advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

লবণ নিয়ে ষড়যন্ত্র

গোলাম রাব্বানী
২০ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২০ নভেম্বর ২০১৯ ১০:০০
গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর গতকাল কুড়িগ্রামের উলিপুর বাজারে লবণের জন্য ক্রেতাদের ভিড়। ছবি : শিমুল দেব
advertisement

ছোটখাটো ছুতোয় এক শ্রেণির ব্যবসায়ী প্রায়ই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের পর সংকটের অজুহাত তুলে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। গত কয়েকদিন ধরে বেড়েছে চালের দামও। গতকাল গুজব ছড়িয়ে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে লবণের দাম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বার্থানেষী মহল বাজার অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এসব করছে। এর মাধ্যমে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী লুটে নিচ্ছে অধিক মুনাফা। দেশে লবণের কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে দেশে লবণের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় দুই ব্র্যান্ড এসিআই ও মোল্লা সল্টও বলছে, সরকারকে বিব্রত করতেই লবণ সংকটের গুজব ছড়ানো হয়েছে। লবণের পর্যাপ্ত মজুদ থাকার কথাও জানিয়েছেন তারা।

‘লবণের দাম বাড়ছে’-এমন গুজবে কান দিয়ে ঢাকাসহ সারাদেশে লবণ কিনতে দোকানগুলোয় হুমড়ি খেয়ে পড়েন ক্রেতারা। এ সুযোগ নেন খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। বেশি মুনাফার আশায় অনেকে লবণ মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা চালান। বাজার ঘুরে দেখা গেছে লবণের কোনো সংকট নেই। বাড়তি দামে বিক্রিরোধে গতকাল তাৎক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও কাজ শুরু করে।

গুজব ছড়িয়ে দাম বাড়ানোর বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারি দিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সরকারি এক প্রেসনোটে বলা হয়েছে, দেশে লবণের কোনো সংকট নেই বা এমন কোনো সম্ভাবনাও নেই। লবণ নিয়ে কিংবা অন্য কোনো বিষয়ে কোনো ব্যক্তি বা মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোনোভাবে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতে, দেশে এখনো চাহিদার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি লবণ মজুদ আছে। মিলগুলো ২ মাসের লবণ সরবরাহের অপেক্ষায় রয়েছে। আর লবণের বাম্পার উৎপাদনের ফলে চাষিদের কাছেও চাহিদার প্রায় ৪ মাসের লবণ রয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হঠাৎ করেই লবণ কেনার হিড়িকের পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিগুলো এসব কথা জানায়।

শিল্প মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে সাড়ে ৬ লাখ টনের বেশি ভোজ্য লবণ মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের লবণচাষিদের কাছে ৪ লাখ ৫ হাজার টন এবং বিভিন্ন লবণ মিলের গুদামে ২ লাখ ৪৫ হাজার টন লবণ মজুদ রয়েছে। মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, দেশে প্রতিমাসে ভোজ্য লবণের চাহিদা কম-বেশি এক লাখ টন। অন্যদিকে লবণের মজুদ আছে সাড়ে ৬ লাখ টন।

এদিকে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, লবণের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে এমন একটি গুজব ছড়িয়ে স্বার্থান্বেষী মহল জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং তথ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, দেশের ছয় লাখ টন লবণ মজুদ রয়েছে, যা আমাদের চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। তাই লবণের মূল্য বৃদ্ধির কোনোই সম্ভাবনা নেই। তাই দেশের সম্মানিত জনসাধারণকে গুজবে কান না দিতে এবং বিভ্রান্ত না হতে অনুরোধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের কোথাও লবণের অতিরিক্ত দাম চাওয়া হলে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে অথবা নিকটস্থ পুলিশকে অনুরোধ করা হলো।

গতকাল দেশের বিভিন্ন স্থানে ৬০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে লবণ বিক্রি হতে দেখা গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশে লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে-তাই পুলিশ সদস্যদের দোকানে দোকানে গিয়ে তল্লাশি চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল দুপুরে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (অপারেশন) মনিরুল ইসলাম এ নির্দেশ দেন। নির্দেশনা পেয়ে থানা এলাকার পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন দোকানে গিয়ে লবণের মজুদের খোঁজখবর নিচ্ছেন।

মুগদাপাড়া এলাকায় বিকালে দোকানে দোকানে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বেশি দামে লবণ বিক্রি করায় কয়েকজনকে আটক করে। এ ছাড়া ধানম-ি ও হাজারীবাগে অভিযান চালিয়ে ৫ জনকে আটক করা হয়।

ধানম-ি থানাপুলিশ জানায়, ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ পেয়ে ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকার সুপার শপ এবং দোকানগুলোয় লবণের খোঁজে পুলিশ যায়। গিয়ে দেখে অনেক দোকানে লবণ শেষ। কী কারণে তাদের লবণ নেই, চালানের সঙ্গে মজুদের পরিমাণ দেখা হচ্ছে। তবে বেশির ভাগ দোকানে গিয়ে লবণ পাওয়া যায়নি।

গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে মগবাজার, মালিবাগ, কমলাপুরের অধিকাংশ দোকানে লবণ শেষ হয়ে গেছে বলে জানান দোকানদাররা। এ ছাড়া দেশের অনলাইনভিত্তিক শীর্ষ প্রতিষ্ঠান চালডাল ডটকম গতকাল বিকালে তাদের ওয়েবসাইট থেকে লবণ স্টক আউট দেখাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, প্রায় সপ্তাহখানেকের লবণ মজুদ হঠাৎ শেষ হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে স্টক আউট, তাই অনেক ক্রেতাকে আমরা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছি।

গতকাল সন্ধ্যায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পুরান ঢাকার নয়াবাজারে অভিযান চালাচ্ছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল মামুন। অভিযানের শুরুতে তিনি বাজারের পাইকারি দোকানগুলোয় লবণের মজুদ নজরদারি করছেন। ব্যবসায়ীদের কাছে লবণের দাম বৃদ্ধি ও সংকটের কারণ জানতে চাইছেন।

লবণসংক্রান্ত বিষয়ে তদারকির জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) প্রধান কার্যালয়ে ইতোমধ্যে একটি ‘কন্ট্রোল রুম’ খুলেছে। কোথাও লবণের বাড়তি দাম রাখা হলে কন্ট্রোল রুমের নম্বর ০২-৯৫৭৩৫০৫ এবং ০১৭১৫২২৩৯৪৯ নম্বরে যোগাযোগ করে অবহিত করতে অনুরোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্রে ০১৭৭৭-৭৫৩৬৬৮ নম্বরেও যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়।

এ বিষয়ে বিসিকের চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ও চাহিদার তুলনায় বেশি লবণ উৎপাদিত হয়েছে। এ জন্য চামড়ার মৌসুমেও লবণের দাম বৃদ্ধি পায়নি। আর এখন দাম বৃদ্ধি বা সংকট হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তাই ভোক্তাদের বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

দেশে লবণ সরবরাহকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এসিআই সল্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আলমগীর বলেন, লবণ নিয়ে ক্রেতাদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সরবরাহের কোনো সমস্যা নেই। দামও বৃদ্ধি পায়নি। এটা সম্পূর্ণ গুজব।

মোল্লা সল্টের মহাব্যবস্থাপক আবদুল মান্নান বলেন, আমরা দাম বাড়াইনি। সরবরাহ ঠিক আছে। আগামী দুই মাস মিল চালানোর মতো লবণ আমাদের হাতে আছে। ঘাটতি তো নেই-ই, উল্টো বিক্রি কম। এর কারণ শুল্কমুক্ত বন্ডের লবণ বাজারে চলে আসছে। দেশি কৃষক ও মিলমালিকরা বিপাকে আছেন।

পূবালী সল্টের মালিক পরিতোষ কান্তি সাহা বলেন, আমাদের কাছে লবণের অভাব নেই। বর্তমানে অপরিশোধিত লবণের বস্তা (৭৫ কেজি) ৫৮০ থেকে ৬০০ টাকা। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে অনেকেই লবণ আমদানি করেছে। যার ফলে চাষিরা কম মূল্য পাচ্ছেন।

বাজারে এখন বিভিন্ন কোম্পানির সবচেয়ে ভালো মানের লবণের প্যাকেটের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লেখা ৩৫ টাকা। আর সাধারণ লবণের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২৫ টাকা। তবে কারওয়ানবাজারে সাধারণ খোলা লবণ গতকাল ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হয়।

প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর থেকে জানা যায়-

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে গুজব ছড়িয়ে ২০ টাকা কেজি দামের লবণ ৬০-৭০ টাকায় বিক্রির অভিযোগে গতকাল ভ্রাম্যমাণ আদালত ৬ ব্যবসায়ীকে ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হাট-বাজারগুলোয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লবণ গত সোমবার ৩৫-৩৮ টাকায় বিক্রি হলেও হঠাৎ করে গতকাল মঙ্গলবার বিক্রি হয়েছে ৪৮ টাকা দরে।

সিরাজগঞ্জে উল্লাপাড়ার গ্রামের হাট-বাজারগুলোয় প্রতি কেজি লবণ বিক্রি হয় ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়। আবার কোথাও কোথাও প্রতি কেজি ৮০ টাকায়ও বিক্রি হয়।

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় লবণের দাম বৃদ্ধির গুজব ছড়িয়ে পড়লে উজেলার চৌরাস্তা বাজার, ভজনপুর বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজারের দোকানগুলোয় ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। অনেকে ৪-৫ কেজি করে লবণ কেনেন। এ সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী ৩৫ টাকা কেজির লবণ ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করেছেন।

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে বিভিন্ন দোকানে লবণ কেনার হিড়িক পড়েছে। লবণ ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। লবণের কেজি ২শ টাকা হবে-এমন গুজবে কেনার হিড়িক পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে ৩০ টাকা কেজির লবণ ১০০ টাকায় বিক্রি শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। খবর পয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুশান্ত কুমার মাহাতো অভিযান চালিয়ে ব্যবসায়ী সুসিল সাহাকে ৫ হাজার টাকা এবং বামিহালের দুর্গাপুরে মানিক হোসেনকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করেন। টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় বাজারে প্রতিকেজি লবণ ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়।

বরগুনার পাথরঘাটায় লবণের দাম বৃদ্ধির গুজবে সকাল থেকেই উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে লবণ ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। পাথরঘাটা বাজারের লবণ বিক্রেতা জাকির হোসেন হোসেন প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ কেজি লবণ বিক্রি করেন। গতকাল বিক্রি করেছেন ৫শ কেজি। অতিরিক্ত মূল্যে লবণ বিক্রির কারণে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পাথরঘাটা বাজারে প্রায় এক টন লবণ জব্দ করেন।

advertisement