advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চট্টগ্রামে বিস্ফোরণে নিহত ৭

হামিদ উল্লাহ ও মো. মহিউদ্দিন,চট্টগ্রাম
১৮ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ০১:৪৩
advertisement

ঘটনার আকস্মিকতা কাটানোর আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন কেউ; কেউবা গুরুতর আহত, গোঙাচ্ছেন। রাস্তার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছেন সদ্য লাশ হওয়া কিছু মানুষ; আহতদের চোখে মৃত্যুভয়; মুখে বাঁচার আকুতি। আরও ১০ দিনের মতোই এ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন তারা যার যার গন্তব্যে। কিন্তু আচমকা এমন এক বিস্ফোরণের মুখে পড়তে হবে, ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি তারা। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণ। চারপাশের পরিবেশ ভীষণ ভারী। অসংখ্য শোকার্ত, উৎকণ্ঠিত মানুষের ভিড়। হতাহত প্রিয়জনের জন্য এসেছেন তারা। কেউ কাঁদছেন, কেউবা বিলাপ করছেন, শোকে পাথর বনে গেছেন কেউ কেউ।
চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটায় এক শক্তিশালী বিস্ফোরণের পর পাশের রাস্তায় এক ভয়ার্ত, হৃদয়বিদারক পরিবেশ সৃষ্টি হয়; চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালজুড়ে নেমে আসে শোকের আবহ। ভয়াবহ এ বিস্ফোরণে সাতজন নিহত হয়েছেন; আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন আরও ১০ জন।

গতকাল রবিবার সকাল ৯টার দিকে ব্রিকফিল্ড সড়কের বড়–য়া বিল্ডিং নামে একটি পাঁচতলা ভবনের নিচতলায় এ বিস্ফোরণ ঘটে। নিহতরা সবাই এ ভবনের পাশের সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন। বাড়ির দেয়াল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে সবেগে ছিটকে গিয়ে এসব মানুষকে আঘাত করে। এতে ঘটনাস্থলেই সাতজন প্রাণ হারান। এ ছাড়া আগুনে দগ্ধ হয়েছে অর্পিতা নাথ (১৪) নামে এক কিশোরী। তার শরীরের ৮০ শতাংশই দগ্ধ হয়ে গেছে। অর্পিতাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
কী কারণে এ বিস্ফোরণ, গতকাল রাত পর্যন্ত তা জানা যায়নি। ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের তরফে একটি, মহানগর পুলিশের একটি এবং কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির (কেজিডিসিএল) একটি অর্থাৎ তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন আমাদের সময়কে বলেন, প্রাথমিকভাবে গ্যাস সরবরাহের পাইপে লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
এদিকে বিস্ফোরণকা-ের পর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভিড় করেন হতাহতদের স্বজনরা। শোকার্ত এসব স্বজনের আহাজারিতে পুরো হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে যায়। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেনÑ অ্যাডভোকেট আতাউর রহমানের স্ত্রী জুলেখা খানম ফারজানা (৩০) ও তার ছেলে আতিকুর রহমান শুভ (৮), পটিয়া মেহেরআটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অ্যানি বড়–য়া (৪১), কক্সবাজার জেলার উখিয়ার নুরুল ইসলাম (৩০), রিকশাচালক আবদুল শুক্কুর (৫০) ও ভ্যানচালক মোহাম্মদ সেলিম (৪০)।
বিস্ফোরণ হয় যে ভবনে, এর বিপরীত পাশের চা দোকানি মঞ্জুর হোসেন প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন। তিনি বলেন, প্রচ- বিস্ফোরণ হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার টিনের দোকানটি ভেঙে পড়ে। সেখান থেকে উঠে দেখি, এ ঘটনার মাত্র ২ মিনিট আগে আমার দোকানে চা খেয়েছিলেন যে যুবক, তিনি রাস্তার ওপর পড়ে আছেন, মৃত। তার আশপাশে আরও অনেক মানুষ পড়ে আছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন এর মধ্যেই মারা গেছেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। আমি বেঁচে আছি, ভাবতেই অবাক লাগছিল।
পুরনো চট্টগ্রামের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা পাথরঘাটা। সড়কগুলোও সরু। বিস্ফোরণস্থলের পাশের সড়ক দিয়ে রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশা চলে। তবে কর্মজীবী অধিকাংশ মানুষই সকালে এ পথটুকু হেঁটে পাড়ি দেন। গতকাল ছিল সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস, তাও সকাল ৯টা। সঙ্গত কারণেই রাস্তাটিতে প্রচুর পথচারী চলাফেরা করছিল। তেমনিভাবে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল ব্রিকফিল্ড রোড। এমন সময় প্রচ- বিস্ফোরণে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। বড়ুয়া ভবনের মালিক অমল বড়–য়া ও টিটু বড়–য়া। তারা ভবনটির পঞ্চম তলায় থাকেন। পুরনো এ ভবনটি তারা পৈতৃক সূত্রে পেয়েছেন।
বিস্ফোরণের পর আগুনে অর্পিতা নাথ নামের কৃষ্ণকুমারী স্কুলের নবম শ্রেণির এক ছাত্রী দগ্ধ হয়েছে। তার শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। রাতে তাকে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক হাসান শাহরিয়ার কবির বিস্ফোরণস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, সকালে পূজার ঘরে ম্যাচ জ্বালানোর সময় অর্পিতা নাথ দগ্ধ হয়। আহত সন্ধ্যা নাথ ও দগ্ধ অর্পিতা এ তথ্য দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
সেখানে দায়িত্ব পালনরত চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক পূর্ণচন্দ্র মুৎসুদ্দি জানান, বড়ুয়া বিল্ডিংয়ের নিচতলায় সীমানাপ্রাচীরের পাশে এ ভবনের গ্যাস রাইজার। বিস্ফোরণ এ ভবনের নিচতলাতেই হয়েছে। এমনও হতে পারে যে, রাইজারে সমস্যার কারণে গ্যাস বের হয়ে জমে গিয়েছিল। সকালে বাসায় কেউ আগুন জ্বালানোর সময় বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে।
আহতদের মধ্যে ১০ জন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে ছয়জন ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডে, একজন নিউরোমেডিসিন ও একজন বার্ন ইউনিটে, একজন অর্থোপেডিক এবং একজন কার্ডিওলজি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন।
হাসপাতালে শোকার্ত স্বজনের আহাজারি : স্বজনদের আহাজারিতে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় চমেক হাসপাতালে। কান্নায় ভেঙে পড়েন উপস্থিত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও। হাসপাতালে নিহত স্কুলশিক্ষিকা অ্যানির স্বামী পলাশকে স্বজনদের জড়িয়ে ধরে আহাজারি করতে দেখা গেছে। এ সময় তিনি স্ত্রী-সন্তান ছাড়া কীভাবে বেঁচে থাকবেন বলে চিৎকার করতে থাকেন। নিহত রঙমিস্ত্রি নুরুল ইসলামের স্ত্রী সাদিয়া সুলতানার কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের আকাশ। মাত্র আড়াই বছর আগে বিয়ে হয় তাদের। ঘরে আছে ১১ মাসের শিশুকন্যা।
তিনটি তদন্ত কমিটি : বিস্ফোরণকা- তদন্তে তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এজেএম শরিফুল হাসানকে প্রধান করে গঠিত কমিটিতে ফায়ার সার্ভিস, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর সদস্য হিসেবে থাকছেন। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে উপকমিশনার (দক্ষিণ) এসএম মেহেদী হাসানকে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেনÑ নগর বিশেষ শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ এবং কোতোয়ালি অঞ্চলের সহকারী কমিশনার নোবেল চাকমা। এ ছাড়া কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী সারোয়ার হোসেনকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার ব্যয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) বহন করছে। দুর্ঘটনার পর চমেক হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়ে এ তথ্য জানান চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনি নিহতদের প্রতিটি পরিবারকে এক লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেন। এ ছাড়া লাশ বহনের জন্য নিহতদের মাথাপিছু ২০ হাজার টাকা করেও দেন। শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের পক্ষে ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহরলাল হাজারীও হতাহতদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দেন। জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন জানান, নিহতদের দাফনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে।

 

advertisement