advertisement
advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আন্দোলনে পথশিশু ব্যাংকিং পিছিয়ে কেন

মাহফুজুর রহমান
২০ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২০ নভেম্বর ২০১৯ ০২:১০
মাহফুজুর রহমান
advertisement

বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আন্দোলন শুরু হয় ২০১০ সালের দিকে। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কাজটি বিশ্বব্যাপী শুরু হয়েছে। দরিদ্র ও ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর মাথার ওপর ব্যাংকিং সেবা ছড়িয়ে দিয়ে তাদের দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ইতিবাচক ও টেকসই কর্মে নিয়োজিতকরণের কাজে নেতৃত্ব প্রদানই এর লক্ষ্য। বিশ্বব্যাপী এ কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে অ্যালায়েন্স ফর ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন (আফি)। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯৪ দেশ এর সদস্য। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আফির আনুষ্ঠানিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সদস্য দেশগুলোকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে প্রতিবছর ‘মায়া ডিক্লারেশন’ নামের সাংবৎসরিক টার্গেট ঘোষণা করতে হয়। পরে বছরব্যাপী কাজ করে সেই টার্গেটে পৌঁছার চেষ্টা করতে হয়। আফির পরবর্তী সম্মেলনে মায়া ডিক্লারেশনের সফলতা দেখে দেশগুলোকে পুরস্কৃত করা হয়।

২০১০ সালে চালু হওয়া বাংলাদেশের এই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমে সফলতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের আর্থিক উন্নতির লক্ষ্যে বাংলাদেশ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে বিগত মেয়াদে আফির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয়েছিল। বিগত ১১-১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে মধ্য আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালিতে আফির বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর প্রতিষ্ঠানটির জন্য কিছু নতুন পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে তার দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে শেষ করেন। পরবর্তী মেয়াদের জন্য মিনরের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর তারেক হাসান আমর আফির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

আফির এবারের বার্ষিক সাধারণ সভায় কিগালি ঘোষণা হিসেবে `Accelerating Financial Inclusion for the Disadvantage groups' বিষয়টি সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে মূল প্রতিপাদ্য বলে অনুমোদিত হয়েছে। এই ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, আফি তার বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাবলিক সেক্টরকে প্রবিধি ও নীতি প্রণয়নে সহায়তা প্রদান ও প্রাইভেট সেক্টর থেকে প্রযুক্তি ও আর্থিক পণ্য উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্বের আর্থিক সেবাভুক্তির চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনলেও এখনো নারী, যুব, বৃদ্ধ, বাস্তুচ্যুত ও বিকলাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মতো অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবার বাইরে রয়ে গেছে। তাই কিগালি স্টেটমেন্ট আফির সদস্যদের মাঝে সহযোগিতামূলক উদ্যোগ ও বাস্তবধর্মী কর্মপরিকল্পনার ব্যাপারে একটি ঐকমত্য তৈরি করে আর্থিক সেবাভুক্তিকে ত্বরান্বিত করবে, যাতে করে কেউ আর্থিক পরিষেবার বাইরে না থাকে। আফির এই উদ্যোগ ও সিদ্ধান্ত অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।

বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে জন-অবহিতির লক্ষ্যে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত দশ দিনের একটি রোড শো অনুষ্ঠিত হয়। এতে সরকারের দুবছরের আর্থিক অগ্রগতির পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বেশ কতগুলো বিষয় জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান চালু করেন কৃষক ও সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিশেষ সুবিধাযুক্ত হিসাব খোলার কাজ। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রথমবারের মতো দেশের হতদরিদ্র মানুষের জন্য মাত্র ১০ টাকা জমা রেখে হিসাব খোলার উদ্যোগ নেয়। এতে সমাজে সবিশেষ সাড়া পাওয়া যায়। সরকারি অনুদান এবং ভর্তুকি প্রদানের ক্ষেত্রে আগে যেসব অনিয়মের কথা শোনা যেত সেগুলো দূরীভূত হয়ে যায় এসব হিসাবে টাকা প্রদানের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব সুবিধাবঞ্চিত মানুষের হিসাব সচল রাখা এবং তাদের সঙ্গে ব্যাংকের সুসম্পর্ক গড়ে তোলার স্বার্থে ২০০ কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন ঋণ তহবিল গড়ে তোলে। এতে অসহায় এসব মানুষ বেশ উপকৃত হয়েছেন। বর্তমানে (৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯) ব্যাংকগুলো এসব অসহায় কৃষকের হিসাবের সংখ্যা হচ্ছে ১ কোটির চেয়ে বেশি; আর এসব হিসাবে পুঞ্জীভূত জমার পরিমাণ ৩৩৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা। আর কৃষকসহ সব শ্রেণির সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের হিসাবের সংখ্যা হলো ২ কোটি ৩ লাখ ৩১ হাজার; এই হিসাবগুলো পুঞ্জীভূত জমার পরিমাণ ২ হাজার ১৭৩ কোটি টাকারও অধিক। পর্যায়ক্রমে এই খাতে হিসাবের সংখ্যা ও জমার পরিমাণ বাড়ছে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আরেকটি খাত হলো স্কুল ব্যাংকিং। ১৮ বছরের কম বয়স্ক শিক্ষার্থীদের ব্যাংকের প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং সঞ্চয়প্রবণ মনোভাব গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০১০ সালে শুরু করা হয় স্কুল ব্যাংকিং। এ খাতেও দিন দিন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্কুল ব্যাংকিং কনফারেন্স আয়োজনের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের হিসাব খোলাকে উৎসাহিত করা হয়। এই কর্মসূচির আওতায় একজন ছাত্র বা ছাত্রী ১০০ টাকা জমা করে ব্যাংকে হিসাব খুলতে পারে। এসব হিসাবে কোনো চার্জ কাটা হয় না এবং সর্বোচ্চ হারে সুদ বা মুনাফা প্রদান করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ৫৫টি ব্যাংক এই কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে ব্যাংকগুলো কর্তৃক পরিচালিত মোট স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের সংখ্যা ছিল ২০ লাখ ৭২ হাজার; আর এসব হিসাবে পুঞ্জীভূত আমানতের পরিমাণ ১ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ গড়ে প্রতিটি হিসাবে জমা আছে ৮ হাজার ৭২১ টাকা। দিন দিন স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের সংখ্যা আরও বেড়ে চলেছে।

এবার আসা যাক পথশিশু ও কর্মজীবী শিশু-কিশোরদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির চিত্র প্রসঙ্গে। পথশিশু ও কর্মজীবী শিশু-কিশোরদের প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সহায়তার আওতায় আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৪ সালের ৯ মার্চ নির্দেশনা প্রদান করে। আইনত যেহেতু কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর চুক্তি করার অধিকার নেই তাই এসব শিশুর হিসাব খোলার জন্য অনুমোদিত এনজিও প্রতিনিধির সহায়তায় ও অভিভাবকত্বে ব্যাংকে হিসাব খোলার নিয়ম চালু করা হয়। সেভ দ্য চিলড্রেনের নেতৃত্বে পথশিশুদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কাজে সহযোগিতা করার জন্য ১৫টি এনজিও এগিয়ে আসে।

পথশিশু বা কর্মজীবী শিশুদের কোনো অভিভাবক নেই। অনেকেই রাস্তায় রাত কাটায়। তাই তাদের প্রতিদিনকার রোজগার থেকে যদি কোনো সঞ্চয় করা সম্ভব হয় তা হলে সেই টাকা জমা রাখার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাদের হতদরিদ্র আত্মীয়দের যারা বস্তি এলাকায় বসবাস করেন তাদের কাছে টাকা জমা রাখতে এরা নিরাপদবোধ করে না। আবার জমানো টাকা নিজের কাছে রাখাও নিরাপদ নয় বিধায় টাকা অপ্রয়োজনেই ব্যয় করা হয়। অনেকে এভাবেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। পথশিশুদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই কর্মসূচিতে বয়োপ্রাপ্তির পর তাদের পেশা নির্বাচনের পাশাপাশি ঋণ প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়। পথশিশুরা ব্যাংকে টাকা জমিয়ে যখন একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকার মালিক হবে এবং সে ১৮ বছর বয়স পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হবে, তখন তার ইচ্ছা অনুসারে প্রয়োজনবোধে ব্যাংক সহজ শর্তে তাকে ঋণও দেবে। ধরা যাক, একটি শিশু বড় হয়ে ভাড়ায় চালানোর জন্য একটি ট্যাক্সি কিনতে চায়। সে ক্ষেত্রে তার হিসাবে ট্যাক্সির দামের শতকরা ৩০ বা ৪০ ভাগ টাকা জমা হওয়ার পর বাকি টাকা ঋণ দিয়ে ব্যাংক তাকে একটি ট্যাক্সি কিনে দেবে। শুরুর পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এবং এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে বেশ আগ্রহী ও উদ্যোগী ছিল। গত ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে অংশগ্রহণকারী ১৯টি ব্যাংকে এই খাতে খোলা হিসাবের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৯০৯টি; আর এসব হিসাবে পুঞ্জীভূত জমার পরিমাণ ছিল ৩৫ লাখ ২৬ হাজার ৬৫১ টাকা। অর্থাৎ গড়ে প্রতিটি হিসাবে জমা আছে ৭১৮ টাকা।

ঠিকানাহীন, অভিভাবকহীন পথশিশুদের সংখ্যা কত? এ ব্যাপারে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরেই অসংখ্য পথশিশু দেখা যায়। তাদের যথাযথ উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংকে নিয়ে আসা এবং তাদের হিসাব খোলা এবং মনের ভেতর স্বপ্ন তৈরি করার উদ্যোগ দেখা যায় না। এনজিওকর্মীরা প্রথমে এই উদ্যোগকে মানবিক ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য কল্যাণময় ভাবলেও পরবর্তী পর্যায়ে তারা উদ্যোগ হারিয়েছেন। কারণ এ ক্ষেত্রে তাদের এক বা একাধিক কর্মীকে এই কাজে নিয়োজিত রেখেও তারা তেমন কোনো সুবিধা পাচ্ছিলেন না। দু-একটি এনজিও কাজটিকে লোকসানি উদ্যোগ বলেও মন্তব্য করেছে। তা ছাড়া ব্যাংকগুলোও এ বিষয়ে আগ্রহ এবং উদ্যোগ দেখাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষেও এই খাতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ আছে বলে মনে হয় না। দেশের বৃহত্তম ব্যাংক হচ্ছে সোনালী ব্যাংক। দেশব্যাপী তাদের রয়েছে ১ হাজার ২১০টি শাখা। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ছয় বছর আগে এই নির্দেশনাটি জারি করার পর অদ্যাবধি ব্যাংকটি পথশিশুদের মাত্র ১০টি হিসাব খুলেছে এবং এসব হিসাবে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা জমা করেছে। পথশিশুদের এই ১০টি হিসাবের ভেতর ৬টিই খোলা হয়েছে গত ত্রৈমাসিকে। ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ ও আন্তরিকতার কিছুটা হলেও বহির্প্রকাশ এটি। অন্যান্য ব্যাংকের অবস্থাও হতাশাব্যঞ্জক। কেবল সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড হিসাব খুলেছে ১ হাজার ১৪১টি। ব্যক্তিমালিকানা খাতের প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড গত ত্রৈমাসিকে তাদের ব্যাংকের সঙ্গে পরিচালিত ৪০টি হিসাবের সবগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। গত ত্রৈমাসিকের চেয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে সমাপ্ত ত্রৈমাসিকে পথশিশুদের হিসাব সংখ্যা ও জমাকৃত টাকার পরিমাণ যথাক্রমে ৪.৬২ শতাংশ ও ৬.৯৯ শতাংশ কমে গেছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানা যায়নি।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই খাতটি চরমভাবেই অবহেলিত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি এনজিওগুলোর যথাযথ উদ্যোগ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই কর্মসূচিকে সফল করতে পারে এবং সমাজের সবচেয়ে সম্ভাবনাহীন একটি গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে হয়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবার উদ্যোগ ও আগ্রহ পথশিশুদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারে। আফির বিদায়ী চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কিগালি ঘোষণায় সুবিধাবঞ্চিতদের আর্থিক পরিষেবাভুক্তি ত্বরান্বিত করার যে বিশ্ব ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছেন তা তার নিজের দেশে তারই নেতৃত্বে কতটুকু বাস্তবায়িত হয় তা-ই এখন দেখার বিষয়।

মাহফুজুর রহমান : চেয়ারম্যান, এক্সপার্টস একাডেমি লি. এবং সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

advertisement