advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

এখনই আইন কার্যকর হচ্ছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১২:২৪
সাধারণ মানুষই শুধু নয়, পরিবহন ধর্মঘটে ভুগতে হয়েছে অসুস্থ মানুষকেও। ছবি : আমাদের সময়
advertisement

পরিবহন শ্রমিকদের অনীহায় যান সংকটের কারণে সারাদেশে টানা দুদিন সাধারণ মানুষের যারপরনাই ভোগান্তির পর অবশেষে গতকাল মধ্যরাতে ধর্মঘট স্থগিতের ঘোষণা এসেছে। দুপক্ষের বৈঠকের পর সরকারের তরফে বলা হয়েছে, চালক-শ্রমিকরা এখন যেসব লাইসেন্স ও অন্যান্য কাগজপত্র ব্যবহার করছেন, সেগুলো আরও ৭ মাস অর্থাৎ আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারবেন।

এ সময়কালের মধ্যে চালকদের লাইসেন্স, গাড়ির কাগজপত্র ইত্যাদি হালনাগাদ করে নিতে হবে বিআরটিএর কাছ থেকে। অর্থাৎ সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এখনই কার্যকর হচ্ছে না। এ ছাড়া এর যে ৯টি ধারা সংশোধনের দাবি তোলা হয়েছিল পরিবহন নেতাদের পক্ষ থেকে, সেগুলোর মধ্যে যৌক্তিক যেসব দাবি রয়েছে, সেগুলো মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।

এ লক্ষ্যে চালক-শ্রমিকদের দাবিগুলো যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে সুপারিশ আকারে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে সার্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এসব বিষয়ে উদ্যোগী হবে।

পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্যপরিষদের সঙ্গে বৈঠক শেষে রাত ১২টা ৫০ মিনিটে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। এ সময় পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থার প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

দেশব্যাপী গত মঙ্গলবার থেকে শুরু হয় যানবাহন সংকট। এ অবস্থার উত্তরণে সেদিন পরিবহন নেতাদের সঙ্গে ধানম-ির বাড়িতে বসে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু সে বৈঠকে কোনো ফয়সালা না হওয়ায় গতকাল রাতে ফের বৈঠকে বসে দুপক্ষ।

বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনে যে কয়টি ধারা নিয়ে তারা (বিক্ষোভকারী) আবেদন করেছেন, সেগুলো সংশোধনে আমরা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ আকারে পাঠাব। আর যেসব কাগজপত্রে সমস্যা আছে, সেগুলো সংশোধন করে নেওয়ার জন্য তাদের আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো আমরা মেনে নিয়েছি।

ইতিপূর্বের খবরে বলা হয়, নতুন সড়ক আইন প্রত্যাহারের একপেশে অযৌক্তিক দাবিতে একাট্টা পরিবহন শ্রমিকরা। তাদের দাবি না মানলে মানুষ ভোগান্তিতে পড়বে, জরুরি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে, বেড়ে যাবে পণ্যসামগ্রীর দাম। কাজেই বাধ্য হয়ে একপর্যায়ে এসব দাবি মেনে নেওয়া হবে-এমন বদ্ধমূল ধারণার জোরেই দেশজুড়ে চলছে পরিবহন শ্রমিকদের ঘোষিত-অঘোষিত ধর্মঘট। যা ইচ্ছে তাই হচ্ছে দেশের সড়কগুলোতে। পরিবহন খাতে এহেন কা- নতুন নয়, এর আগেও যাচ্ছেতাই পরিস্থিতি দেখা গেছে।

পরিবহন শ্রমিকদের যুক্তি-ইচ্ছা করে কেউ দুর্ঘটনা ঘটায় না। তাই দুর্ঘটনার জন্য, এমনকি মানুষ মেরে ফেলার জন্যও শাস্তি নয়। এ যুক্তি দেখিয়ে দেশের মানুষকে জিম্মি করে তারা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালনা, অহরহ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন, রাস্তায় মর্জিমাফিক যানজট সৃষ্টি-এসব অপকর্ম করতে চাইছে। এক কথায়, সড়কে চলমান নৈরাজ্য অব্যাহত রাখার দাবিতেই ধর্মঘটের নামে চলছে তাদের জিম্মিবাজি।

২০১০ সাল থেকে সড়ক আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই মানুষকে জিম্মি করে কর্মসূচি দেওয়া হয়। ধর্মঘট আহ্বান করতে হলে শ্রম আইনে বেশ কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। নোটিশ দেওয়া, ন্যূনতম সময় দেওয়া, উভয়পক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমঝোতার চেষ্টা করা। এর কোনোটিই না করে যখন খুশি ধর্মঘট ডাকেন পরিবহন নেতারা।

বিষয়টি তুলে ধরলে তারা বলেন, ধর্মঘট ডাকা হয়নি। এটি তাদের ‘স্বেচ্ছায়’ কর্মবিরতি। দেশজুড়ে ফের এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে কদিন ধরে; রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে স্বল্প ও দূরপাল্লার যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েই ট্রাক-কাভার্ডভ্যান সড়কে নামাননি নেতারা। আর যাত্রীবাহী যান চলছে না ধর্মঘটের ঘোষণা ছাড়াই অর্থাৎ অঘোষিত ধর্মঘটের কারণে। গতকালের পরিস্থিতি ছিল খুবই নাজুক। সকাল থেকেই রাজধানীর বাসস্ট্যান্ডে, সড়কের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য যাত্রীকে বাসের অপেক্ষায় দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কেউ কেউ রিকশায় বা ভ্যানে চড়ে কিংবা হেঁটেই কর্মস্থলের উদ্দেশে যাত্রা করেন। রাজধানীর বাইরের বিভিন্ন আন্তঃজেলা ও মহাসড়কেরও একই দশা; যান চলছে না বললেই চলে। কিছু স্থানে গাড়ি সচল রাখতে সক্রিয় ভূমিকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশবাহিনী।

গতকাল দেশের বিভিন্ন সড়কে সরকারি গণপরিবহন বিআরটিসি এবং ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহৃত গাড়ি চলাচলও আটকে দেন পরিবহন শ্রমিকরা। এমনকি বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে আড়াআড়িভাবে গাড়ি রেখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। কেউ বিকল্প বাহনে গন্তব্যে যেতে চাইলেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ এসেছে। তাদের এমন কাণ্ড বন্ধ করতে হলে আপাতঃদৃষ্টিতে একটা উপায় আছে শুধু-নতুন সড়ক আইন কার্যকর না করার সরকারি ঘোষণা। পরিবহন নেতাদের এ রকম ধৃষ্টতা দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষ এখন বলতে শুরু করেছে, মানুষের কষ্ট হলেও আইন প্রয়োগ চলুক। বেপরোয়া চালনায় মানুষ মরবে আর শাস্তি হবে না এমন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ চান জনসাধারণ।

প্রায় একই রকম কথা বলেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তার মতে, রাস্তায় মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে এ আইনের বিকল্প নেই। পরিবহনকর্মীরা সব সময়ই এ রকম হুমকি আর ধর্মঘট দিয়ে দাবি আদায় করে। এবার সে সুযোগ দেওয়া যাবে না। তারা কতদিন গাড়ি বন্ধ রাখে, দেখি। মানুষকেও একটু সহনশীল হয়ে পরিস্থিতি মানতে হবে। সরকারের একার পক্ষে এর সমাধান করা সম্ভব নয়, জনগণেরও উচিত সরকারের পাশে থাকা।

চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার কথা বলেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, আইন সবার জন্য। সাধারণ যাত্রীম, পথচারী, ব্যক্তিমালিক কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। যারা আন্দোলন করছে তারা প্রত্যাহার করবে এটাই অনুরোধ।
গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখার ব্যাপারে পরিবহন নেতা খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, আইনে মৃত্যুদণ্ড আছে এমন গুজব ছড়িয়ে শ্রমিকদের রাস্তায় নামানো হয়েছে। অথচ আইনের কোথাও এমন কথা বলা নেই। আমরাও চাই আইন হোক। সবার সহযোগিতা দরকার। তবে কিছু ক্ষেত্রে সংশোধনী এলে সবার জন্যই ভালো।

নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বিরোধিতা করে পরিবহন শ্রমিকদের আকস্মিক ‘কর্মবিরতিতে’ গতকাল বুধবার রাজধানীতে গণপরিবহন সংকট ছিল। ঢাকামুখী যাত্রীদের মধ্যে যারা প্রবেশদ্বার চিটাগাং রোড কিংবা সাইনবোর্ডে এসে আটকা পড়েছেন তাদের দুর্ভোগ ছিল বেশি। গত কয়েকদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে অঘোষিত এ পরিবহন ধর্মঘট চললেও রাজধানীতে গতকাল বিপাকে পড়তে হয় নগরবাসীকে।

ফলে স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থী এবং অফিসগামী মানুষকে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। এদিন পরিবহন শ্রমিকরা সাইবোর্ড এলাকায় অবস্থান নিয়ে ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অচল করে দেয়। গাবতলী থেকেও বাস ছেড়ে যায়নি। কল্যাণপুরে শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টারে বাসের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

এদের মধ্য থেকে কথা হয় জেসমিন আক্তারের সঙ্গে। পেশায় গার্মেন্টসকর্মী। তিনি বলেন, আমার মা বেশ কয়েকদিন যাবৎ অসুস্থ রয়েছেন। তাকে দেখতে যাব বলে অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিলাম। আজ বুধবার জয়পুরহাটে আমাদের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল আমার। কিন্তু যেতে পারলাম না। গাবতলী টার্মিনালের সোহাগ পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার রুবেল বলেন, প্রতিদিন আসাতের ৪৫টি বাস ছেড়ে যায়। কিন্তু আস সকাল থেকে একটিও বাস ছেড়ে যায়নি। শ্রমিক ধমঘটের কারণে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

এ ছাড়া মিরপুর-মতিঝিল, মোহাম্মদপুর-সায়েদাবাদ, উত্তরা-মতিঝিল রুটে চলাচলকারী নিয়মিত বাসগুলো তেমন একটা দেখা যায়নি। সকালে মিরপুর রোড, রোকেয়া সরণি, প্রগতি সরণি, এয়ারপোর্ট রোড, কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ে কিছু গাড়ি চললেও অন্য দিনের তুলনায় গণপরিবহন ছিল কম। নামমাত্র বাস চলাচল করছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। সকাল ৭টা থেকে সাইনবোর্ড এলাকায় অবস্থান নিয়ে ধর্মঘট করেছিলেন পরিবহন শ্রমিকরা। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেটসহ আশপাশের সড়কের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সিলেট ও চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাক কাঁচপুর ব্রিজের কাছে এসেই আটকে যায়।

চিটাগাংরোড, সাইনবোর্ড, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী এলাকা সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের দুধারে সারি সারি এসব গাড়ির জটলা সৃষ্টি হয়। বাধ্য হয়ে অনেক যাত্রী হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা করেন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে আসা এক নারী সাইনবোর্ডে এসে ধর্মঘটের কবলে পড়েন। তিনি বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম রওনা হই। কিন্তু ঘর্মঘটের কবলে পড়ে সকাল সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত গাড়িতে বসে ছিলাম। উপায় না পেয়ে গাড়ি থেকে নেমেছি। ভেবেছিলাম ছোট কোনো যানে গন্তব্যে পৌঁছব। কিন্তু কোনো যানবাহন নেই। আর কখন গাড়ি ছাড়বে তারও কোনো ঠিক নেই। তাই বাধ্য হয়ে হেঁটে এগোচ্ছি।

অফিসগামী সংবাদকর্মী শফিকুল ইসলাম জানান, কোথাও কোনো যানবাহন না পেয়ে নিরুপায় হয়ে সচিবালয়ের দিকে হাঁটতে শুরু করেন। দুর্ভোগের শিকার হন আবদুল হাই তুহিন নামের আরেক সংবাদকর্মী। তিনি শনির আখড়া থেকে হেঁটে যাত্রাবাড়ী আসেন। কথা হয় মিজানুর রহমান নামের চাকরিজীবীর সঙ্গে। তিনি বলেন, সকাল ৯টায় মৌচাক অফিসে পৌঁছার কথা। কিন্তু ধর্মঘটের কারণে রায়েরবাগ যানবাহনের আশায় দাঁড়িয়ে আছি এগারোটা পর্যন্ত। কোনো কোনো যানবাহন নেই।

অবশ্য বেলা দুটার দিকে ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল শুরু হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে অবস্থানরত পরিবহন শ্রমিকরা সরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে থাকে। দুপুরে পুলিশ পরিবহন শ্রমিকদের বুঝিয়ে শুনিয়ে মহাসড়ক থেকে চলে যেতে বললে, তারা অবরোধ তুলে নেয়।

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সকাল থেকে মুন্সীগঞ্জ-ঢাকা রুট এবং গজারিয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক দিয়ে যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চলাচল বন্ধ করে দেয় পরিবহন শ্রমিকরা। এ ছাড়া মুক্তারপুর চীন মৈত্রী সেতুর ঢালে বাস ট্রাক মালিক শ্রমিকরা বিক্ষোভ মিছিল এবং ব্যারিকেড দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়।

advertisement