্তির অনেকখানি পথ অতিক্রম করা সম্ভব। নক্ষত্রে ভরা স্বচ্ছ আকাশের দেখা মিলতে পারে।

আন্তর্জাতিক এক গবেষণা বলছে, বায়ুদূষণজনিত কারণে বিশ্বে প্রতিবছর ৩০ লাখের মতো মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। আর বাংলাদেশে ১৫ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। গত ৪ বছর ধরে শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার বায়ু ধারাবাহিকভাবে অস্বাস্থ্যকর হয়ে চলেছে। বর্তমানে ম্যালেরিয়া ও এইডসের চেয়ে এ সংখ্যা বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানিক উপাত্ত বলছে, বিশে^ এককভাবে এটাকে হত্যার সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। শহরাঞ্চলে বাস করা ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ এখন এমন গুণগত মাত্রার বায়ুর মুখোমুখি, যা বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার সীমাকে অতিক্রম করেছে অর্থাৎ বায়ুদূষণের মধ্যে অবস্থান করে। আমাদের শিশু বা ভবিষ্যৎ প্রজšে§র স্বাস্থ্য রীতিমতো ঝুঁকির মুখোমুখি। এখনই ব্যবস্থা না নিলে কোনো উন্নয়নে কিছু হবে না।

আসিফ : সম্পাদক, মহাবৃত্ত (বিজ্ঞান সাময়িকী)

advertisement