advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শুটিংয়ের অস্ত্র-গুলির হিসাবে গরমিল

শাহজাহান আকন্দ শুভ ও ইউসুফ সোহেল
১৯ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০১৯ ১০:৪২
advertisement

বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্ট ফেডারেশনের (বিএসএসএফ) সংরক্ষণাগারে রক্ষিত অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং শুটিংয়ের অন্যান্য সরঞ্জামাদির হিসাবে মারাত্মক গরমিল থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। শুটিং ফেডারেশনের ‘অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিরীক্ষা’ উপপরিষদ গঠিত চার সদস্যের তদন্ত কমিটির করা সংরক্ষণাগার যাচাই প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে; উল্লেখ করা হয়েছে অস্ত্র ও গুলিসহ নানা সরঞ্জামের হিসাবে অসামঞ্জস্যতার তথ্য।

গত ১৬ জুলাই থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তদন্ত কমিটি সরেজমিনে বিএসএসএফের অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য শুটিং সরঞ্জামাদির রক্ষণাবেক্ষণের সব গুদামের স্টক রেজিস্টার, আমদানি ও বরাদ্দের কাগজপত্রাদি পর্যবেক্ষণের পর এ প্রতিবেদন তৈরি করে। বিএসএসএফ কার্যকরী পরিষদের গত বছর অনুষ্ঠিত একটি সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জিয়া উদ্দিন আহমেদ, আহমেদ কবির, রাজিয়া নওশাদ জুয়েল ও মোহতাসিম মেহেদীর (বিশেষ আমন্ত্রণে) সমন্বয়ে এ কমিটি গঠিত হয়।

আদালত কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত বিএসএসএফের ২০১২ সালের কার্যকরী পরিষদের মেয়াদ শেষ হয় ২০১২ সালের ৮ ডিসেম্বর। সেই সময়কাল শেষের স্টক এবং সর্বশেষ পরিষদের মেয়াদের (২০১৯ সালের ১৬ জুলাই) অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য সরঞ্জামের প্রকৃত পরিমাণের সঙ্গে স্টক খাতার যাচাই, একই সময়ে আমদানির অনুমতি, আমদানির পরিমাণ, বিক্রয় ও স্টক খাতার সমন্বয়, ২০১২ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ১৬ জুলাই পর্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য শুটিং সরঞ্জামাদি বরাদ্দ প্রদানের বিষয়গুলো তদন্তকালে যাচাই করেন কমিটির সদস্যরা।

অস্ত্র-গুলির হিসাবে গরমিলের বিষয়ে জানতে চাইলে ফেডারেশনের সভাপতি নাজিমউদ্দিন চৌধুরী আমাদের সময়কে জানান, শুটিং স্পোর্ট ফেডারেশনের কার্যকরী সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক একটি কমিটি করে দিয়েছিলেন। ওই কমিটিকে সংরক্ষণাগারে থাকা অস্ত্র-গুলি ও অন্যান্য সরঞ্জামাদির বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করতে বলা হয়। তারা তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন দিয়েছেন। প্রতিবেদনে কী আছে তা না দেখে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

৪ সদস্যের কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, শুটিং সরঞ্জামাদি, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও টার্গেট পেপার শুধু দেখা হলেও বিক্রি ও স্টক সমম্বয় করা যায়নি। কারণ ওই স্টক কম্পিউটার সফটওয়্যার ব্যবহারের আগে অর্থাৎ ২০১৫ সাল শেষের আগে রেজিস্টারে নিয়মিত আপডেট করা নেই।

সূত্রের তথ্যানুযায়ী, নিরীক্ষা উপপরিষদের গঠিত কমিটি বিএসএসএফের ৪টি গুদাম পর্যবেক্ষণ ও স্টক গ্রহণ করে দেখেনÑ বিএসএসএফের হিসাবরক্ষক আবদুল বারেকের তত্ত্বাবধানে গুদামগুলো পরিচালিত হয়। গুদামের দেয়াল স্যাঁতসেঁতে হওয়ার কারণে রঙ চটে গেছে; বৈদ্যুতিক সংযোগ নষ্ট থাকার কারণে অচল ছিল ডিহিউমিডিফায়ের মেশিন যা বাতাস থেকে অতিরিক্ত আর্দ্রতা শুষে নেয়। যন্ত্রটি ব্যবহৃত না হওয়ায় অল্প সময়ে অস্ত্র ও গুলির গুণগত মান নষ্ট হয়। একেই নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন কক্ষ, তদুপরি এর সিসি ক্যামেরাও ছিল বিকল। স্টক লিস্টের বাইরেও অনেক এয়ার রাইফেল, পিস্তল ও পয়েন্ট টুটু বোর রাইফেল পাওয়া যায়, যা ২০১২ সালেরও আগের পরিষদ বিভিন্ন ক্লাব থেকে ধারে সংগ্রহ করেছিল।

কমিটি গত ১৬ জুলাইয়ের স্টক প্রতিবেদনের সঙ্গে যেসব অসামঞ্জস্যতা পায়, সেগুলো হলোÑ ৬০টি ফায়ার ওয়ার্কস ১২ বোরের নষ্ট গুলি থাকলেও সেগুলো রেজিস্টারে দেখানো হয়নি। বিএসএসএফের স্টক লিস্টে ক্লে বার্ডস থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তা বিকেএসপিতে আছে বলে তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন এর তত্ত্বাবধায়ক। পয়েন্ট ওয়ান সেভেন সেভেন এয়ার পিস্তল হ্যামারলি এপি-২০ ও এআর-২০ স্টক প্রতিবেদনে ৯টির পরিবর্তে পাওয়া গেছে ৭টি। তদন্ত কমিটিকে তত্ত্বাবধায়ক জানিয়েছেন, দুটি বর্তমানে দুজন শুটার ব্যবহার করছেন, যার কোনো লিখিত বরাদ্দ নেই। রেমিংটন নং ৬, ৩৬ গ্রাম ৬০টি গুলি স্টকে পাওয়া যায়নি, পরিবর্তে আরসি নং ৬, ৩৬ গ্রাম ৬০টি গুলি পাওয়া যায়। পিস্তল ম্যাগাজিন অ্যারমা ১০ শট ২টির স্থলে পাওয়া যায় ৪টি। এস অ্যান্ড ডাবলু পিস্তল ম্যাগাজিন নং ৬৫২, ৫টির স্থলে পাওয়া যায় ৩টি। স্টকে সর্বমোট সংখ্যা ঠিক থাকলেও আইটেম অনুযায়ী ঠিক নেই বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, কমিটি স্টক বই ও প্রকৃত স্টকের যে অসামঞ্জস্যতা পায় তা হলÑ ২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল ১৩ হাজার ২৭০টি ১০ এক্স ইলি গুলি আগের রেজিস্টারে দেখানো থাকলেও নতুন রেজিস্টারে দেখানো হয় ১৩ হাজার ৭২০টি। ২০১২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর নতুন পরিষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর রেজিস্টারে লাপুয়া প্লিঙ্কার গুলির প্রারম্ভিক স্টক দেখায় ১ হাজার ৪২৮টি এবং ২০১৩ সালের ৩০ জুন শেষ স্টক দেখানো হয় ১২০০। এ সময়কালে ২২৮টি গুলির কোনো বিক্রি দেখানো হয়নি। ২০১২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর নতুন পরিষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর রেজিস্টারে লাপুয়া সুপার গুলির প্রারম্ভিক স্টক দেখানো হয় ৩০০টি এবং ২০১৩ সালের ৩০ জুন শেষ স্টক দেখানো হয় ১ হাজার ৪২৮টি। এ সময়ে ১ হাজার ১২৮টি গুলি কীভাবে যুক্ত হল তা দেখানো হয়নি। ২০১২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর নতুন পরিষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর রেজিস্টারে লাপুয়া র‌্যাপিড ফায়ার শর্টগুলোর প্রারম্ভিক স্টক দেখানো হয় ৫০০টি এবং ২০১৩ সালের ৩০ জুন শেষ স্টক দেখানো হয় ৩০০টি। এ সময়ে ২০০টি গুলির কোনো বিক্রি দেখানো হয়নি। ২০১২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর নতুন পরিষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর ১২ বোর নং, ৩৬ গ্রাম গুলি স্টক রেজিস্টারে ছিল শূন্য; কিন্তু বিক্রি দেখানো হয়েছে ৪০টি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৭ সালের ১ জুলাই রেজিস্টারে আরসি ৪ স্পেশাল ৩৩ গ্রাম গুলির প্রারম্ভিক স্টক দেখানো হয় ৫ হাজার ৪৯৫টি, কিন্তু কম্পিউটার সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্টক গণনায় দেখানো হয়েছে ৫ হাজার ৪৭৫টি। অর্থাৎ ২০টি গুলির হিসাব মেলেনি। ২০১৭ সালের ১ জুলাই রেজিস্টারে আরসি ৪ ম্যাগনাম নং জিরো পয়েন্ট ফোরটু গ্রামগুলোর প্রারম্ভিক স্টক দেখানো হয় ১৭ হাজার ৭৫টি, কিন্তু কম্পিউটার সফটওয়্যারে স্টক গণনা করা হয় ১৭ হাজারটি। অর্থাৎ ৭৫টি গুলির হিসাব মেলেনি। ২০১৫ সালের ১ জুলাই এয়ার প্যালেট স্টক বই (পাতা নং-১৬২) সমন্বয় করা হয় প্রকৃতভাবে প্রাপ্ত স্টক সাপেক্ষে, রেজিস্টার স্টক থেকে নয়। ফলে ফাইনাল ম্যাচ রাইফেল, পিস্তল, ডায়াবোলো, আর-১০ রাইফেল, পিস্তল মেইস্তার রাইফেল, পিস্তলের স্টক মেলেনি। অথচ বিদেশি প্রশিক্ষকরা এয়ার প্যালেট ও পয়েন্ট টুটু বোর গুলি প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে থাকেন বিএসএসএফের অফিস থেকে, সরাসরি স্টক রেজিস্টারে স্বাক্ষর করে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের ২৯ মে এলসি নং ০৩৬৪১৪০১০০০৫ স্টক রেজিস্টারে আগ্নেয়াস্ত্রের ক্রমিক নম্বর লিপিবদ্ধ হয়নি। এলসি নং ০৩৬৪১৫০১০০০২ এর মাধ্যমে ৬০ হাজার পয়েন্ট টুটু ইলি হোলো গুলি আমদানি করা হলেও স্টক রেজিস্টারে ৬০ হাজার ২০০টি লিপিবদ্ধ হয়। ওই ২০০ গুলি কোনো স্টক রেজিস্টারে দেখা যায়নি। এলসি নং ০৩৬৪১৪০১০০০৬-এর অনুকূলে আমদানিকৃত যন্ত্রাংশও স্টক রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ হয়নি। ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর অ্যাডভান্স অনুশীলন ক্যাম্প থেকে ২৪ হাজার ৬০০টি পয়েন্ট টুটু বোর ইলি ক্লাব গুলি ফেরত দেখানো হয়েছে। অনুশীলন ক্যাম্পে এত বিপুলসংখ্যক গুলি মজুদ থাকার কথা নয় বিধায় কমিটির কাছে বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।

২০১৭ সালের জুনে ১০০টি পয়েন্ট টুটু রেমিংটন এলআর গুলি ফেরত দেখানো হলেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। একই বছরের ২৭ এপ্রিল ৯৫০টি পয়েন্ট টুটু বোর ইলি সাবসনিক হোলোপয়েন্ট গুলি অনুশীলন ক্যাম্প থেকে ফেরত দেখানো হলেও সাবসনিক হোলোপয়েন্ট দিয়ে কোনো শুটিং অনুশীলন সম্ভব নয় বলে কমিটি উল্লেখ করেছে প্রতিবেদনে। এতে আরও বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট জাতীয় শুটিং প্রতিযোগিতায় এক হাজারটি বোর স্কিট গুলির চাহিদাপত্র দেওয়া থাকলেও সরবরাহ করা হয়েছে ১ হাজার ৩৬টি। এ চাহিদাপত্রেরও নেই কোনো অনুমোদন; নেই মহাসচিবের স্বাক্ষর। এমনকি অতিরিক্ত ৩৬টি গুলি প্রদানের ক্ষেত্রে গ্রহীতার স্বাক্ষরও নেওয়া হয়নি। একই বছরের ২০ ডিসেম্বর ট্যালেন্ট হান্ট প্রোগ্রামের জন্য গুলির চাহিদাপত্রে মেলেনি মহাসচিবের স্বাক্ষর। বিভিন্ন সময়ে স্টক জার্নাল লিখে স্টকের সঙ্গে গুলির প্রকৃত সংখ্যার যোগ-বিয়োগ করে সমন্বয় করা হয়েছে। বিভিন্ন অনুশীলন ও প্রতিযোগিতা থেকে অব্যবহৃত গুলি এভাবে সমন্বয় করার তথ্য কমিটি পেলেও এ সাপেক্ষে তারা কোনো প্রমাণপত্র পায়নি। ২০১৬ সালের ১ মার্চ চালান নং ৪১১ বিপরীতে পয়েন্ট টুটু বোর ইলি ক্লাব গুলি ১ হাজারটির স্থলে রেজিস্টারে ২ হাজারটি লিপিবদ্ধ রয়েছে। ওই বছরের ৫ মার্চ চালান নং ৪২২ বিপরীতে ২ হাজারটি ১৭৭ পেলেট প্রদান করা হলেও রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা হয়নি। ওই বছরের ৩০ জুলাই স্লাভিয়া এয়ার রাইফেল ফাইভ পয়েন্ট ফাইভ পিরোজপুর রাইফেল ক্লাবকে বরাদ্দপত্রে ৩৫ হাজার টাকা মূল্য লেখা থাকলেও ডেলিভারি চালানে মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। ২০১৬ সালের ১ মার্চ নেত্রকোনা রাইফেল ক্লাব .২২ বোর গুলি কেনে ১ হাজারটি (চালান নং ৪১১)। কিন্তু স্টক বইয়ে বরাদ্দ দেখানো হয় ২ হাজারটি। ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল ৮ম বাংলাদেশ গেমস উপলক্ষে ১০০টি ১২ বোর ৭.৫, ২৮ গ্রাম গুলি বরাদ্দ করা হয়; চালান নং ২১৭৯, কিন্তু গুলিগুলো স্কিট প্রতিযোগিতায় ব্যবহার করা হয়নি। পরের বছরের ২০ মে ০৭৭ চালানের বিপরীতে ২০ হাজারটি এয়ার পেলেট বরাদ্দ করা হলেও সেগুলো স্টক বইতে সমন্বয় করা হয়নি। একই বছরের ২৬ আগস্ট ০৯৫ নং চালানের বিপরীতে ২ হাজার ৫০০টি ১২ বোর গুলি বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু সেগুলোও স্টক বইতে সমন্বয় করা হয়নি। ২০১৪ সালের ১৯ নভেম্বর ০১২১ চালানের বিপরীতে ৩০০টি ১২ বোর গুলি বরাদ্দ করা হয় যা স্টক বইতে ২৫০টি দেখানো হলেও বিয়োগ করা হয়নি। এর আগের বছরের ২৪ মার্চ ২১৫৩ নং চালানের বিপরীতে ১ হাজারটি এয়ার পেলেট বরাদ্দ করা হলেও স্টক বইতে দেখানো হয় ১ হাজার ২০০টি। স্টক বইপাতা ৮০ তে পয়েন্ট ২২ বোরের গুলি এলআর ১৯২২১৫০টি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রেজিস্টারে ২৫০টি দেখায় রক্ষণাবেক্ষণ সংশ্লিষ্টরা।

advertisement