advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

জুতার টাকাও ফেরত দিচ্ছে না ইভ্যালি (অডিও)

জনি রায়হান
১৯ নভেম্বর ২০১৯ ১৪:১৫ | আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০১৯ ১৯:২২
advertisement

শুধু বাইক নয়, ইভ্যালির ‘বাটা জুতা’র অফার নিয়েও উঠেছে নানা রকমের অভিযোগ। প্রতিশ্রুতির সময় পেরিয়ে গেলেও অনেককেই সেই জুতা ডেলিভারি দেয়নি বিশাল ডিসকাউন্টে পণ্যের অফার দিয়ে আলোচনায় আসা অনলাইন শপটি। শুধু তা-ই নয়, বাটা জুতার অর্ডার বাবদ নেওয়া টাকাও অনেককে ফেরত দেয়নি ‘ইভ্যালি’।

গ্রাহকদের অফারের ফাঁদে ফেলে ইভ্যালির নানা হয়রানি উঠে এসেছে দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনের অনুসন্ধানে। ইভ্যালির বাইক অর্ডার করে এক যুবকের ‘এলাকাছাড়া’ হওয়ার সংবাদের পর আজ  প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় পর্ব।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত আছেন মো. নুর এ আলম দিপু। বর্তমান অনলাইন মার্কেটের একজন নিয়মিত ক্রেতা তিনি। কিছু দিন আগে ইভ্যালির দেওয়া ৫০% ডিসকাউন্ট অফারে এক জোড়া বাটা জুতা অর্ডার করেছিলেন দিপু। কিন্তু সময় মতো সেই অর্ডার করা জুতা ডেলিভারি দেয়নি ইভ্যালি। পরে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে প্রায় দুই মাস ধরে তাকে ঘোরানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

ইভ্যালির কাস্টমার কেয়ারে অনেকবার ফোন করে বিষয়টি জানিয়েছেন দিপু। রিফান্ডের নিয়ম মেনে তাকে মেইল করতে বলা হয়। সেই অনুযায়ী তিনি মেইলও করেছেন। কিন্তু টাকা ফেরত পাননি। কাস্টমার কেয়ার থেকে ফোন করে কয়েকবার তার কাছ থেকে বিকাশ নম্বর নেওয়া হয়েছে টাকা ফেরত দেওয়া জন্য। ইভ্যালির বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার পোস্টও দিয়েছেন দিপু। কিন্তু ৫৬ দিন পার হয়ে গেলেও এখনো তাঁর টাকা ফেরত দেয়নি ইভ্যালি। এমনকি বিষয়টি নিয়ে তিনি ভোক্তা  অধিকারে অভিযোগ দায়ের করবেন জানালে ইভ্যালির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘ঠিক আছে’।    

টাকা ফেরত দেওয়া (রিফান্ড) নিয়ে দিপুর সাথে ইভ্যালির সব ধরনের যোগাযোগের এবং কাস্টমার কেয়ারের সঙ্গে তারা কথোপকথনের রেকর্ড দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনের হাতে রয়েছে।

ভুক্তভোগী দিপুর দাবি, তাঁর মতো এমন হাজার হাজার মানুষের রিফান্ডের টাকা ফেরত দিচ্ছে না ইভ্যালি। প্রত্যেকের এমন ছোট ছোট টাকা একত্রে হিসাব করলে তা হয়তোবা বিশাল অংকের টাকা হবে।

দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে দিপু বলেন, 'আমি প্রায় দুই মাস আগে ইভ্যালির ৫০% ডিসকাউন্ট অফার দেখে এক হাজার টাকা মুল্যের এক জোড়া বাটা জুতা অর্ডার করেছিলাম। নিয়ম অনুযায়ী আমি তখন ৫০০ টাকা ইভ্যালিকে দিয়েছি। কিন্তু তারা আমার জুতা জোড়া দিতে পারে নাই। উল্টো টাকা ফেরত চাইলেও দিনের পর ঘোরাচ্ছে। আমি অনেক বার তাদের সাথে সব দিক থেকে যোগাযোগ করেছি। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, রিভিউ গ্রুপে এবং কাস্টমার কেয়ারে অনেক বার কথা বলেছি। প্রথমে তারা আমাকে অর্ডার ক্যানসেল করে নিয়ম অনুযায়ী একটা মেইল করতে বলেছিল।'

পরবর্তী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে দিপু বলেন, 'এরপর আমি তাদের মেইল করেছি। পরে কাস্টমার কেয়ার থেকে ফোন করে আমার কাছে বিকাশ নাম্বার নিয়েছে। কিন্তু এরপরেও এত দিনে তারা আমার টাকা রিফান্ড করে নাই। বরং আবারও কাস্টমার কেয়ারে ফোন দিলে তারা দেখছি, দেখছি বলে সময় পার করছে। আমার ৫০০ টাকা হয়তোবা খুব বড় অ্যামাউন্ট না। কিন্তু এমন যদি আরও ৫০ হাজার মানুষ ৫০০ টাকা করে তাদের দিয়ে থাকে তাহলে তো সেটা একসাথে যোগ করলে টাকার অঙ্কটা অনেক বড় হবে।'

দিপু বলেন, 'সর্বশেষ আজও (১৮ নভেম্বর) আমি তাদের রিভিউ গ্রুপে সব কিছু প্রমাণসহ পোস্ট দিয়েছি। কিন্তু তারা কোনো রিপ্লাই দেয় নাই। পরে বিষয়টি নিয়ে ভোক্তা অধিকারে অভিযোগ করব বলে জানালে তারা তাচ্ছিল্য ভাব দেখিয়েছে। বলেছে, ঠিক আছে।’

ভুক্তভোগী আরও অনেকে

ইভ্যালির ইন্সট্যান্ট হেল্প অ্যান্ড রিভিউ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি পেজে বাটা জুতা অর্ডার করা অনেক ক্রেতা তাদের হয়রানির বিষয়টি জানিয়েছেন।

ফারহান শাহরিয়ার নামের এক ব্যক্তি ইভ্যালির ইন্সট্যান্ট হেল্প অ্যান্ড রিভিউ গ্রুপে একটি পোস্ট দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘কেউ বাটার রিফান্ড পাইছেন?’ তাঁর ওই পোস্টে মুহূর্তেই অনেকে কমেন্ট করে জানিয়েছেন, 'না। এক ব্যক্তি আবার লিখে জানান, তাকে কল দিয়ে বাটার জুতা কিনে নিতে এবং ক্লেইম মেইল করতে বলেছে ইভ্যালি।’

একই ফেসবুক গ্রুপে সোহানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি কমেন্টেসে তাঁর অর্ডার নম্বর উল্লেখ্য করে লিখেছেন, 'আমি ইমেইল করছি, ফরম ফিলাপ করছি। বলেছি মুল টাকা রিফান্ড করতে, তাও করে না। ’

শেখ সাদি নামের অপর এক ব্যক্তিও এমন অভিযোগ করে লিখেছেন, ‘এদের বিরুদ্ধে মামলা করা দরকার। ৩৬ দিন আগে অর্ডার করেছি, মনে হয় না পণ্যটি পাব।’

ইভ্যালি ডটকম বিডিতে তাদের একটি পোস্টের নিচে গাজী মাসরুর আহেমদ নামের এক ব্যক্তি তাঁর অর্ডার নম্বর উল্লেখ করে লিখেছেন,' বাটা জুতার অর্ডারটা ৩৯ দিন হয় দিছি। ডেলিভারির কোনো নাম নাই। পণ্যটি পাব কি? পণ্য না দিলে টাকাটা রিফান্ড করেন দয়া করে। আপনাদের সার্ভিস নিয়ে খুব হতাশ।'

রিফান্ড পাননি, উল্টো নগদ টাকায় কিনতে হয়েছে পণ্য

বাটার পণ্য যাদের সময় মতো দিতে পারেনি তাদের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে রিফান্ড ক্লেইম মেইল করতে বলে ইভ্যালি। রিফান্ডের জন্য বাটার যেকোনো শো রুম থেকে পণ্যের প্রাইজ ট্যাগের ছবি তুলে এবং পণ্যের বিস্তারিত তথ্য দিয়ে  রিফান্ডের মেইল করতে হয়। কিন্তু এত কিছু করার পরও অনেকেই রিফান্ড পাননি। উল্টো ইভ্যালির পরামর্শে নগদ টাকায় পণ্য কিনতে বাধ্য হয়েছেন এক ব্যক্তি। এখনো পাননি রিফান্ডের টাকাও।

সাইফ রাইহান নামের ওই ব্যক্তি ইভ্যালির ইন্সট্যান্ট হেল্প অ্যান্ড রিভিউ ফেসবুক  গ্রুপটিতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, ' ইভ্যালির রিফান্ড নাটক। ২০ সেপ্টেম্বর রেগুলার দামে বাটার একটি ওয়ালেট অর্ডার করি। তারপর ৫০% ছাড়ে হয়তোবা অনেকে অর্ডার হয়েছে। তাই প্রায় ৪০ দিন পরে ৩১ অক্টোবর আমাকে জানানো হলো যে বাটার একটি শো রুম থেকে একটি ওয়ালেট কিনে সেটার ছবি তুলে মেইল করে দিতে। তাহলে তারা রিফান্ড করবে। আমি বাটা থেকে ১১০০ টাকায় একটা ওয়ালেট কিনে ছবি তুলে তা মেইল করে দেই। তারপর কেটে গেল আরও ১২ দিন। কোনো খোঁজ নাই। এরপর একটি মেইলে আবার আমাকে ডিটেইলস দিতে বলল। তাও দিলাম। এর বাইরেও যে কাস্টমার কেয়ারে কত বার কল দেওয়া লেগেছে তাঁর হিসাব নাই।'

সাইফ রাইহান আরও লিখেছেন, 'এখন যুক্তির কথায় আসেন। যদি আমার পণ্য দিতে না পারে ইভ্যালি, সেটা কার ত্রুটি? আরও পণ্য দিতে না পারলে রিফান্ড করে দিতে এত নাটক কি প্রয়োজন? শো রুমে যান, ছবি তুলে দেন, বিস্তারিত তথ্য দেন, মেইল করেন, মেইলের উত্তর দেন...অপেক্ষা করেন ইত্যাদি। এখন পর্যন্ত টাকা রিফান্ড করে নাই। টাকা বড় কথা না, কিন্তু এসব আমাদেরকে হেনস্তা করা ছাড়া আর কিছুই না।'

ভোক্তা অধিকার আইনে যা বলা আছে

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৪৫ ধারায় বলা আছে, প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করা হলে অনূর্ধ্ব এক বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

 ৫২ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত বিধি-নিষেধ অমান্য করে সেবাগ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে-এমন কোনো কার্য করা হলে অনূর্ধ্ব তিন বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড শাস্তি হতে পারে।

৫৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সেবাপ্রদানকারী কর্তৃক অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা অসতর্কতা দ্বরা সেবাগ্রহীতার অর্থ বা স্বাস্থ্যহানী ঘটানো হলে অনূর্ধ্ব তিন বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের শাস্তি হতে পারে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে  জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘এমন অফারের নামে কোনো ক্রেতা হয়রানি বা প্রতারণার শিকার হয়ে অভিযোগ দায়ের করলে এবং তদন্তে সেটি প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ই-ক্যাবের বক্তব্য

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ তমাল দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘আমরা সরাসরি এখনো কোনো ক্রেতার এমন অভিযোগ পাইনি। তবে ফেসবুক এবং অনলাইনের মাধ্যমে ইভ্যালির কিছু সমস্যার বিষয় আমাদের নজরে এসেছিল। আমরা সেগুলো ইভ্যালিকে জানিয়েছি। তারা সেটার ব্যবস্থা নিয়েছে।’

ইভ্যালির বক্তব্য

এই বিষয়ে ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রাসেল দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, 'বিশেষভাবে বাটার কেসটা হলো, বাটা তাদের সারা দেশের সকল শো রুম মিলেও আমাদের অর্ডারের পণ্য পুরোপুরি দিতে পারে নাই। এখন আমরা তো সেটা বলে দিতে পারি না। বাটা সব চেষ্টা করেও আমাদের সাপোর্ট দিতে পারে নাই। এসব কারণে বাটার সেই অফারের জুতা ১৫ দিনে ডেলিভারি করার কথা থাকলেও সেটা দিতে আমাদের ৩০ দিন বা ৪৫ দিন পর্যন্ত লেগে গেছে। এমন তো না যে ১৫ দিনের মধ্যে কেউই পায়নি।'

ইভ্যালির সিইও আরও বলেন, 'কোনো ক্রেতা যদি বলেন যে, এই পণ্য দেরি হচ্ছে আমার লাগবে না, তখন আমরা বলি যে ক্যানসেল করে দেন। আমরা ক্যাশ ব্যাক বা রিফান্ড করে দিব। কেউ অর্ডার ক্যানসেল করে রিফান্ড পায়নি এমন অভিযোগ সত্য নয়। নিদিষ্ট নিয়ম মেনে অর্ডার ক্যানসেল করে মেইল দিলেই আমরা দ্রুত তাঁর রিফান্ড করে দেই।'

 

আরও পড়ুন-

ইভ্যালির ‘প্রতারণা’, এলাকাছাড়া হওয়ার পর বাইক পেল যুবক  

advertisement